এনামুল আরও কিছু হয়তো বলত, তার আগেই মান্নান মাওলানা বললেন, আরে না মিয়া, আমার পোলায় নূরজাহানির লাহান মাইয়ারে পছন্দ করতো না।
কথাটা তিনি বললেন বেশ রুক্ষ ভঙ্গিতে। শুনে এনামুল একটু রাগল। আথকা বলল, তয় আপনে করছেন ক্যা?
মান্নান মাওলানা থতমত খেলেন। মুখে কথা জুটল না তার।
মোতালেব হাসল। মামুর কথার জব দেন হুজুর।
মান্নান মাওলানা আমতা গলায় বলল, না মাইনি এই বসে মাইনষে তো আর পোলাপান অওনের লেইগা বিয়াশাদি করে না। আমার ইট্টু সেবাযত্ন করতো। হাত পাও টিপ্পা দিতো, অজুর পানি দিতো এই হগল আর কী!
অর্থাৎ বউ না, আপনের একখান বান্দির দরকার। তয় বিয়া করনের কাম কী? একখান বান্দি রাইক্কা লন। নূরজাহানরে বিয়া করলে তো টেকাপয়সা খরচা করতে হইবো, দবিররে আবার বিলে জমিনও লেইক্কা দিতে চান। এতকিছুর কাম কী? একখান অল্প বসি ভাল বান্দি রাখেন।
মান্নান মাওলানা আর কথা বলতে পারলেন না। মাথা নিচা করে বসে রইলেন।
মোতালেব তখন মিটিমিটি হাসছে, দেলোয়ারাও হাসছেন। দবির ভিতরে ভিতরে খুশিতে ফেটে পড়ছে।
এনামুল বলল, মাওলানা সাব, আপনে কইলাম আপনের নিজের কথায়ঐ আইটকা গেছেন। আপনের কথায় পোলাপানেও বুজবো কোন উদ্দেশ্যে নূরজাহানরে আপনে বিয়া করতে চান। যাই হউক এই হগল লইয়া আমরা আর প্যাচাইল পাডুম না। এই ঘটনা আইজ আমি এহেনেই মিটাইয়া দিয়া গেলাম। আপনে সব সময় যেই কথা কন, আইজও যেইডা আম্মার সামনে, মোতালেব মামার সামনে আর আমার সামনে কইলেন, যে নূরজাহান আপনের লগে যেই বেদ্দপি করছিল হেইডা আপনে মনে রাখেন নাই, কোনও শোদ লওনের ইচ্ছা আপনের নাই, এইডাঐ আমরা ধইরা রাখলাম। নূরজাহানের লগে আপনের আর কোনও বিরোধ নাই। আইজ বেবাক শেষ।
তারপর অন্য একটা খোঁচাও মান্নান মাওলানাকে দিল এনামুল। যদিও মাকুন্দা কাশেমের ঘটনা কী ঘটছিল হেইডা কইলাম দেশগেরামের বেবাকতেই জানে। ছনুবুড়ির জানাজার কারণে যে মাকুন্দার উপরে আপনে চেতছিলেন, বেবাক কথা বেবাকতেই জানে। নূরজাহান ক্যান ওই কাম করছিল…।
দেলোয়ারা বললেন, বাদ দেও বাজান এই হগল প্যাচাইল।
আইচ্ছা আম্মা, আপনে কইলেন, বাদ দিলাম। তয় মাওলানা সাব আর নূরজাহানের ঘটনা আইজ আমি এহেনেই শেষ কইরা দিতে চাই। অহন হুজুরের মনে অইতে পারে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার লইয়া আমি এত মাথা ঘামাইতাছি ক্যা? আমি তো গেরামের চেরম্যান মেম্বর না, মাতবরও না। তাও আমি ক্যান এইসব লইয়া মাথা ঘামাইতাছি। মাথা ঘামানের কারণ একটাই, মাওলানা সাবে অহন আমার লগে জড়িত। মজজিদ অইলো আল্লার ঘর। এই ঘরের মালিক