ছনুবুড়ি কথা বলে না। নড়ে না।
আজিজের এতকথা শুনেও কথা বলছে না ছনুবুড়ি এরচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা হতে পারে না। আজিজ খুবই অবাক হল। এই প্রথম মনের ভিতর কামড়টা দিল তার। হাঁটু ভেঙে ছনুবুড়ির সামনে বসল। মায়ের খোলা পিঠে হাত ছোঁয়াল। ছুঁইয়ে চমকে উঠল। যেন শীতকালের কচুরিভরা পুকুরের পানিতে হাত দিয়েছে।
ছনুবুড়ির ঘরের সামনে ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে বানেছা। কোলে লেপটে আছে ছোট বাচ্চাটা। দুইহাত দিয়ে ধরে মায়ের বাদিককার বুক চুষছে। অন্য ছেলেমেয়েগুলি আছে তার দুইপাশে।
ছনুবুড়িকে ছুঁয়ে দিয়েই ফ্যাল ফ্যাল করে বানেছার মুখের দিকে তাকাল আজিজ। বানেছা খসখসা গলায় বলল, কী অইছে?
শইলডা মাছের লাহান ঠাণ্ডা!
শীত পড়ছে, হুইয়া রইছে ল্যাংটা অইয়া, শইল তো ঠাণ্ডা অইবোই। ডাক দেও।
ছনুবুড়িকে তারপর ধাক্কাতে লাগল আজিজ। মা ওমা, মা। ওড ওড, বেইল উইট্টা গেছে।
বুড়ির কোনও সাড়া নাই।
এবার গলা একটু চড়াল বানেছা। শইলডা আগে কাপোড় দিয়া ঢাইক্কা দেও। ল্যাংটা মার সামনে বইয়া রইছো শরম করে না তোমার?
শুনে আজিজের বাচ্চাকাচ্চারা হি হি করে হাসতে লাগল। দিশাহারা ভঙ্গিতে কাথার তলা থেকে ছনুবুড়ির কাপড় বের করে তার শরীর ঢেকে দিল আজিজ। বানেছার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় বলল, আমার কেমুন জানি ডর করতাছে।
এবার বানেছাও ভুরু কুঁচকাল। মইরা গেছেনি?
হেমুনঐত্তো লাগে।
নাকি ভ্যাক ধরছে।
একথায় মেউন্না আজিজও একটু রাগল। ছোটখাট একটা ধমক দিল বানেছাকে। কী কও তুমি! ভ্যাক ধরব ক্যা! ভ্যাক ধরনের কী অইছে! শীতের দিনে খালি গায়ে হুইয়া কেঐ ভ্যাক ধরে!
আবার ছনুবুড়িকে ধাক্কাতে লাগল আজিজ। মা ওমা, মা।
স্বামীর কাণ্ড দেখে খুবই বিরক্ত হল বানেছা। আগের চেয়েও গলা চড়াল। এমুন শুরু করলা ক্যা তুমি! টাইন্না উডাও না ক্যা!
এবার দুইহাতে ছনুবুড়িকে টেনে তুলতে গেল আজিজ। তুলতে গিয়ে ছেলেবেলার একটা কথা মনে পড়ল। ছেলেবেলায় আজিজের স্বভাব ছিল উপুড় হয়ে শোয়া। সকালবেলা উপুড় হয়ে শোয়া ছেলের দুই হাতের তলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মা তাকে চিৎ করত। আদরের গলায় বলত, ওট বাজান, ওট। বেইল উইট্টা গেছে। আর কত ঘুমাবি! আজ সেই কাজটা করতাছে আজিজ। আজ যেন সে মা আর মা হয়ে গেছে ছেলেবেলার আজিজ।
ছনুবুড়ির মুখখানা নিজের দিকে ঘুরিয়েই আঁতকে উঠল আজিজ। মুখ মাখামাখি হয়ে আছে মাইট্টাতেলে। মুখের ভিতর মাইট্টাতেল, কষ বেয়ে নেমেছে মাইট্টাতেল।
দৃশ্যটা বানেছাও দেখল। দেখে চোখ সরু করে বলল, মাইট্টাতেল খাইছেনি। পানি মনে কইরা মাইট্টাতেল খাইছে? হায় হায় করতাছে কী? মাইট্টাতেল খাইলে তো মানুষ বাঁচে না!
