শুনে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল হামিদা। আল্লাহ আল্লাহ, আল্লায় রহম করছে। তয় ওই গোলামের পোর মনের মইদ্যে তো নূরজাহানের উপরে শোদ লওনের ইচ্ছা রইয়া গেছে। শুয়োরের পোয় তো ঘটনা ভোলে নাই। অহনতরি চেইত্তা রইছে আমার মাইয়ার উপরে।
হ, হেই চেতন আইজ এনামুল সাবে ফিনিশ কইরা দিছে। অহন আমার কাম একখান, মাইয়ার লেইগা পোলা দেহন। এইবারের শীতের দিনের মইদ্যে অর বিয়া দিমু। ইকটু সুবিদা মতন ভাল পোলা পাইলেঐ বিয়া দিয়া দিমু।
হ ঘটক লাগায়া দেও।
ঘটক লাগাইলেও ল্যাংড়ারে লাগান যাইবো না। ও তো হুজুরের ট্যান্ডল। শালার পো শালায় অন্য প্যাঁচ লাগাইয়া দিব।
তয় অন্য ঘটক ধরো।
হ। কান্দিপাড়ার রমিজ ঘটকরে ধরুম। তয় ঘটকারা অইলো বদমাইশ টাইপের মানুষ। খালি টেকা খাইবো। নিজেরা পোলা বিচড়াইয়া বাইর করতে পারলে ভাল অইতো।
তয় বিচড়াও।
এনামুল সাবের লগে কথা কইয়া আহনের পর থিকা আমি আসলে মনে মনে পোলা বিচড়াইতাছি নূরজাহানের মা। বিচড়াইতে বিচড়াইতে খালি একহান পোলা আমার চোক্কে পড়ে।
কে! কেডা তোমার চোক্কে পড়ে?
মরনি বুজির পোলা। মজনু।
হামিদা স্নিগ্ধমুখে দবিরের দিকে তাকাল। হেইডা কি অইবো? মরনি বুজি কি রাজি অইবো? মজনু তো অহনতরি তেমুন বড় অয় নাই। মাত্র খলিফা কামে ঢুকছে। এই বসে কি বুজি অরে বিয়া করাইবো? আর আমরা অইলাম দুনিয়ার গরিব। তুমি অইলা গাছি। গাছির মাইয়া কি হেয় তার পোলার লেইগা নিবো?
দবির মাথা নাড়ল। হ এইডা একখান কথা। তয় মরনি বুজি নূরজাহানরে বহুত পছন্দ করে। মজনুও মনে অয় পছন্দ করে।
আবার একখান কথাও আছে। মজনুও তো মরনি বুজির আপনা পোলা না। বইনের পোলা। বইন মইরা গেছে, বাপের খবর নাই।
কইয়া দেহুমনি বুজিরে?
কেমতে কইবা? নিজের মাইয়ার বিয়ার কথা আথকা গিয়া এইভাবে কেঐরে কওন যায়? বেহাইয়া মনে করবো না?
তারবাদে যুদি কোনও ওজর আপত্তি দেহাইয়া না কইরা দেয়, তয় তো বিরাট শরম পামু আমি। মরনি বুজির সামনে আর কোনওদিন যাইতেই পারুম না।
অন্য কেঐরে দিয়া কওয়াইলে কেমুন অয়?
কে, কারে দিয়া কওয়ামু?
হেইডা চিন্তা করো।
দবির আবার তামাক সাজাল। গুড়ক গুড়ক কইরা টানতে টানতে বলল, ঘটনা অইয়া যায় অন্যরকম। উলটা।
কথাটা বুঝতে পারল না হামিদা। বলল, কীরকম?
দেশগেরামের গিরস্তরা পোরোসতাব দেয় পোলার পক্ষ থিকা। আমার পোলার লেইগা। আপনের মাইয়াডারে চাই। আর আমরা চিন্তা করতাছি অন্য।
হ ঠিক কথা। বাদ দেও এই হগল চিন্তা। ভিতরে ভিতরে পোলা বিচড়াও। কিছু টেকা পয়সা খরচা অইলেও রমিজ ঘটকরে লাগাও। কপালে যেহেনে বিয়া আছে, মাইয়ার বিয়া ওহেনেই অইবো। আর অহন এত হুড়াহুড়িরও কিছু নাই। এনামুল সাবে তো আর কয় নাই কাইলঐ মাইয়ার বিয়া দিয়া দেও। হেয় যহন বেক কিছু মিটমাট কইরা দিছে, তয় আর হুড়াহুড়ির কী আছে। আমরা পোলা দেকতে থাকি। ছয়মাস নাইলে এক বচ্ছরের মইদ্যে মাইয়ার বিয়া দিলেই অইবো। অহন তো আর ডরের কিছু নাই।
দিনের আলো কখন মুছে গেছে চারদিক থেকে দুইজন মানুষের কেউ উদিস পায় নাই। বাঁশঝাড়তলার ওইদিক থেকে দৌড়াইয়া আসল নূরজাহান। আর পিছন পিছন আসল ভাদাইম্মা। মা-বাবাকে রান্নাচালায় তখনও বসে থাকতে দেখে নূরজাহান বলল, ওমা, তুমি দিহি অহনতরি এহেনে বইয়া রইছো? হাজ অইয়া গেছে, ঘরে যাইয়া কুপি বাত্তি আঙ্গাও না ক্যা?
