শুকনা খসখসা গলায় পারু বলল, আল্লার কছম, আপনের কথা আমি কেঐরে কমু না। কোনওদিনও কমু না। মইরা গেলেও কমু না।
তয় ঠিক আছে।
একটু থামল ফইজু। তারপর বলল, আজাহারের লেইগা না, ঘটকে মাইয়া দেখতাছে আতাহারের লেইগা।
শুনে দমটা যেন বন্ধ হয়ে এল পারুর। সে কোনও কথা বলতে পারল না। খানিক আগে ফইজু যেরকম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তার দিকে, ঠিক তেমন করে সে তাকিয়ে রইল ফইজুর দিকে।
ফইজু বলল, আইজ যহন সুযুগটা পাইছি, তয় বেক কথাঐ আপনেরে আমি কইয়া যাই। গাউদ্দার ওয়াজদ্দি সাবের মাইয়া কমলার লেইগা আতাহারের সমন্দ ঠিক করতাছে ঘটকসাবে। মাইয়া ট্যারা। ঘটকে কইছে লক্ষ্মীট্যারা, আসলে পুরা ট্যারা। তাতেও হুজুরের অমত নাই। টেকা চাইছে পাঁচলাখ। ট্যারা মাইয়ার লেইগা পাঁচলাক তারা খরচা করবো। তাগো টেকা আছে। মাইয়ার তিনভাই থাকে বিদেশে। ওইদিন আপনেগো কাছ থিকা হোনলাম আপনের লগে আতাহারের বিয়া ঠিক অইয়া রইছে। তয় আবার এইডা কেমতে অয়? ঘটকসাবে আমারে কইলো, এইডা হুজুরের আর আতাহারের চালাকি। তারা একদিক দিয়া আপনেরে ভাইল (ভাও) দিয়া রাকছে, অন্যমিহিদা অন্য মাইয়া দেকতাছে। বিয়াশাদি পাকা অইয়া গেলে আপনে আর কী করবেন? আপনে মাইয়া মানুষ, বাড়ির বউ, ভদ্রলোকের। মাইয়া, আপনে তো আর চিল্লাচিল্লি করবেন না। তিনডা পোলাপান আছে আপনের, তাগো। লইয়া গলায় দড়িও দিবেন না। বিয়াশাদি ঠিক অইয়া গেলে হুজুরে আপনেরে বুজাইবো আর আতাহারে কইবো, বাবার কথার উপরে দিয়া আমি কথা কই কেমতে!
একটু থামল ফইজু। তারপর বলল, মাগো, তারা দুইজনে আপনের লগে একটা বেইমানি করতাছে। আপনের জিন্দেগি অরা ছারখার কইরা দিবো।
পারুর কলিজাটা ভিতরে ভিতরে ততক্ষণে গলে গেছে। মুখটা মরা শোল মাছের পেটের মতন ফ্যাকাশে। চোখে পলক পড়ে না। দমটা যেন বন্ধ হয়ে আছে, মাথাটা যেন কাজ করে না।
ফইজু বলল, আরেকখান কথাও আপনেরে কইয়া যাই মা। কয়দিন আগে হুজুরে তার। নিজের বিয়ার লেইগাও ঘটকসাবরে দিয়া এক বাইত্তে পরস্তাব পাডাইছে। মাইয়াডা তার। নাতিনের বইসসা অইবো। বহুত ছোডঘর। গাছি। দবির গাছির মাইয়া নূরজাহানরে হুজুরে বিয়া করবো। সেই পরস্তাব গাছিরে দিছে। পয়লা গাউদ্দার কমলারে আনবো আতাহারের লেইগা তারবাদে নিজে বিয়া কইরা আনবো দবির গাছির মাইয়া নূরজাহানরে। আর আপনে এই হগল চাইয়া চাইয়া দেখবেন। আপনের মিহি তারা কেঐ চাইবো না।