মাইট্টাতেলে মাখামাখি মুখখানা বিকৃত হয়ে আছে ছনুবুড়ির। ছানি পড়া ঘোলা চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বের হতে গিয়েও বের হতে পারেনি, তার আগেই থেমে গেছে। এই চোখের দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে গেল আজিজ। প্রথম চিৎকারটা তারপর আজিজই দিল। হায় হায় আমার মায় তো নাই, আমার মায় তো মইরা গেছে!
স্বামীর চিৎকার শুনে খানিক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বানেছা। তারপর নিজেও বিলাপ শুরু করল। এইডা কেমতে অইলো গো, আল্লাগো আমার! কোন ফাঁকে গেল গো, আল্লা গো আমার।
বাড়িতে এই ধরনের কাণ্ড প্রথম। বাড়ির শিশুরা কোনও মৃত্যু দেখেনি। মা বাবার মিলিত বিলাপ শুনে তারা বেশ মজা পেল। হি হি হি হি করে হাসতে লাগল। বানেছার কোলের বাচ্চাটা দুধ খাওয়া ভুলে ড্যাব ড্যাব করে তাকাতে লাগল। হামেদ ভাবল দাদীর কায়কারবার দেখে তার মা বাবা কি একলগে কোনও গান ধরল! দাদীর মতো গভীর ঘুমে ডুবে থাকা মানুষকে কি গান গেয়ে জাগাতে হয়? কয়দিন আগে গোঁসাই বাড়িতে হয়ে যাওয়া বেহুলা লখিন্দর পালায় ঘুমিয়ে থাকা লখিন্দরকে কাঁদতে কাঁদতে গান গেয়ে যেমন করে জাগাতে চেয়েছিল বেহুলা, ব্যাপারটা কি তেমন কিছু! এসব ভেবে মা বাবার সঙ্গে সেও প্রায় গলা মিলাতে গিয়েছিল, বড়বোন পরি চোখ গোরাইয়া (পাকিয়ে) তার দিকে তাকাল। হামেদের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, দাদী মইরা গেছে। এর লেইগা মায় আর বাবার এমুন করতাছে। এইডা গান না, কান্দন।
হামেদ নাকমুখ কুঁচকে বলল, দাদী মইরা গেছে, মার কী? মায় কান্দে ক্যা? মায় তো দাদীরে দুই চোক্কে দেখতে পারে না। হেদিন বউয়া খাইতে চাইছিল, দেয় নাই। দাদী মরছে মার তো তাইলে আমদ। মায় কান্দে ক্যা?
আজিজের বড়ছেলের নাম নাদের। সে বলল, মায় কান্দে আল্লাদে। দেহচ না চোক্কে পানি নাই। মাইনষেরে দেহানের লেইগা কান্দে।
শুনে বিলাপ ভুলে দুই ছেলেকে একলগে ধমক দিল বানেছা। চুপ কর। প্যাচাইল পাড়লে কিলাইয়া সিদা কইরা হালামু। মাইনষেরে দেহানের লেইগা কান্দি আমি, না?
তারপর পরির দিকে তাকিয়েছে বানেছা। আইজ রান্দন বাড়ন যাইবো না। জের থিকা মুড়ি মিডাই বাইর কইরা বেবাক ভাই বইনে মিলা খা গা। যা।
শুনে আনন্দে নেচে উঠেছে শিশুরা। যে যেমন করে পারে পরির পিছন পিছন গেছে বড়ঘরে। ওদিকে ছেলেমেয়েদের লগে কথা শেষ করে আবার বিলাপ শুরু করেছে বানেছা। মাকে জড়িয়ে ধরে আজিজের বিলাপ তো ছিলই, শীত সকালের এই বিলাপ দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছিল চারদিকে। শুনে চারপাশের বাড়িঘর থেকে গিরস্থালি ফেলে একজন দুইজন করে মানুষ আসতে লাগল এই বাড়িতে। মিয়াবাড়ি মেন্দাবাড়ি হালদারবাড়ি হাজামবাড়ি জাহিদ খাঁর বাড়ি বেপারীবাড়ি, আস্তে ধীরে প্রতিটি বাড়ির লোক এল। আজিজের বাড়ির উঠান ভরে গেল।
