আরে না।
তয় বাজারে যাও, বড় একহান ইলশা আইন্না খাও।
তুই যাবিনি?
আমি কাইল বিয়ালে দুইডা আনছি।
কত নিছে?
ছাব্বিশ টেকা। অন্য টাইমে একহানের দাম অইতো তিরিশ টেকা।
ঘাটপার থেকে বাড়িতে কোনওরকমে পিঁয়াজ কাঁচা মরিচ দিয়া একথাল পান্তাভাত খাইছে দবির। তারপর হামিদার কাছ থেকে বিশটা টাকা নিয়া, শার্ট গায়েও দেয় নাই, কান্দে ফালাইয়া নাওয়ের বান খুলছে। হামিদা আর নূরজাহান দাঁড়ায়া ছিল উঠানে। নৌকায় চড়তে চড়তে দবির বলল, নূরজাহানের মা, দোফরে খিচুড়ি রান্দা। ইট্টু নরম নরম খিচড়ি। আমি বাজারে যামু আর আমু। একহান ইলশা মাছ লইয়া আইতাছি। আননের লগে লগে কুইট্টা কাইট্টা ইলশা মাছ কড়কড়া ভাজা করবা। ইলশা মাছ ভাজা দিয়া আইজ খিচড়ি খামু।
কাল থেকে দবিরের লগে হামিদার মনও খুব ভাল। অনেকদিন পর স্বামীর লগে একটু রসের গলায় কথা বলল সে। তোমার মাইয়ারে কও।
দবির অবাক। কী কমু মাইয়ারে?
খিচুড়ি রানতে।
ক্যা?
হেয় বলে হেদিন মরনি বুজির বাইত্তে পোলাও মোরগ রানছে।
নূরজাহান অহংকারের গলায় বলল, হ রানছিঐত্তো। মিছাকথা নি?
তয় আইজ খিচুড়ি রান। তর বাপে খাইতে চাইছে, রাইন্দা খাওয়া তারে।
তুমি কি মনে করছো আমি পারুম না?
দেহি কেমুন পারছ।
আইচ্ছা ঠিক আছে।
বর্ষার পানিতে বইঠা ফেলে দবির বলল, আইচ্ছা মা, তুই রান আইজ। তর মা’রে দেহাইয়া দে তার থিকা ভাল খিচুড়ি রানতে পারচ তুই।
আইচ্ছা বাবা, রানতাছি। তুমি মাছ লইয়াহো।
তারপর রান্নাচালায় গিয়া খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করছে নূরজাহান। চাউল ডাইল, পিঁয়াজ কাঁচা মরিচ আর হলুদ বাটা সবই গুছগাছ কইরা দিছে হামিদা, রান্দন চড়াইছে নূরজাহান। ঘরে সেন্টুর দোকানের একটুখানি ঘিও আছে। সেই ঘি নিয়া আসছে নূরজাহান। দেখে হা হা কইরা উঠছে হামিদা। ঘি দিয়া কী করবি?
খিচড়িতে দিমু।
কচ কী?
হ।
তুই কি পোলাও রানতাছস যে ঘি দিবি?
খিচড়িতে ঘি দিলে খাইতে কেমুন সাদ অয় তুমি দেইক্কো নে।
মা-মেয়ের এইসব কথাবার্তা রান্নাচালার সামনে বসে শুনছিল ভাদাইম্মা আর তাকায়া তাকায়া দেখছিল দুইজন মানুষের রান্দনবাড়নের আয়োজন। এইসব দেখতে তার খুব ভাল লাগে। আমদে আনন্দে লেজটা পুরপুর করে নাড়ছিল সে।
নূরজাহান বেশ গুছগাছ করে, পাকা হাতে রানতে শুরু করল। হামিদা বসে আছে পাশে। এটা ওটা আগায়া দিচ্ছে। হঠাৎ বলল, আমি আইজ তরে রানতে দিলাম ক্যা, জানচ?
নূরজাহান মায়ের দিকে তাকাল। না। ক্যা দিছো?
তারপরই হাসল। বুজছি বুজছি।
কী বুজছস ক তো?
