এনামুলের জন্য আদা চা নিয়া আসল বাদলা। নেন দাদা।
বাদলার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়া চায়ে চুমুক দিল এনামুল। ঠিক আছে, আপনে যহন কইছেন, আমি আইজঐ মিটাই দিতাছি সব।
বাদলার দিকে তাকাল এনামুল। তর বাপরে ডাক দে।
বাদলা আবার দৌড় দিয়া ঢুকল রানঘরে। মতলারে ডেকে নিয়া আসল। লুঙ্গি খাটো করে পরা, খালি গায়ের মতলাকে দেখাচ্ছে বর্ষার পানি সরে যাওয়ার পর, বর্ষার কয়েক মাস পানির তলায় ডুবে থাকা ডুমুরগাছ যেমন কালচে শুকনা ভিজা ভিজা দেখা যায়। ঠিক তেমন। এমনিতেই কাহিল মানুষ, কয়েকদিনের জ্বরে ভুগে আরও কাহিল হয়েছে। এনামুলের অদূরে দাঁড়িয়ে বলল, কন।
নাও লইয়া যা। দবিরগাছিরে ডাইকা লইয়ায়।
মতলা কোনওরকমে বলল, আমি যামু?
দেলোয়ারা বলল, অর শইল্লে জোরবল নাই। ও নাও বাইয়া দউবরারে আনতে গেলে দিন পার অইয়া যাইবো।
তয় কে যাইবো?
বাদলা বলল, আমি যাই দাদা। লগ্নির খোচ দিয়া দিয়া যামু আর আমু।
পারবি?
কয় কী দাদায়? পারুম মাইনি? দেহেন না আপনে।
দেলোয়ারা হাসিমুখে বললেন, হ ও অর বাপের থিকা বহুত ভাল পারবো।
তয় যা।
বাদলা একদৌড়ে মিয়াবাড়ির দিককার মটকুরা গাছটার গোড়ায় বান্ধা ডিঙ্গি নৌকার কাছে চলে গেল। চটপটা হাতে নৌকার বান (বাধ) খুলে লগিতে বড় বড় করে খোঁচ দিয়া গাওয়ালবাড়ি আর মিয়াবাড়ির মাঝখান দিয়া নৌকা চালিয়ে দিল। একদম পাকা মাঝিমাল্লার কায়দায় কাজটা সে করল। সেদিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিল এনামুল। বাদলা ছেমড়াডা তো বিরাট কামের অইছে আম্মা। জুয়ান মরদো বেডাগো লাহান নৌকা বায়।
চোখ থেকে চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে কাঁচ মুছতে মুছতে দেলোয়ারা বললেন, হ বাদলা ভাল কামের অইছে। মতলা যেমুন ম্যারা, ওই ম্যারার ঘরে যে বাদলার লাহান পোলা অইছে এইডাই আরচার্য।
.
উঠানের তারে ভিজা শাড়ি মেলে দিচ্ছে পারু।
মাত্র গোসল করে আসছে। পরনে হালকা বাসন্তী রঙের শাড়ি। মাথার ভিজা চুলে গামছা প্যাচাননা। দুপুরবেলার রোদে মুখটা যে কী মিষ্টি লাগছে পারুর।
এসময় ঘাটলার ওদিকটায় একটা কোষানাও এসে ভিড়ল। কদমগাছের গোড়ায় নাও বেঁধে ল্যাংড়া বসিরের গোমস্তা ফইজু নামল। একটা কাশ দিল।
ফইজুর কাশের শব্দে তার দিকে ফিরে তাকাল পারু। লোকটাকে চিনতে পারল, হাসল। সে কথা বলবার আগেই ফইজু বলল, হুজুরে বাইত্তে নাই?
না। মেন্দাবাড়ি গেছে। এনামুল সাবে বাইত্তে আইছে। হেয় খবর পাডাইছে। হুইন্না নাকেমুখে কোনওরকমে চাইট্টা গুইজ্জা দৌড় দিছে। তারে নিতে আইছিল মেন্দাবাড়ির মোতালেব।
শুনে ফইজুর মুখটা ম্লান হয়ে গেল।
সেই ম্লান মুখ খেয়াল করল না পারু। বলল, আইজ দেহি আপনে একলা। ঘটকসাবে আইলো না?
