আমগো মতন মাইয়াগো যে কত চালাকি কইরা বাইচা থাকতে অয়। হুজুরে দাদিরে দেহনের নাম কইরা আমগো ঘরে আইয়া যহন আমার লগে খাতির জমানের চেষ্টা করে তহন আমি চালাকি কইরা আতাহার দাদার কথা উডাই। এমুন ভাব করি য্যান আতাহার দাদার লগে আমার খাতির। আবার আতাহার দাদায় আইলে কই হুজুরের কথা। বাপ রে দিয়া পোলারে বুজ দেই, পোলারে দিয়া বুজ দেই বাপ রে।
এর লেইগাঐ এইবাড়ি ছাইড়া চইলা যাইতে ইচ্ছা করে তোমার?
অইতে পারে। তয় আমি জানি হেই যাওনডা আমার কোনওদিনও অইবো না। আজাইর পাইলেঐ এই গাছতলায় খাড়ইয়া আমি চক মিহি চাইয়া থাকুম আর খরালিকালে চিন্তা করুম, একদিন এই চক দিয়া হাঁইট্টা কোনওমিহি যামু গা, বাইষ্যাকালে মনে অইবো নাওয়ে উইট্টা যামু গা। এমতে এমতেঐ দিন যাইবো আমার। দাদি মরলে মন্তাজ কাকায় হয়তো বিয়াশাদি দিয়া দিবো। তহন যুদি এই চক দিয়া অন্য কোনও গেরামে যাইতে পারি।
নিখিল তখন উদাস ভঙ্গিতে সিগ্রেট টানছে। সিগ্রেটে কয়েকটা টান দিয়া হঠাৎ করে বলল, আমি আইজ বেবাক জাইন্না বুইজ্জাঐ এই বাইত্তে আইছি।
ফিরোজা অবাক হল। কী জাইন্না বুইজ্জা আইছেন?
আতাহার বাইত্তে নাই এইডা জাইন্না আইছি।
ক্যা?
তোমার লগে কথা কইতে।
কী কথা?
তারপরই মুখে হাত চাপা দিয়া হাসল ফিরোজা, যেন হাসির শব্দ অন্য কারও কানে না যায়।
পেরেম পিরিতির কথা? আমারে আপনের পছন্দ অইছে? আমারে ভাল্লাগে। আমারে আপনে ভালবাসেন এই হগল কইবেন?
সিগ্রেটে শেষটান দিল নিখিল। টোকা মেরে অনেকটা দূরে ফেলল সিগ্রেটের পিছনটা। হাসিমুখে বলল, না হেইডা তোমারে আমি কোনওদিনও কমুনা। হ তোমারে আমি পছন্দ করি, তোমারে আমার ভাল্লাগে। তারবাদেও কোনওদিন কমু না, তোমারে আমি ভালবাসি।
ক্যা?
আমি জানি ওইডা কইলে তুমি আমারে ফিরাইয়া দিবা। কইবা, নিখিল দাদা, আপনে যে হিন্দু। ধর্মের কারণে আমি আমার ভালবাসার কথা তোমারে কোনওদিনও কমু না। কইয়া
অপমান অমু না।
অপলক চোখে নিখিলের মুখের দিকে তাকায়া ফিরোজা বলল, আসলে তো আপনে কইয়াঐ দিলেন।
নিখিলও ফিরোজার চোখের দিকে তাকাল। উদাস দুঃখী গলায় বলল, না আমি তোমারে কিছুই কই নাই। এইডি আবল তাবল প্যাচাইল। অহন হোনো কীর লেইগা আমি আইজ তোমার কাছে আইছি। আমি আইছি পারুল ভাবির ব্যাপারে।
ফিরোজা চমকাল। তার আবার কী অইছে? হেয় তো অহন আছে বিরাট আনন্দে। যার লগে এতদিনের পিরিত, যার তিনডা পোলাপান পেডে লইছে তার লগে বিয়া হইবো, এর থিকা আনন্দের আর কী আছে?