তুমি অহন কইবা বিয়াশাদি অইলে জামাইবাড়ি গিয়া আমি য্যান রানতে বাড়তে পারি।
হ।
ওই হগল লইয়া তুমি চিন্তা কইরো না মা। আমি বহুত ভাল রানতে পারুম। ওদিন মজনুদাদাগো বাইত্তে পোলাও মোরগ রানছি, আইজ খিচুড়ি রান্দুম, ইলশা মাছ ভাজুম, দেইখো নে কেমুন সাদ অয় খাইতে।
অইলে ভাল। আমার চিন্তা কমে। আমরা তরে ছয় মাস বচ্ছরে মইদ্যে বিয়া দিয়া দিমু।
আথকা তোমরা আমার বিয়া লইয়া এত পাগল অইলা ক্যা?
মাইয়া ডাঙ্গর অইলে তো মা-বাপে তার বিয়ার লেইগা পাগল অইবোই।
এর লেইগাঐ ঘটকারে খবর দিছিলা?
আমরা খবর দেই নাই।
তয়?
ঘটকা নিজেঐ আইছিল।
আমার লেইগা সমন্দ লইয়া আইছিল?
হামিদা গম্ভীর হল। হ। যেই সমন্দ লইয়া আইছে, হেই সমর কথা হুইন্না তর বাপে পাগল অইয়া গেছিল। তরে তো কিছু বুজতে দেয় নাই, আমারেও বুজতে দেয় নাই। ঘটকার নাওয়ের তলিমলি ভোগলা অইয়া যাওনের কথা বানাইয়া বানাইয়া কইছে। আসলে সমন্দর কথা হুইন্না ঘটকার নাওয়ে হেয় আর ওডে নাই। হাতরাইয়া বাইত্তে আইছে।
নূরজাহান হতভম্ব। কও কী?
হ।
কে, কার লেইগা আমার সমন্দ আনছে যে বাবায় হুইন্না এমুন করছে?
একথার ধার দিয়া গেল না হামিদা। বলল, তুই উদিস পাছ নাই। হেই রাইত্রে তর বাপে একফোঁডা ঘোমায় নাই। বিয়াইন্না রাইত্রে উইট্টা এহেনে আইয়া বইয়া বইয়া তামুক খাইছে। তারবাদে যেই মাইয়ারে বাইত থিকা বাইর অইতে দেয় না হেই মাইয়ারে লইয়া মরনি বুজির বাইত্তে গেল। তার কাছে গেছিল কী করবো অহন হেই বুদ্ধি লইতে। হের বুদ্ধিতে পরদিন তরে লইয়া গেল দেলরা বুজিগো বাইত্তে। তুই এইবাড়ি ওইবাড়ি গেলি আর হেয় গিয়া ধরল দেলরা বুজিরে। এনামুল সাবে কাইল বাইত্তে আহনের পর, হেয় তারে ডাকাইয়া নিছিল এর লেইগাঐ। কাইল এনামুল সাবে হেই ঘটনা মিটমাট করছে। দেলরা বুজি আছিল, মোতালেব আছিল। তাগো সামনে মিটমাট করছে। কইরা তর বাপরে কইছে যত তাড়াতাড়ি পারো মাইয়া বিয়া দিয়া দেও গাছি।
হামিদার এত কথার পরও নূরজাহান বুঝতে পারল না, কার লগে তার বিয়ার সমন্দ আনছিল ঘটকায়? কোন সমন্দর কথা হুইন্না বাবায় এমুন পাগল অইয়া গেল? আর আমি ক্যান বুঝতে পারি নাই বাবায় ভিতরে ভিতরে আমারে লইয়া বিরাট অস্থির অইছে, ডরের মইদ্যে আছে? আমি তহন আছিলাম অন্য আমোদে। এতদিন পর বাবায় আমারে লইয়া বাইত থনে বাইর অইতাছে, এইবাড়ি ওইবাড়ি যাইতে দিতাছে আমারে, এই আমোদে আছিলাম দেইক্কা বাপের মুকহান আমি খ্যাল কইরা দেহি নাই। বুজতে পারি নাই বাপে আমার আছে বিরাট যন্ত্রণায়! আমি আছিলাম আমোদে আর বাবায় আছিলো কষ্টে। আহা রে!
নূরজাহান হামিদার চোখের দিকে তাকাল। আমারে সোজা কইরা কও মা, আমার লেইগা কার সমন্দ আনছিল ঘটকায়? বাবায় এত অস্থির অইছিল ক্যা?
