রান্নাচালার সামনে বসে গুড় গুড়ক করে তামাক টানছে দবির। খানিক আগে বাদলা এসে বাড়িতে দিয়া গেছে তাকে। দুপুরবেলা বাদলা এসে ডেকে নেওয়ার সময় বুদ্ধি। করে যে নিজের নৌকা নিয়া বাইর হইবো দবির সেকথা মনে ছিল না। কোনওরকমে শার্টটা পরে, গামছাটা কান্ধে ফেলে বাদলার নাওয়েই চড়ে বসছে। তখন একবারও ভাবে। নাই ফিরার সময় উপায় হবে কী? এনামুল সাহেবকে সড়কে নামাতে যাচ্ছে বাদলা। সেই নাওয়ে চড়ে বসেছিল দবির। সাবেরে নামাইয়া দিয়া আমারে ইট্টু বাইত্তে দিয়াহিচ বাদলা।
বাদলা মহা উৎসাহী পোলা। বলল, কোনও অসুবিদা নাই মামা। ওডেন নাওয়ে।
বাদলার কায়কারবার দেখে এনামুল হাসিমুখে বলল, তুই তো তর বাপের থিকাও বড় অইয়া গেছস রে বাদলা।
সড়কের ধারে জাহিদ খাঁ-র বাড়ি বরাবর রিকশা নিয়া বসে আছে সকালবেলার সেই রিকশাআলা। এনামুল ব্রিফকেস হাতে রিকশায় ওঠার পর পরই রিকশা চালায়া দিল। দবির তাকে একটা সালাম দিল। আসসেলামালায়কুম।
এনামুল ওয়ালাইকুমআসোলাম বলতে বলতে রিকশা অনেক দূর।
বাদলা তারপর নাও বাইতে শুরু করেছে দবির গাছির বাড়ি বরাবর। দবির বলল, তুই বয় বাদলা, আমি নাও বাই। লগ্নি আমারে দে।
বাদলা লগির খোচ দিতে দিতে বলল, আরে না মামা। আপনে বইয়া থাকেন, আমি বাইতাছি।
বাড়িতে আসার পর নূরজাহানকে দবির বলল, অরে মুড়ি মিডাই দে মা। আমারে আইয়া লইয়া গেছে, আবার নাও বাইয়া দিয়া গেল। আমারে লগ্নি ধরতে দেয় নাই।
বাদলা বলল, অহন বইয়া বইয়া মুড়ি মিঠাই খাইতে পারুম না মামা। বেইল নাই। হাজের আগে বাইত্তে যাওন লাগবো।
তয় এক কাম কর, টুপরে কইরা মুড়ি মিডাই লইয়া যা। বইঠা দিয়া নাও বাবি আর টুপরে থিকা একমুঠ কইরা মুড়ি লইয়া মুখে দিবি। এক কামড় মিডাই খাবি।
নূরজাহান সেইভাবে মুড়ি মিঠাই দিছে বাদলাকে। একথাল মুড়ি টোপরে নিয়া, আর একচাকা নাইরকেল দেওয়া মিঠাই, দবিরের কথা মতনই বইঠা বাইতে বাইতে, মুড়ি মিঠাই খাইতে খাইতে বাড়ির দিকে মেলা দিছে বাদলা।
দবির তারপর রান্নাচালার সামনে গিয়া হুঁকা নিয়া বসছে। ভাদাইম্মাকে নিয়া বাঁশঝাড় তলার ওইদিকে দৌড়াদৌড়ি করছে নূরজাহান। বিকাল শেষ হয়ে আসছে। বড়ঘরের ওটায় বসে মাথা আঁচড়াচ্ছিল হামিদা। নারকেল তেলের বোতল আর কাকুই ঘরে রাইখা আইসা ওই কথা বলল।
শেষ বিকালের এক টুকরা রোদ পড়ছে রান্নাচালার ওইদিকে। সেই আলোয় দবিরের মুখ আনন্দে ফেটে পড়ছে। হুঁকা টানার ফাঁকেও তার ঝলমলা মুখ দেখতে পেল হামিদা।
দবির হুঁকা থেকে মুখ তুলে হাসিমুখে বলল, এইবারও তোমার মাইয়ারে বাঁচাইয়া দিল মরনি বুজি।
হামিদা চমকে উঠল। আবার কী করছে নূরজাহান?
তারপরই চেতে গেল। মাইয়া লইয়া তুমি বাড়িত থন বাইর অইছিলা ক্যা? অরে তো আমি চিনি। ও যেহেনেঐ যাইবো ওহেনে কোনও না কোনও ভেজাল করবো। ঝামেলা লাগাইবো। হায় হায় রে এই বান্দরনিরে লইয়া কী যে করুম আমি!
