হামিদা বলল, আমি তো হুনলাম কাইল বিয়ালে। সবকিছু যহন মিটমাট অইয়া গেছে। তারবাদেও হুইন্না আমার কইলজা হুগাইয়া গেছে। হায় হায় এইডা কয় কী?
নূরজাহান অস্থির গলায় বলল, এত প্যাচাইল না পাইড়া আসল কথা কও। আমার লগে কার বিয়ার সমন্দ আনছিল ঘটকায়?
তুই চিন্তাও করতে পারবি না।
আমার চিন্তা করনের কাম নাই। তুমি কও।
নূরজাহানের চোখের দিকে তাকায়া হামিদা গম্ভীর গলায় বলল, মান্নান মাওলানা।
আনমনা ভঙ্গিতে জ্বলন্ত চুলায় নাড়া খুঁজতে গিয়া যেন হাতই চুলায় ঢুকায়া দিছে। নূরজাহান, এমন ভঙ্গিতে চমকাল। কও কী?
হ। এর লেইগাঐত্তো তর বাপে ডরাইছে। ঘটকার মুখে ওই শুয়োরের পোর কথা হুইন্নাঐ বুইজ্জা গেছে গোলামের পোয় আসলে তরে মাপ করে নাই। বেক কিছু মনে রাকছে। অহন বউ মরণের উছিলায় তরে বিয়া কইরা তার মুকে ছ্যাপ দেওনের সোদ লইবো।
নূরজাহান তখন আর এই বাড়িতে নাই। তার চোখে ভেসে উঠছে মান্নান মাওলানার বাড়ির বড়ঘরটা। নির্জন গভীর রাত। ঘরে টিমটিম কইরা জ্বলছে হারিকেন। সেই আলোয় নিজেকে নূরজাহান দেখতে পাচ্ছে নতুন বউ সাইজা পালঙ্কে বইসা আছে। আবজানো দরজা ঠেইলা এসময় ঘরে আইসা ঢুকল বরের মতন শেরোয়ানি পরা একটা অসুর। সেই অসুরের নাম মান্নান মাওলানা। ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করল সে, কাটা ঘুরায়া হারিকেন নিভাল। সেই ফাঁকে খুলল নিজের শেরোয়ানি। তারপর গিরস্তবাড়ির নামার দিকে নির্জন দুপুরে চরতে থাকা মুরগি আথকা এসে যেমন করে খাবলা দিয়া ধরে পাতি শিয়ালে ঠিক তেমন করে ধরল নূরজাহানকে। ওইভাবে ধরার পর মুরগি যেমন ছটফট করে ওঠে, নিজেদের বাড়ির রান্নাচালায় বসে, হামিদার পাশে থাকার পরও তেমন ছটফট করে উঠল নূরজাহান।
মেয়ের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেল হামিদা। কী রে, এমুন করতাছস ক্যা?
নিজের অজান্তে চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে নূরজাহানের, গলা শুকায়া গেছে, বুকের ভিতর কলিজাটা খইলসা মাছের মতন লাফাচ্ছে। এত আনন্দ নিয়া খিচুড়ি রানতে বসছিল, চুলায় ফুটতে শুরু করছে চাউল ডাইল, আগুনের তাপ গায়ে লাগার পরও খিচুড়ি রান্নার কথা মনে নাই নূরজাহানের। আগুনের তাপটাও যেন গায়ে লাগছে না তার।
.
আমতলা থেকে ছোট্ট ডিঙ্গি নাও নিয়া নিখিলকে আজ মন্তাজদের ঘাটপারে আসতে দেখল ফিরোজা। দুপুর শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। বিকাল হয় হয়। এই সময় নিখিল কেন এই দিকটায় আসছে! সে তো আসে আতাহার দাদার কাছে। হুজুরের সীমানার ওইদিকে নাও ভিড়ায়। আইজ এইমিহি আইলো ক্যা?
