বিয়া করছেনি জাপানে?
কইতে পারি না। তয় অনুমান করি। আর হেইডা যুদি বুদ্দি কইরা কইরা থাকে তয় আমি বিরাট খুশি। কামের কাম করছে। জিন্দেগিভর জাপানে থাকতে পারবো। টেকা কামাইতে পারবো দুইহাতে।
আর আপনের মাজারো পোলা? আতাহার?
মান্নান মাওলানা বিরক্ত হলেন। বাদ দেও তো মিয়া এই হগল প্যাচাইল। এনামুল সাবে মজজিদের কথা কইতাছে হেইডাঐ হুনি।
মান্নান মাওলানা এনামুলের দিকে তাকাল। কও বাজান, কও। আইজঐ বেবাক ফাইনাল করো।
এনামুল তার চা শেষ করে কাপটা টেবিলে রাখল। গম্ভীর গলায় বলল, হ আইজ বেবাক আমি ফাইনাল কইরা যাইতাছি। মজজিদের কাম শুরু অইবো পোষমাসের পয়লা তারিখে।
আলহামদুলিল্লাহ।
পোষমাসের পয়লা তারিখে ক্যান হেইডা হোনেন। তহন পুরাপুরি শীতের দিন। দেশগেরাম খটখটা শুকনা। পচ্চিমের পুকঐর থিকা মাডি কাডন অইলো পয়লা কাম। পোষমাসের পয়লা তারিখে কোদালের কোপ পড়ব পুকঐরে। বিশ-তিরিশজন মাইট্টাল লইয়া পাঁচ থিকা সাতদিনের মইদ্যে ছাড়াবাড়ির উচা নিচা জাগা সমান কইরা হালাইবো মোতালেব মামায়।
মোতালেব বলল, পাঁচ-সাতদিন লাগবো না মামু। তিন-চাইর দিনেঐ অইয়া যাইবো। মজজিদ যেহেনে উটবো ওই জাগাড়া তো সমান আছে। ওহেনে মাডি লাগবো না।
না না ওহেনে মাডি লাগবো ক্যা? ওই জাগার মাড়ি কাইট্টা ঢালাই ঢোলাই দিয়া পিলার উডান লাগবো।
হেইডাঐত্তো কই।
আপনে চাইর দিনের মইদ্যে মাডির কাম শেষ করবেন। ততদিনে জাহিদ খাঁ-র বাড়ি তরি সড়ক কারপেটিং অইয়া যাইবো। টেরাক আইবো। তিনটনি এক টেরাকে ইটা আডে দুইহাজার। রোজ দুই টেরাক কইরা ইটা পাডামু আমি। লেবার লইয়া হেই ইটা টেরাক থিকা আনলোড করবেন আপনে। মজজিদ বাইত্তে আইন্না রাখবেন। পাঁচদিনে বিশহাজার ইটা আইয়া পড়বো। এর মাঝখানে সেনটারিং মেনটারিং-এর লেইগা কাঠ টিন বাশ এক টেরাক ভইরা পাডামু। পুরানা টিনমিন দিয়া একখান আলগা ঘর বানাইবেন সিমিট রাখনের লেইগা। রড তো খালি জাগায় থাকবো। কাদির মিস্তিরিগো থাকনের লেইগাও আলাদা একখান টিনের ঘর বানাইবেন। আম্মার কাছে টেকা থাকবো। টেকা নিবেন আর ধুমাইয়া কাম করবেন। তয় মোতালেব মামায় কইলাম একলা করবেন না। দুইজনে মিল্লা করবেন। একখান মোড়া খাতা কিনবেন। পাই টু পাই লেইক্কা রাখবেন। এক পয়সার হিসাবে যেন গরমিল না অয়। আমি এমতে মাইনষেরে পাঁচশো একহাজার, দরকার অইলে পাঁচহাজার খাওয়াইয়া দিমু, তয় মালের হিসাবে এক পয়সা এদিক ওদিক অইলে হেইডা বরদাস্ত করুম না।
মোতালেব গম্ভীর গলায় বলল, আরে না মামু, হেইডা অইবো না। হুজুরে আর আমি দুইজনে পাই টু পাই হিসাব রাখুম। তুমি কোনও চিন্তাঐ কইরো না।
দেলোয়ারা অনেকক্ষণ কথা বলেন নাই। সবই শুনছিলেন। এবার বললেন, তবে অন্যকথা। বাদলা, চা-র কাপটি লইয়া যা।
নিতাছি বুজি।
চটপটা হাতে কাপ তিনটা নিয়া রানঘরের দিকে চলে গেল বাদলা।
এনামুল বলল, এইবার হুজুর আপনের বেতন বোতনের কথা ফাইনাল করি।
বেতনের কথা শুনে মান্নান মাওলানার কলিজাটা আনন্দে নলামাছের মতন একটা লাফ দিল। তবে সেই আনন্দ তিনি একদমই প্রকাশ করলেন না। অতি বিনয়ের গলায়, যেন বেতন জিনিসটা কোনও বিষয়ই না এমনভাবে বললেন, বেতন দিবা?