পারু তবু কথা বলল না, নড়ল না। তার চোখের পাতা কাঁপে না, চোখে পলক পড়ে না। দম পড়ছে কি পড়ছে না বোঝা যাচ্ছে না। যেন সে এখন আর মানুষ না, যেন সে এখন মান্নান মাওলানার বাড়ির পুরানা কোনও গাছ। যেন সে মান্নান মাওলানার বারবাড়ির ওদিককার ওই নাড়ার পালা। যেন সে উঠানের মাটি। নড়াচড়ার শক্তি নাই তার, কথা বলার শক্তি নাই। চোখ আছে, দেখবার শক্তি নাই। দম আছে, ফেলবার শক্তি নাই। হাত পা আছে, নড়াবার শক্তি নাই, চলাফিরার শক্তি নাই।
ফইজু দুঃখী গলায় বলল, যাই গো মা। বেদ্দপি কইরা থাকলে মাপ কইরা দিয়েন।
পারু আগের মতনই।
কদমগাছের গোড়ার লগে প্যাঁচ দেওয়া রসি খুলে ল্যাংড়া বসিরের কোষানাও ছাড়ল ফইজু। বর্ষার পানিতে বইঠা ফেলল। পারু তখনও একই রকম স্থির হয়ে আছে।
ফইজু পারুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, আল্লাহ, আল্লাহগো, এইরকম মাইয়াডারে তুমি এই কষ্ট দিলা? এইডা তোমার কেমুন বিচার।
বর্ষার পানিতে তখন ভেসে যাচ্ছিল কদমফুলের রেণু।
.
আমি আমার ইনজিনিয়ারের লগে আলাপ করছি, আমার কনটেকদারি কামের আসল মিস্তিরি অইলো কাদির মিয়া, সে অইলো ইনজিনিয়ারের বাপ। যেইকাম একবার চকু দিয়া দেইক্কা মাল আননের যেই হিসাব দিবো ওইটাই কারেট (কারেক্ট)। তারা দুইজনে মিল্লা আমার মুখ থিকা মজজিদের কথা হুইন্না, কতাহানি জমিনের উপরে মজজিদ অইবো, মজজিদের পিছে, পুকঐরের দিকে জাগা থাকবো কম, তিনদিকে জাগা থাকবো বেশি, একদিকে ইমামসাবের ঘর, আরেকদিকে অজুখানা, পায়খানাঘর, সামনে অনেকখানি জাগা, এই হগল হুইন্না কাদির মিয়া পয়লাঐ কইলো ইটা লাগবো সার (স্যার) বিশহাজার। ঝামাইটা লাগবে ছয়-সাত হাজার। ইনজিনিয়ার কইলো, ঝামাটা ইট্টু বেশিও লাগতে পারে। ফোলোর (ফ্লোর) ছাদ, পিলার মিনার মিল্লা ঝামা বেশি লাগতে পারে। হেইডা আবার না ভাঙ্গাইলে বুজা যাইবো না। রড সিমিটের হিসাবও দিছে। বেবাক মিল্লা ছয়-সাত লাখ টেকা লাগবে।
বড়ঘরের বারান্দায় টেবিলের লগের হাতলঅলা দুইখান চেয়ারে বসে আছে এনামুল আর দেলোয়ারা। মতলা রাবিরা যে চৌকিতে শোয় সেই চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন মান্নান মাওলানা আর মোতালেব। রাবি রানঘরে গেছে চা বানাতে। মতলা আর বাদলা দাঁড়িয়ে আছে ভিতর দিককার দরজার সামনে। কে কখন কী অর্ডার দেয় শুনেই দৌড় দিয়া। যাইবো সেই কাজ করতে। দীন দুনিয়ার কোনও কিছুতেই মতলার কোনও উৎসাহ নাই। বাদলার বেজায় উৎসাহ। পারলে সে আইসা মান্নান মাওলানা আর মোতালেবের পাশে বসে। এনামুলের কথা মন দিয়া শোনে।
এনামুলের কথা মতন বাদলা গেছিল দবির গাছিকে ডাকতে। গাছি এখন এই বাড়িতেই আছে। বাদলার লগেই আসছে। এনামুল তাকে রানঘরে বসায়া রাখছে। দরকার মতন ডাকলে সামনে আসবে। মান্নান মাওলানা, মোতালেব তারা কেউ জানেই না গাছি আছে। এই বাড়িতে। জানে এনামুল দেলোয়ারা, আর রাবিরা তিনজন।
