শিরি বুঝে গেছে কে আসছে এতরাতে তাদের ঘরে। কার লগে ওই খাটে আছে পারু।
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বোঝে নাই শিরি। কাজির পাগলা স্কুলে ভরতি হওয়ার পর থেকে বুঝতে পারছে প্রায় রাতেই আতাহার কাকা আসে তাদের ঘরে। পারু তার লগে ওই খাটে যায়।
বাবা মারা যাওয়ার আগ থেকেই, ওই অতটুকু শিরি শুনছে তারা আসলে মোতাহারের পোলাপান না, তাদের আসল বাপ আতাহার। কোন রহস্যে কীভাবে বড়ভাইয়ের পোলাপানের বাপ হয় মাজারো ভাই, জানত না শিরি। বুঝত না। আজকাল বোঝে।
তারপর থেকে সে পারুকে খুব খেয়াল করে। নয়-দশ বছর বয়সে দুনিয়াদারি সে ভালই বুঝতে শিখছে। স্বামী না থাকলে মেয়েরা পোলাপান নিয়া যেমন দুঃখ কষ্টে থাকে, পারুর তেমন কোনও দুঃখ বেদনা নাই। রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া, পোলাপানের যত্ন, নিজের যত্ন কোনওটাতেই তার কোনও সমস্যা নাই। স্বামীর কথা সে ভাবেই না। পোলাপান তিনটাকেও ভাবতে দেয় না মা-বাপের কথা। যেন বাপ তাদের মরে নাই, বাপ বেঁচেই আছে।
আসলেই তো বেঁচে আছে। মারা গেছে মোতাহার, পারুর স্বামী। বেঁচে আছে আতাহার, শিরি, নসু আর নূরির বাপ। সেই বাপের জন্যই যে বিধবা জীবনে কোনও দুঃখকষ্ট নাই পারুর এসবও ধীরে ধীরে বুঝে গেছে শিরি। দাদি মারা যাওয়ার কিছুদিন আগ থেকে শুইনা আসছিল আতাহারের লগে নতুন করে বিয়া হবে পারুর। তারপর থেকে আতাহারকে আর কাকা ডাকবে না তারা, ডাকবে বাবা। আর পারু যেন তখন থেকে নতুন মানুষ। সারাদিন শালিক পাখির মতন উড়ছে, এই এদিকে যাচ্ছে, এই ওদিকে যাচ্ছে। আগে। তাদের রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া সব ভিন্ন ছিল, দাদি মারা যাওয়ার পর থেকে সব এক লগে। দাদির মতন বাড়ির মালকিন হয়ে গেছে পারু। পোলাপান তিনটারেও আগের থেকে বেশি আদর যত্ন করে, খেয়াল রাখে। দাদার খাওয়াদাওয়া, চা নাস্তা, অজুর পানি সব দেখাশুনা করে, আতাহার কাকার দেখাশুনা করে। মোতাহার বেঁচে থাকতে বাংলাঘরের ওইদিকে সে যেতই না। আজকাল যখন তখন যায়। মানুষজনের সামনেই এমন ব্যবহার করে তার লগে, মনে হয় তারা দেবর-ভাবি না, তারা বউজামাই। আতাহার কাকার লগে বিয়া হইবো দেইখাই তো এমন বদলাইয়া গেছে পারু।
তা হলে আজ এইরকম রাতদুপুরে এইভাবে কাঁদছে কেন সে? কী হইছে?
ঘরের ভিতর গভীর অন্ধকার। বাইরে শেষ শ্রাবণের মেঘলারাত। কোথাও কোনও শব্দ নাই। শুধু ঝিঁঝি ডাকে। শিরিরা তিন ভাইবোন পাশাপাশি শুয়ে আছে। প্রথমে শিরি তারপর নসু, তারপর নূরি। নূরির পাশে পারু।
অন্ধকারেই শিরি বুঝতে পারল পারু শুইয়া নাই, বইসা আছে। বইসা ওইভাবে কাঁদছে। শিরির একবার ইচ্ছা হল শুইয়া থাইকাই পারুকে জিজ্ঞাসা করে, কী অইছে মা? কানতাছো ক্যা?