না তার জ্বর। এর লেইগাঐ আমারে পাডাইছে।
জরুলি কথা?
হ। হুজুরের মাজারো পোলায় নাই? থাকলে তার লগে কথা কইতাম।
না হেয়ও নাই। কই যে গেছে, কুনসুম যে আইবো আল্লাই জানে। খুব বেশি দরকারি কথা অইলে, যুদি আপনের কোনও অসুবিদা না অয় তয় আপনে আমারে কইতে পারেন। আপনে তো আমারে চিনেন। আমিও আপনেরে চিনি।
এবার ফইজু হাসল। খালি চিনিনি আপনেরে? মাগো, মিছাকথা না, আল্লার কিরা, আপনের লাহান ভাল বউ আমি আমগো দেশগেরামে আর দেহি নাই। আপনে দেকতে যেমুন সোন্দর, আপনের মনডাও তেমুন সোন্দর। ওদিন ফিরা যাওনের সমায় ঘটক সাবরে আপনের কথা কইছি।
পারু হাসল। কী কইছেন?
আমার লাহান একজন মানুষরে আপনে কী খাতির করলেন।
ওইডা এমুন কিছু খাতির না। একজন মানুষ একজন মানুষের বাইত্তে আইলে তারে ইট্টু চা মুড়ি, ইট্টু পান তামুক দিতে অয়। এইডি আমগো মা-বাপে আমগো হিগাইছে।
এর লেইগাঐ কই, বড়ঘরের বউঝি মাইয়াগো আদপ লেহাজঐ অন্যরকম।
পারু রানঘরের দিকে তাকাল। সেখানে বসে ভাত খাচ্ছে পারুর তিন পোলাপান। রহিমা তাদেরকে বেড়ে দিচ্ছে। হাফিজদ্দি বাড়িতে নাই। আতাহারের লগে নৌকা নিয়া গেছে।
ফইজুর দিকে তাকিয়ে পারু বলল, আপনেরে ভাত দিতে কমু?
ফইজু বিনয়ে একেবারে গলে গেলো। নাগো মা। না।
ক্যা? আপনে ভাত খাইয়া বাইর অইছেন?
হ মা, ঘটকবাড়ি থিকা খাইয়াঐ বাইর অইছি।
তয় কন দিহি আমারে কীর লেইগা আইছিলেন।
তিনশো টেকার লেইগা।
পারু অবাক, তিনশো টেকা?
হ। ঘটক সাবের তিনশো টেকা লাগবো। আইজ তার শইলডা ম্যাজম্যাজ করতাছে দেইক্কা নিজে আইতে পারে নাই। এর লেইগা আমারে পাইছে। কাইল বিয়ানে গাউদ্দা যাইবো, নাও ভাড়া বাবদ তিনশো টেকা দিতে কইছে হুজুররে।
আজাহারের লেইগা গাউদ্দার মাইয়া দেখতাছেনি?
ফ্যালফ্যাল করে পারুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ফইজু।
পারু ভুরু কুঁচকে ফইজুর দিকে তাকাল। এমনে চাইয়া রইলেন ক্যা?
ফইজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চিন্তা করতাছি।
কী চিন্তা করতাছেন?
কথাডা আপনেরে কওন ঠিক অইবো কি না।
কী অইছে?
মাগো, আমি খুবঐ গরিব মানুষ। তয় কোনওদিন চোগলখুরি করি নাই। এর কথা অরে, অর কথা তারে এইডি তো করি নাই, মিছাকথাও কোনওদিন কই নাই। তয় আপনে। মানুষটা এত ভাল, এমুন একখান খোয়াব লইয়া আছেন, আমার উচিত আপনেরে আসল কথা কওন। তয় আল্লার কছম খাইয়া আমারে আপনের কথা দেওন লাগবো, আমি যে আপনেরে কথাডা কইছি এইডা আপনে কেঐরে কইবেন না।
পারুর বুকটা তখন ধুগধুগ ধুগধুগ করছে, মুখটা শুকিয়ে গেছে। একটা ঢোক গিলল সে। উঠানের দিক থেকে ঘাটপারের দিকে এল। ফইজুও এল তার লগে লগে।