হামিদা বলল, তুই আঙ্গা গিয়া।
নূরজাহান তীক্ষ্ণচোখে হামিদার মুখের দিকে তাকাল। দবির গুড়ক গুড়ক করে তামাক টেনেই যাচ্ছে। দুইজনের একজনের চেহারাও আলো বলতে কিছু নাই। তাদের মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া নাকি স্নিগ্ধ আনন্দ কিছুই বোঝার উপায় নাই। আর এনামুল সাব কেন ওইভাবে ডাকাইয়া নিছিল দবির গাছিকে, ঘটনা কী সেইটাও জানা হয় নাই নূরজাহানের। জানার খুব ইচ্ছা।
এই ইচ্ছা নিয়াই বড়ঘরে গিয়া ঢুকল সে। ম্যাচ আর কুপিবাতি যেখানে থাকে সেখানে। হাত দিয়া ফস করে ম্যাচের কাঠি জ্বালাল, কপি জ্বালাল। কুপির ওইটুকু আলোয়ই যেন পুরাপুরি আলোকিত হয়ে গেল ঘর। এতটা দূর থেকে সেই আলো যেন খোলা দরজা দিয়া বের হয়ে উঠান পার হয়ে রান্নাচালায় বসে থাকা দবির আর হামিদার কাছে চলে গেল। দূর থেকে দুইজন মানুষকে একটু পরিষ্কার, একটু আবছায়া মনে হতে লাগল।
.
পারুর বড়মেয়ে শিরিনকে কেউ শিরিন বলে ডাকে না। ডাকে শিরি।
কীরকম এক মৃদুকান্নার শব্দে আজ দুপুররাতে ঘুম ভেঙে গেল শিরির। খুব কাছে বসে কে যেন চেপে চেপে কাঁদছে। প্রথমে শিরি ভেবেছে সে আসলে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের ভিতর স্বপ্নে হয়তো কান্নার শব্দ শুনছে। পরে বুঝল না তার ঘুম ভেঙে গেছে। বাস্তবেই কান্নার শব্দটা সে শুনছে। এই তো তার খুব কাছে বসেই কেউ চেপে চেপে কাঁদছে। কেউ যাতে না শুনতে পায়, না বুঝতে পারে, কান্নাটা তেমন কান্না।
কয়েক পলকে শিরি বুঝে গেল পারু কাঁদছে। কেন, রাতদুপুরে এভাবে কোন দুঃখে কাঁদছে পারু? তাকে তো শিরি এভাবে কোনওদিন কাঁদতে দেখে নাই। বাবা মারা গেল তখন পারু বিলাপটিলাপ করে কাঁদছে ঠিকই। রাতদুপুরে এরকম গভীর কষ্টের কান্না কখনও কাঁদে নাই। বরং কোনও কোনও রাতে সে খুবই আনন্দে থাকে। বিকালবেলা একটু বেশি সাজগোজ করে, রাতেরবেলা তাড়াতাড়ি ভাতপানি খাওয়াইয়া পোলাপান তিনটাকে ঘুম পাড়ায়া দেয়। দুই-তিনটা সেন্টের শিশি আছে পারুর স্নো পাউডার লিপস্টিক এইসবের লগে। সেই শিশি থেকে সেন্ট দেয় শরীরে। কোনও কোনও রাতে সেন্টের গন্ধে ঘুম ভেঙে গেছে শিরির। তখন কত রাত কে জানে! তারা তিনটা ভাইবোন কেবিনে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। পারুও শুয়েছিল তাদের পাশে, রাতদুপুরে সেন্টের গন্ধে ঘুম ভাঙার পর শিরি উদিস পেয়েছে পারু কেবিনে নাই, সে চলে গেছে কেবিনের বাইরে। ওখানে একটা খাট পাতা আছে পাটাতনের উপর। সেই খাটের দিক থেকে আসছে সেন্টের গন্ধ। সেন্টের গন্ধের লগে আসছে মিষ্টি সুপারিআলা পানের গন্ধ, সিগ্রেটের গন্ধ। দুইজন মানুষ খুবই নিচাগলায় কথাবার্তা বলছে, হাসাহাসি করছে। শিরির অজানা, অদ্ভুত গোঙানির মতন শব্দ করছে।