কী ভেবে জিজ্ঞাসা করা হয় না। সে একটু চাপা স্বভাবের মেয়ে। অনেক কিছু দেখে শুনে বুঝেও ওইসব নিয়া কথা বলে না।
এখনও বলল না। একটু নড়লও না। পারুকে বুঝতে দিল না সে জেগে আছে, মায়ের চাপা কান্না শুনছে। ঘুমের ভান করে পড়ে রইল।
অনেকক্ষণ ওইভাবে চেপে চেপে কাঁদল পারু তারপর কান্নার মতনই চেপে চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল।
সকালবেলা পারুকে দেখে অবাক শিরি। কান্নার কোনও চিন্তা নাই মুখে। প্রতিদিনকার মতনই হাসি আনন্দমাখা মুখ। রানঘরে যাচ্ছে, দাদার ঘরে যাচ্ছে, আতাহার কাকার ঘরে যাচ্ছে। রহিমাকে নিয়া সবাইকে নাস্তাপানি খাওয়াচ্ছে। পোলাপান তিনটাকে সামনে বসাইয়া খাওয়াইলো, নিজে খাইলো। নূরি চলে গেল হিরা-মানিকের লগে খেলতে। তারপর জলচৌকিতে বইসা চা খাইতে খাইতে দুপুরে কী রান্না হবে বুঝাইয়া দিল রহিমাকে।
শিরি অবাক। ঘটনা কী? যে মানুষ রাতদুপুরে অমুন করে কাঁদতে পারে, সকালবেলাই সে এমন বদলাইয়া যায় কী করে! একজন মানুষ রাত্রে একরকম আর দিনেরবেলা আরেক রকম হয়ে যায় কী করে! রাত্রে কোন দুঃখে সে কাঁদে, আর দিনে কোন সুখে সংসার করে! একজন মানুষের ভিতরে আসলে কয়জন মানুষের বাস!
নসুর লগে কি বিষয়টা নিয়া কথা বলবে শিরি!
না সেটা ঠিক হবে না। নসু পেটপাতলা ছেলে। পেটে কোনও কথা থাকে না। পারু রাতদুপুরে ওইভাবে কাঁদছে শুনলে সে সোজা গিয়া তারে জিজ্ঞাসা করবো, ওমা, বুজি কইলো তুমি বলে রাইদোফরে ফেঁপাইয়া ফেঁপাইয়া কানছো? কী অইছিল তোমার? কানছিলা কীর লেইগা?
পারু তা হলে বুঝে যাবে পোলাপানের কাছে যতই লুকাতে চাউক সে, রাতের চাপা কান্নাটা সে লুকাতে পারে নাই। শিরি উদিস পাইয়া গেছে।
শিরি চায় না, পারু বুঝুক তার কান্না সে শুনছে। কান্নার পর নিয়াস ছাড়ার শব্দও পাইছে।
বড়ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে শিরি, নসু দৌড়াইয়া আইসা বলল, ল বুজি, মন্তাজ দাদাগো উডানে গিয়া সাচ্চারা খেলি গা।
শিরি তেমন উৎসাহ দেখাল না। কোনওরকমে বলল, ল।
.
বেশ একখান ফুর্তির ভাব নিয়া মাওয়ার বাজারে গেছে দবির।
সকালবেলা হাতমুখ ধুইতে গেছে পশ্চিম দিককার ঘাটলায়, মাঝিবাড়ির নজু নৌকার পানি হেচছিল (সেচছিল), দবিরকে দেখে বলল, গাছি, পদ্মায় ম্যালা ইলশা ধরা পড়তাছে। কাইল বিয়াল থিকা ইলশার বিরাট আমদানি মাওয়ার বাজারে। ডিমআলা বিরাট বিরাট ইলশা দশ টেকা পোনরো টেকা কইরা।
দবির অবাক। কও কী?
হ। ক্যা তুমি হোনো নাই?