দবির হাসল। এইবার তোমার মাইয়ায় কিছু করে নাই।
তয়?
ও অহনরি কিছু জানে না। তুমি জানো না।
কী অইছে কী?
তোমগো কেরে আমি কিছু কই নাই।
কও নাই, তয় অহন কও। অহন এত প্যাচাইতাছো ক্যা? খোলসা কইরা কও না কী অইছে। মরনি বুজি কেমতে নূরজাহানরে বাঁচাইলো?
বসির ঘটক আইছিলো না আমগো বাইত্তে। তোমারে কইছিলাম না নূরজাহানের লেইগা সমন্দ আনছে!
হ। দোজবরের সমন্দ আনছিল। হুইন্না আমি কইছি মাইয়ার জিন্দেগিতে বিয়া না অইলেও দোজবরের কাছে বিয়া দিমু না।
ওই সমন্দ লইয়া আমি তোমার লগে অনেক মিছাকথা কইছি।
কেমুন মিছাকথা।
দোজবরের সমন্দ ঘটকায় ঠিকঐ আনছে, তয় মানুষটা কে হেইডা কই নাই। চাইপ্পা গেছি। হোনলে তুমি আর নূরজাহান ডরে মইরা যাইবা দেইক্কা কই নাই।
কেডা, কার লেইগা সমন্দ আনছিল?
রান্নাচালার বাঁশের খুঁটির লগে হুঁকা দাঁড় করায়া রাখল দবির। হামিদার চোখের দিকে তাকালো। পাত্র অইলো মান্নান মাওলানা।
কী?
দবিরের পাশে রান্নাচালার মাটিতে ধপ করে বইসা পড়ল হামিদা। কী? কার লেইগা সমন্দ আনছিল? মান্নান মাওলানার লেইগা?
হ।
কও কী তুমি?
আরে হ।
মুখ শুকাইয়া পউয়া মাছের লেজের মতন ফ্যাকাশে হয়ে গেল হামিদার। হায় হায় কয় কী?
দবির হাসল। অহন বেক কিছু মিটমাটের পরও তুমি এমুন ডরান ডরাইতাছো, আর তহন যুদি হোনতা, তয় তো ডরে মইরা যাই। আমিঐ মইরা যাইতে লাগছিলাম। কয়ডা দিন যে কী গেছে আমার উপরে দিয়া, জানি খালি আমি আর আমার আল্লায়। একটা রাইতও ঘুমাইতে পারি নাই। তুমি খালি জিগাইছো কী অইছে আমার। আমি তোমারে কইতে পারি নাই। মনে অইতাছিল আমার কইলজাড়া ফাইট্টা যাইতাছে। আমার বুকের উপরে য্যান একখান হাজারমন ওজনের অসুর বইয়া আমার গলা টিপ্পা ধরছে। আমি দম। বন্দ অইয়া মইরা যাইতাছি। আইজ হেই অসুর আমার বুক থিকা নামছে। আইজ আমি বাঁইচ্চা গেছি। এনামুল সাবে আমারে বাঁচাইয়া দিছে।
দবিরের একটা হাত চাইপা ধরল হামিদা। কও, আমারে তুমি পুরা ঘটনা কও। কেমতে কী অইলো কও।
একে একে পুরা ঘটনা বলল দবির। ল্যাংড়া বসির মাওয়ার বাজারে নিয়া যাওয়ার পর চা সিগ্রেট আর সেন্টুর দোকানের রসগোল্লা খাওয়াইয়া, কীভাবে প্যাচাইয়া প্যাচাইয়া প্রস্তাবটা দিল। দবির রাজি হইলে কী কী সুবিধা তার হবে, বিলে এক-দেড় কানি ধানের জমি, বাড়িতে আরেকটা ঘর তুলে দেওয়া, দরকার হইলে নগদ টাকাপয়সা সব দিয়া নূরজাহানরে সে বিয়া করতে চায়। শোনার পর ঘটকার নাওয়ে আর চড়ে নাই দবির, চক সাঁতরাইয়া বাড়িতে আসছে। পরদিন আথকা নূরজাহানরে নিয়া মরনি বুজির বাড়িতে গেল, তার বুদ্ধিতে গিয়া ধরল দেলরা বুজিরে। এনামুল বাড়িতে আসার পর দেলরা বুজি বলছেন তারে, সে মান্নান মাওলানারে ডাইকা কীভাবে সব মিটাইয়া দিল, মাওলানা সাবে কী কইলো, মোতালেব দেলরা বুজি কী কইলো, সব হামিদাকে খুলে বলল দবির। শেষ পর্যন্ত এনামুল যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নূরজাহানরে বিয়া দিয়া দিতে বলছে তাও বলল।
