মান্নান মাওলানা বললেন, হ তুমি তো আগেও এই রকম হিসাবই দিছিলা। ছয়-সাত লাখ টেকা লাগবে।
মোতালেব বলল, দশ লাখ লাগলেও অসুবিদা নাই। মামুর কি টেকার আকাল আছেনি? একবার যহন মুখ দিয়া কইছে মজজিদ করবো, দশ-বিশ লাখ যাই লাগুক, করবোই। না কী কও মামু?
এনামুল কথা বলল না, হাসল।
মোতালেব বলল, অহন আসল কথা কও মামু, কাম ধরবা কবে?
হেইডা কওনের আগে অন্য কথাডি কই। আমার কনটেকদারি কামে যে ইটা সাপলাই দেয়, তিনডা ইটখোলার মালিক। বিরাট বড়লোক। নাম হইল আজমত, আজমত সাহেব। সে আমারে ডাকে চাচা, আমিও তারে ডাকি চাচা। বাইষ্যাকালে তো ইট পোড়ানো যায় না, বানানোও যায় না। ইট বানানের কাম শুরু হয় ম্যাগবিষ্টি বন্দ অওনের পর। তহন ধুমাইয়া চলে ইটখোলা। এই অফ সিজিনে ইটখোলার মালিকরা করে কী আমগো লাহান বান্দা। পারটির কাছ থিকা টেকা এডভানচ নেয়। আগেই কনটাক করে সিজিনে কতডি ইটা তার কাছ থিকা আমি লমু। চাচার অফিস অইলো ফতুলার ওই মিহি পাগলা নামে একখান জাগা আছে না, হেই পাগলায়। এডভানচ টেকা দিলে ইটার দাম কম পড়ে। আমি এই সিজিনে চাচারে লাখহানি ইটার টেকা এডভানচ দেই। এইবার দিছি এক লাখ বিশ হাজারের। এক লাখ আমার কনটেকদারি কামের, বিশ হাজার মজজিদের লেইগা।
শুনে মান্নান মাওলানা মহাখুশি। ও তয় বিশ হাজার ইটার দাম এডভানচ দিয়া হালাইছো?
হ।
মাশাল্লা মাশাল্লা। তয় তো কাম আউন্নাইয়া গেছে।
আমি আইজ বাইত্তে আইছি আপনেগো লগে এই হগল কথা কওনের লেইগাঐ। একখান। মজজিদ বানান কইলাম সোজা কাম না।
মোতালেব বলল, হ মিয়া। সোজা কামনি! ছাড়া বাড়িডা অইলো উচা নিচা। পয়লা মাডি উড়াইয়া হেই বাড়ি সমান করতে অইবো। তারবাদে মাড়ি কাইট্টা মাডির নীচে ঢালাই দিয়া, রড গাইত্থা পিলার বানান লাগবো। তারবাদে দেওয়াল, ফুলোর, ছাদ। ছাদের উপরে মিনার।
মান্নান মাওলানা বললেন, আরে মিয়া এই হগল আমি জানি। তুমি এত কথা কইয়ো না তো। এনামুল সাবরে কথা কইতে দেও।
এতক্ষণ ধরে আঁচলে চশমার কাঁচ মুছছিলেন দেলোয়ারা। এবার চশমা চোখে পরলেন। বাদলার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী রে বাদলা, তর মা’র চা বানাইতে কতক্ষুন লাগে?
বাদলা চটপটা গলায় বলল, আমি গিয়া ইট্টু দেইক্কামু?
যা।
বাদলা মাত্র পা বাড়িয়েছে, ট্রে-তে করে তিনকাপ চা নিয়া আসল রাবি। ঘন দুধের চা। ভারী সুন্দর একখান গন্ধ ছুটছে চায়ের। চায়ের ট্রে-টা সে প্রথমে এনামুলের সামনে ধরল। এনামুল যে ভদ্রতা করে বলবে, আগে মাওলানা সাবরে দে। হেয় মুরব্বি মানুষ। সেটা সে বলল না। চায়ের কাপ নিয়া চুমুক দিল।
রাবি তারপর মান্নান মাওলানা আর মোতালেবের চা দিয়া যেমন চুপচাপ আসছিল তেমন চুপচাপ চলে গেল। রানঘরের দিক থেকে তখন মৃদু গুড় গুড়ক একটা শব্দ আসছে। এনামুল বুঝল দবির গাছি তামাক খাচ্ছে। চায়ে বড় করে চুমুক দিয়া বলল, একবার ভাবছিলাম ইমাম সাবের ঘরডা অহন বানামু না।
মান্নান মাওলানা ফুরুক করে চায়ে চুমুক দিয়া বললেন, ক্যা?