তবে নিখিলকে নাও বাইয়া আসতে দেখে ফিরোজার আবার সেই প্রতিদিনকার ইচ্ছাটা হল। এই চকপাথালে হাঁইটা নাইলে নাওয়ে চইড়া সে একদিন দূর কোনওখানে চলে যাবে। নিখিল নাও ভিড়াইয়া তার সামনে এসে দাঁড়াবার পর কথাটা সে বলল। আপনেরে এই মিহি আইতে দেইখা আমার কী মনে অইলো জানেন?
নিখিল হাসল। জানি।
কী কন তো?
আমার নাওয়ে চইড়া এই চক পাড়ি দিয়া তুমি কোনওখানে চইলা যাইবা।
ফিরোজা হাসল। খরালিকালে মনে অয় হাইট্টা যামু গা, বাইষ্যাকালে মনে হয় নাওয়ে কইরা যামু গা। তয় আপনের নাওয়ে না।
নিখিলও হাসল। তয় কার নাওয়ে যাইতে চাও?
কার নাওয়ে যে যামু হেইডা ভাবি না। মনে অয় আপনের মতন নিজেঐ নাও বাইয়া যামু গা।
ওইডা মাইয়ারা পারে না।
জানি। মাইয়াগো অনেক অসুবিদা। তাগো বেবাক কামেঐ পুরুষপোলা লাগে।
আমারে তুমি পুরুষপোলা মনে করো না?
মনে করুম না ক্যা? আপনে তো পুরুষপোলাঐ।
তয় আমার নাওয়ে চইড়া যাইতে চাইলা না ক্যা? খরালিকালে গেলে আমার লগে হাইট্টাও যাইতে পারো।
ফিরোজা কথা বলল না। উদাস চোখে চকের দিকে তাকায়া রইল।
নিখিলের পরনে পুরানা জিনসের প্যান্ট। খুবই ময়লা প্যান্ট। সাদা হাফহাতা শার্ট পরা। তবে শার্টের সাদা রং আর সাদা নাই, আবছা হলুদ মতন হয়ে গেছে। শার্টের বুকপকেটে ক্যাপস্টান সিগ্রেটের প্যাকেট। বুক পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে, প্যান্টের পকেট থেকে ম্যাচ বের করে সিগ্রেট ধরাল সে। বড় করে সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, আমি জানি আমার লগে কীর লেইগা তুমি যাইবা না।
কথার লগে নাকমুখ দিয়া ব্যাপক ধুমা বের হল নিখিলের।
নিখিলের সিগ্রেটের গন্ধটা ভাল লাগল ফিরোজার, সিগ্রেট টানের ভঙ্গিটাও ভাল লাগল। তার মুখের দিকে তাকায়া সে বলল, কীর লেইগা কন তো?
আমি যে হিন্দু।
এইডা আমি চিন্তা করি নাই।
কও কী?
হ। আপনে হিন্দু না মোসলমান এই কথা আমার মনে থাকে না। আমার খালি মনে থাকে আপনে একজন পুরুষপোলা। আতাহার দাদায় যেমুন, হুজুরে যেমুন।
তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে ফিরোজা বলল, আইজ আপনে আমগো সীমানায় আইছেন ক্যা? আতাহার দাদাগো মিহি যান নাই ক্যা?
নিখিল সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, আমি জানি আতাহার অহন বাইত্তে নাই।
কই গেছে?
বেপারি বাড়ি গেছে। জহুগো লগে তাস খেলতাছে।
আপনে খেলতে গেলেন না?
না। ওই খেলা খেলনের ক্ষমতা নাই আমার।
ক্যা?
টেকা দিয়া খেলতে অয়।
জুয়া?
হ।
আতাহার দাদায় জুয়া খেলে?
নিখিল হাসল। কোনডা না করে তোমার আতাহার দাদায়।
হ হেইডা তো জানিঐ। ভাবিছাবের লগে এমুন খাতির থাকনের পরও আমার মিহি নজর। তারও নজর তার বাপেরও নজর।
দুইজনের হাত থিকা তুমি বাঁচতাছো কেমতে?