অইলো আল্লাহপাক। তয় একখান অছিলা লাগে, যে মজজিদ তইর (তৈয়ার) কইরা দেয়। আমি হেই অছিলা। মাওলানা সাবে এই অছিলায় আমার লগে জড়িত। সে মজজিদের ইমাম অইবো। বেতন বোতনের কথা আমি কইলাম না। তয় আমি আইজ থিকা মনে করি মাওলানা সাবে আমার লোক। আমার লোকের ভালমন্দ দেকলের দায়িত্ব আমার। হেই দায়িত্বের কারণে মাওলানা সাব আপনেরে আমি কইতাছি, আপনের বিয়া করতে অয় অন্য জাগায় করেন, নূরজাহানের কথা চিন্তা কইরেন না।
দেলোয়ারা বললেন, মাওলানা সাবের এই বসে বিয়া করনডাঐ ঠিক অইবো না। মাইনষে হাসাহাসি করবো। নতুন দাসী বান্দিরও দরকার নাই। পুরানা কামের বেটি তার বাইত্তে একজন আছে। বড়পোলার বিধবা বউ আছে। হেই বউঐত্তো হোনলাম মাওলানা সাবের সেবাযত্ন করে। মাওলানা সাবের বাইত্তেও অনেক পদের ঘটনা আছে। দেশগেরামের সব খবর সবাই জানে। এই অবস্থায় তার বিয়া করনডা ভাল অইবো না। নতুন মজজিদ অইতাছে গেরামে, হেই মজজিদের ইমামতি করবো যে হে যুদি এই বসসে একখান বিয়া করে…
দেলোয়ারার কথা শেষ হওয়ার আগেই মোতালেব বলল, বিরাট লেইজ্জ কথা কইছে বুজি। না না হুজুর, বিয়াশাদির মতলব আপনে ছাইড়া দেন। মামু মজজিদ করতাছে, লন দুইজনে মিল্লা মজজিদের কাম করি। আল্লায় ভাল করবো।
অনেকক্ষণ পর কথা বললেন মান্নান মাওলানা, আমি এতকিছু চিন্তা কইরা পোরোসতাব পাই নাই। ঠিক আছে, ঘটনা যহন এতদিকে গড়াইছে, তয় চিন্তাডা আমি বাদ দিলাম।
তারপর কথা অন্যদিকে ঘুরালেন। পোষমাসের পয়লা তারিক থিকা মজজিদের কাম আল্লার রহমতে আরম্ব অইতাছে, এইডা ঠিক তো বাজান?
এনামুল বলল, আমি বাঁইচ্চা থাকলে তো আমার কথা ঠিক থাকবোই, আমি মইরা গেলে আপনেগো বউ পারভিনও ওই তারিখেই মজজিদের কাম আরম্ব করবো।
আলহামদুলিল্লাহ।
এনামুল এবার দবিরের দিকে তাকাল। মাওলানা সাবের লগে তোমার মাইয়ার সমস্যা আমি মিটাইয়া দিছি। তয় তোমারে একখান কথা কইয়া যাইতাছি, যত তাড়াতাড়ি পারো মাইয়া বিয়া দিয়া দেও। অহন থিকাই পোলা দেহো। পছন্দ মতন পোলা পাইবা, বিয়া দিয়া দিবা। বিয়ার সমায় আমি যতটা পারি সাহাইয্য করুম। দেরি করবা না। আর মাইয়া রাখবা সাবধানে। তোমার মাইয়ায় য্যান আর কোনও ঘটনা না ঘটায়।
দবির গদগদ গলায় বলল, না দাদা না, এইডার দায়িত্ব আমার। অর সমন্দে আর কোনও কথা আপনেগো কানে কোনওদিন আইবো না। আমি পোলা দেখতাছি, অরে বিয়া দিয়া দিমু।
এনামুল উঠল। বিকাল অইয়া গেছে। আমার অহন যাওন লাগবো। রিকশাআলা আইয়া জাহিদ খাঁ-র বাড়ির সামনে বইয়া রইছে।
.
আথকা এনামুল সাবে তোমারে খবর পাডাইলো! ঘটনা কী?
