মোতালেব বলল, তয় দউবার মাইয়াডা বিরাট ট্যাটনি। ওইডারে বিরাট একখান ধমক দেওন দরকার।
খাড়ন, অহনঐ দিতাছি।
বাদলা মতলা রাবি তিনজনই ছিল ভিতর দিককার দরজার সামনে। এনামুল বাদলার দিকে তাকাল। গাছিরে ডাক দে।
দিতাছি দাদা।
বাদলা তার স্বভাব মতন দৌড় দিল।
মোতালেব বলল, গাছি এই বাইত্তেনি?
হ। আমি খবর দিয়া আনছি। মাওলানা সাবের সামনে, আপনেগো বেবাকতের সামনে অরে অহন ধমক দিমু।
এনামুলের কথা শেষ হওয়ার লগে লগে দবির এসে দাঁড়াল ভিতর দিককার দরজার সামনে। পরনে খয়েরি রঙের লুঙ্গি আর সাদা ঝুলপকেটঅলা শার্ট, কাঁধে গামছা ফেলা। মুখটা শুকনা, অপরাধীর মতন। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই সে সালাম দিল। আসসেলামালায়কুম।
মান্নান মাওলানা তার সালামের জবাব দিলেন না, জবাব দিল মোতালেব। ওয়ালাইকুমসালাম।
মান্নান মাওলানা আড়চোখে একবার দবিরের দিকে তাকিয়ে কঠিন মুখে মাথা নিচা করলেন। রাবি মতলা বাদলা সবাই দাঁড়িয়ে আছে দবিরের পাশে। এনামুল তাদের দিকে তাকাল। রাবি, তারা বাইরে যা। আমগো কথার কাম আছে।
রাবি ব্যস্ত গলায় বলল, যাইতাছি।
দ্রুত পায়ে তারা তিনজন পুবদিককার দরজা দিয়া রান্নঘরের দিকে চলে গেল।
এনামুল দবিরের দিকে তাকাল। ঘটনা আমি হুনছি গাছি। আম্মায় আমারে কইছে। তয় তোমার অসুবিদা কী? পোরোসতাব তো ভাল।
কথাটা বুঝতে পারল না দবির। বলল, জে? গ্রামের নামকরা হুজুরে তোমার মাইয়ারে পছন্দ করছে, তারে বিয়া করতে চায়, বসির ঘটকরে দিয়া তোমার কাছে পোরোসতাব পাডাইছে, এইডা তো ভাল কথা। বিয়ার লায়েক মাইয়া থাকলে পোরোসতাব তো মাইনষে পাডাইবোঐ।
এনামুলের কথা শুনে দবিরের মুখ কালো হয়ে গেল আর মান্নান মাওলানা অবাক হলেন। মোতালেবও অবাক। এতক্ষণ এইভাবে কথা বলে এখন আবার সুর বদলাচ্ছে এনামুল, ঘটনা কী? সে আসলে কার পক্ষে? দবিরের না মান্নান মাওলানার?
দবির কোনওরকমে বলল, আমার মাইয়াডা দাদা ছোড়। হুজুরের নাতিনের বসি অইবো। তাগো থিকাও ছোড অইতে পারে।
হেতে কী অইছে। বাংলাদেশে সইত্তর বচ্ছইরা বুড়ার লগে ষোল্লো বচ্ছইরা বহুত মাইয়ার বিয়া অয়।
হ হেইডা অয়। তয়…
আমি বুজছি তুমি রাজি না। তোমার রাজি না অওনের কারণও আমি বুজছি। তুমি মনে করছো তোমার মাইয়ায় হুজুরের লগে বিরাট একখান বেদ্দপি করছিল। হেই বেদ্দপির কোনও শোদ হুজুরে লয় নাই। অরে মাপ কইরা দিছিলো। আসলে মাপ করে নাই। মনের মইদ্দে হুজুরের হেই জিদ রইয়া গেছে। অহন নূরজাহানরে বিয়া কইরা হেই জিদ মিটাইবো, মুকে ছ্যাপ দেওনের শোদ লইবো। জিন্দেগিডা ছারখার করবো মাইয়াডার।