ঘটনা এইহানে। বিয়া হইবো না। পুরাডা হুজুর আর আতাহারের চালাকি। আতাহার অন্য জাগায় বিয়া করবো। বসির ঘটক মাইয়া দেখতাছে। আতাহার নিজ মুখে আমারে কইছে এক মাইয়ালোক বেশিদিন ভাল্লাগে না অর। ও চায় নতুন বউ আর অর বাপে চায় টেকা। আতাহারের মায় কইলাম হাট এটাক কইরা এর লেইগাঐ মইরা গেছে। আতাহার আর হুজুরে একদিকে তারে বুজাইছে পারুর লগেঐ আতাহারের বিয়া অইবো আর অন্যদিকে বসির ঘটকরে নামাইছে অন্য মাইয়া দেহনের লেইগা। যেদিন আতাহারের মায় মরল হেদিন অরা বাপপুতে বাংলাঘরে বইয়া এই হগল প্যাচাইলঐ পারতাছিল। আতাহারের মায় আইতাছিল ওই ঘর মিহি, বেক কথা হেয় হুইন্না হালাইছে। স্বামী আর পেডের পোলায় এতবড় চালাকি করতাছে তার লগে এইডা হেয় সইজ্য করতে পারে নাই। লগে লগে হাট এটাক কইরা মইরা গেছে।
ফিরোজা ফ্যালফ্যাল করে নিখিলের মুখের দিকে তাকায়া রইল।
নিখিল বলল, হেয় মইরা যাওনের পরও চালাকি পারুল ভাবির লগে অরা বাপ পোলায় কইরা যাইতাছে। একদিকে ভাবিছাবরে কইতাছে তার লগেই আতাহারের বিয়া অইবো, অন্যমিহি ঘটকারে দিয়া মাইয়া দেকতাছে। বিয়াশাদি ঠিক কইরা তারপর হুজুরে পারুল ভাবিরে কিছু একটা বুজ দিবো, আতাহার কিছু একটা বুজ দিবো।
হায় হায় তয় তো ভাবিছাবের কইলজাড়া পুইড়া ছারখার অইয়া যাইবো।
হ। এর লেইগাঐ আমি তোমার কাছে আইছি।
আমি কী করুম?
তুমি পারুল ভাবিরে বেক কিছু জানাইয়া দেও।
তহন আমার যুদি কোনও বিপদ অয়?
তোমার কী বিপদ অইবো?
ভাবিছাবে যুদি আতাহার দাদারে কইয়া দেয় আমার কাছ থিকা এই হগল কথা হোনছে। তহন তো আপনের আমার দুইজনেরঐ বিপদ অইবো। আতাহার দাদায় আমারে ধরলে আমি তো বাইধ্য হইয়া আপনের কথা কইয়া দিমু। আপনে যে আমারে কইছেন আমার তো তহন আপনের নাম না কইয়া উপায় থাকবো না।
হ এইডা ঠিক। তয় তুমি পারুল ভাবিরে কিরা কছম দিয়া কইবা হেয় য্যান তোমার আমার নাম না কয়।
একটু থেমে ফিরোজা বলল, তয় কথাডি আপনে আমারে দিয়া কওয়াইতে চাইতাছেন ক্যা?
তয় কারে দিয়া কওয়ামু?
আপনে নিজে তারে কন।
আমি পুরুষপোলা। এই বাইত্তে আইয়া পারুল ভাবির লগে নিরিবিলিতে কথা কওনআমার পক্ষে সম্ভবপর না। তুমি মাইয়ামানুষ, তোমার হেই অসুবিদা নাই।
হ তা নাই। তয় তারে এই হগল জানাইয়া লাভ কী? আতাহার দাদার বিয়াশাদি ঠিক অইলে হেয় তো এমতেঐ জাইন্না যাইবো?
তহন আথকা অমুন একখান দুঃখ পাইলে গলায় দড়িমড়ি দিতে পারে। আগেঐ যুদি এই হগল জাইন্না যায় তয় মন শক্ত করতে পারবো। তুমি এই কামডা করো ফিরোজা। একজন মানুষরে বাঁচাও। হেয় গলায় দড়িমড়ি দিলে আতাহার বা হুজুর কেঐর কিছু অইবো না, ক্ষতি অইবো পোলাপান তিনডার। অগো আর কেঐ থাকবো না।