দিমু না? এত টেকা খরচা কইরা মজজিদ বানামু আর ইমামের বেতন দিমু না? ইমাম রাখুম মাগনা? না না হেইডা আমি করুম না। আপনে কন, কত বেতন চান?
মান্নান মাওলানা বিনীত গলায় বললেন, এইডা একটা কথা কইলা বাজান?
ক্যা?
তোমার লগে বেতনের কথা কমু আমি?
তয় কইবেন না!
না। তোমার ইচ্ছা অইলে তুমি বেতন দিবা, না ইচ্ছা অইলে না দিবা। কত দিবা না দিবা তোমার ইচ্ছা। আমার কোনও কথা নাই।
এইত্তো একটা বিপাকের মইধ্যে হালাইলেন আমারে।
কীয়ের বিপাক?
আপনে একটা বেতন চাইলে আমি একটা কিছু চিন্তা করতে পারতাম।
তারপরও তো তোমার একহান চিন্তা আছে। তোমার চিন্তাঐ আমার চিন্তা। তুমি যেইডা কইবা হেইডাঐ সই।
আমি অবশ্য একটা বেতন আপনের ধরছি।
অইলো। যেইডা ধরছো ওইডাঐ সই।
আমি আপনের বেতন ধরছি আঠারোশো টেকা। একহাজার আষ্টশো।
মান্নান মাওলানা এনামুলের মুখের দিকে তাকাল। আইচ্ছা।
তয় আপনে যদি আমগো গেরামের না অইতেন, নোয়াখালি থিকা যুদি আপনেরে ইমাম হিসাবে আনাইতাম তয় আর কিছু বেশি দিতাম।
ক্যা?
তার একটা খোরাকির ব্যাপার আছিল না? রাইন্দা বাইড়া খাওন লাগতো। হাটবাজার করন লাগতো। বেতনের বেশিরভাগ টেকাই খরচা অইয়া যাইতো। আপনের তো আর হেই ঝামেলা নাই। বাড়িরডা খাইবেন আর মজজিদে ইমামতি করবেন। বিচার সালিশ মাতবরি করবেন। এই আঠারোশোই তো আপনের লাব।
মান্নান মাওলানা হাসলেন। অইলো। এইসব বেতন বোতন লইয়া এত কথার কিছু নাই। আল্লাহ আল্লাহ কইরা মজজিদটা ঠিকঠাক মতন কইরা ফালাইতে পারলে অয়।
সেইটা আল্লার রহমতে কইরা ফালান। চল্লিশ দিনের মইদ্যে মজজিদের কাম শেষ করুম। এইটা আমার ইচ্ছা। শুরু করলে আর থামাথামি নাই। পোষমাসের এক তারিখে কাম শুরু অইবো, মাঘমাসের দশ তারিখে শেষ। পোষমাসের পয়লা তারিখ থিকা আপনের বেতন।
মোতালেব হঠাৎ করে বলল, আমার কী করবা মামু?
এবার কথা বললেন দেলোয়ারা। তর আবার কী করবো?
হুজুরের বেতন ধরলো আমার কিছু ধরবো না?
তুই তো মাডি কাডনের কামঐ লইছস। তর তো আর বেতনের কিছু নাই।