দবির কথা বলবার আগেই মান্নান মাওলানা বললেন, এইডা যুদি অরা চিন্তা কইরা থাকে তয় চিন্তাডা ঠিক না। ওই ঘটনা সত্যই আমি মনে রাখি নাই। ভুইল্লা গেছি। শোদমোদ লওনের কোনও ইচ্ছা আমার নাই। থাকলে হেইডা আমি এতদিনে লইয়া হালাইতাম। অহনও ইচ্ছা করলে যহন তহন লইতে পারি।
মোতালেব বলল, হুজুরে ক্যান নূরজাহানরে বিয়া করতে চায় হেইডা ইট্টু আগে হুজুরে তোমারে কইছে মামু। আমগো নবীজীবও তো অল্প বসসি মাইয়া বিবাহ করছিলেন। আমি শুনছি বিয়ার সময় হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহুআনহুর বয়স আছিল মাত্র নয় বছর।
এনামুল মোতালেবের দিকে তাকাল। সেইটা আর এইটা এক কথা না মামু। মোতালেব লগে লগে কথাটা মেনে নিল। হ মামু ঠিকঐ কইছো। সেইটা আর এইটা এককথা না।
অনেকক্ষণ পর দেলোয়ারা আবার কথা বললেন। মাওলানা সাবের লগে নূরজাহান যেইডা করছিল, হেই ঘটনার পর হেই মাইয়ারে যহন মাওলানা সাবে বিয়া করতে চাইবো, তহন তো মাইয়ার মা-বাপের আর মাইয়ার মনে এই সন্দ অইবোই যে মাওলানা সাবে শোদ লওনের লেইগা এই বিয়া করতে চায়। নাইলে জাতপদে টেকাপয়সায় নামডাকে গাছির মাইয়ার লগে মাওলানা সাবের সমন্দ চলে না। কই মাওলানা সাবে আর কই দবির গাছির মাইয়া!
এনামুল বলল, আম্মার কথা ঠিক।
মোতালেব বলল, হ লেইজ্জ কথা। এই চিন্তা নূরজাহানের মা-বাপে করবোই।
আর নবীজির আমল আর আইজকার দিন এক না। আরব দেশের সেই আমল আর বাংলাদেশের এই আমল এক না। দেশগেরামে যদিও নাবালিকার লগে বুড়া বেডাগো বিয়া অয়, আইনের চোখে এইডা অন্যায়। এইডা অইতে পারে না। আর আমরা যে যত কথাঐ কই, মাওলানা সাবে যত সুমতলব লইয়াঐ নূরজাহানরে বিয়া করতে চাউক না ক্যান, এইডা দবিররা মাইন্না নিতে পারবো না। অগো মনে ডরডা থাকবোঐ যে মাওলানা সাবে শোদ লওনের লেইগা ইচ্ছা কইরা, ঘুরাইয়া ফিরাইয়া অন্যপথে মাইয়াডারে কবজা করতে চাইতাছে।
এনামুলের প্রথম দিককার কথা শুনে খুবই ঘাবড়াইয়া গেছিল দবির। ভেবেছিল, হায় হায় এনামুল সাবে দেহি হুজুরের পক্ষ লইছে। এখন বুঝল, না, ঘুরাইয়া প্যাচাইয়া সে অহন। আসল কথায় আসতাছে। কনটেকদার মানুষ তো, ঘোরপ্যাঁচ বহুত ভাল বোঝে!
ভিতরে ভিতরে মনটা শান্ত হল দবিরের। ভাল রকম ভরসা পেল। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এনামুল বলল, নূরজাহান মাইয়া দেকতে ভাল। সাত-আষ্টমাস আগে অরে আমি একদিন দেখছি। মাওলানা সাবের ঘটনার আগে। মাইয়া ঢকেপদে (দেখতে শুনতে) ভাল। অর মতন মাইয়ারে মাইনষে পছন্দ করবো। যুদি এমুন হইতো, মাওলানা সাবে না, তাঁর পোলা আতাহার পছন্দ করছে নূরজাহানরে, সে বিয়া করতে চায়, তয় একখান কথা আছিলো। গাছির মাইয়া বিয়া করতে চায় মাওলানার পোলায়, যেই মাওলানার অবস্তা মাশাল্লা ভাল, জাগাসম্পত্তি টেকাপয়সা আছে, তহন হেইডা একটা বিবেচনার বিষয় অইতো। তয় ঘটনা তো তা না।