তার এই শব্দ করে চা খাওয়া একদমই সহ্য করতে পারেন না দেলোয়ারা। তার গা কেমন চিড়বিড় চিড়বিড় করে ওঠে। যে শব্দ করে চা খায় তাকে ধমক দিতে ইচ্ছা করে। মান্নান মাওলানা বয়স্ক মানুষ, তাকে তো আর ধমক দেওয়া যায় না। তবে দেলোয়ারার চেহারায় একটা বিরক্তির ভাব ফুটল। বিরক্ত মুখটা নিচা করে রাখলেন তিনি।
এনামুল মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল। ইমামতি করবেন আপনে। আপনে তো আর ওই ঘরে থাকবেন না। আপনে থাকবেন আপনের বাইত্তে। ওহেন থিকা আইয়া আয়জান দিবেন, ইমামতি করবেন।
সব সময় হেইডা হয়তো করুম না। অনেক সময় মজজিদের লগের ঘরেই থাকুম। তাহাজ্জুদ (নিশুতিরাতের নামাজ) পড়ম।
হেইডা আপনে থাইকেন, কোনও অসুবিদা নাই। তয় আমি অন্য একখান চিন্তাও করছি।
কী চিন্তা বাজান?
ধরেন আপনেরে ইমাম রাখলাম না, অন্য ইমাম রাখলাম, তয় তার থাকনের জাগা দিমু কই?
মান্নান মাওলানা একটু চমকালেন। অন্য ইমাম রাখনের কথা চিন্তা করতাছোনি?
না অহনতরি করি নাই, তয় করতে অইতে পারে।
ক্যা?
এনামুল মুচকি হেসে চায়ে চুমুক দিল। না, আপনে যুদি আবার বিয়াশাদি করেন, তয় কি আর নতুন বউ থুইয়া মজজিদ লইয়া চিন্তা করনের টাইম পাইবেন। ঘরে নতুন বউ থুইয়া আপনে কি আর আইয়া ইমাম সাবের ঘরে থাকবেন।
মান্নান মাওলানা ভিতরে ভিতরে চমকালেন। তার মানে নূরজাহানকে যে সে বিয়ার প্রস্তাব দিছে সেই কথা এনামুল সাবের কানে গেছে। ঘটকার মুখে প্রস্তাব শুইনা দউবরা দৌড়াইয়া আইসা কইছে দেলোরারে, দেলোরা কইছে এনামুলরে। এইরকম একখান ভজঘট যে লাগবো এইটা মান্নান মাওলানা জানতেন। ওইটা নিয়া তার তেমুন চিন্তা নাই। ইসলাম ধর্মে চাইরখান বিয়া জায়েজ। এক বউ মইরা গেছে অহন আরেক বউ তিনি ঘরে আনতেই পারেন। এইটার লেইগা অন্য কেঐর মতামতের দরকার নাই।
তবে কথাটা ধরল মোতালেব। হুজুরে আবার বিয়া করতাছেননি? আরে মিয়া অহনতরি দুইপোলা বিয়া করান নাই আর নিজে বিয়ার চিন্তা করতাছেন!
মান্নান মাওলানা ধীর শান্ত ভঙ্গিতে পর পর দুই চুমুকে তার চা শেষ করলেন। কাপটা পাশে নামিয়ে রেখে বললেন, তাগো বিয়ার চেষ্টা চলতাছে। তয় ছোটডায় মনে হয় বিয়া অহন করবো না। মনে হয় জাপানে কিছু একখান করছে।
