আজ মাছ যা পাওয়া গেছে সাড়ে তিন-চারশো টাকা হবে। বিয়ানবেলা বাড়ি ফিরে বাপ পোলায় ভরপেট পান্তা খেয়ে মাছের ডুলা দুইখান নিয়া মাত্র মাওয়ার বাজারে মেলা দিবে, দেখে জাহিদ খাঁ-র বাড়ির সামনে এনামুল সাহেব রিকশা বিদায় করছেন। এখন তিনি হয়তো আবদুলদের বাড়ির কাউকেই ডাকবেন তাকে একটু পার করে দিতে। এই সড়ক থেকে পশ্চিম-উত্তরে গাওয়াল বাড়ির ফাঁক দিয়া পশ্চিমে মিয়াবাড়ি। হাজামবাড়ি বা গাওয়ালবাড়ি এই দুই বাড়ির যে-কোনও বাড়ির লোককেই ডাকতে পারে এনামুল, যে-কোনও বাড়ির লোকই নাও নিয়া আইসা তাকে বাড়িতে নামায়া দিয়া আসবে। আবার কোনও বাড়িতে এই সময় নাও না থাকলে রাবির জামাই মতলাকে ডেকে দিবে। মতলা কোষানাও নিয়া ল্যাডল্যাড়া শরীরে যত দ্রুত সম্ভব সড়ক পারে এসে এনামুলকে নিয়া যাবে।
আলালদি আর আবদুল মাত্র নাওয়ে চড়বে, এনামুলকে দেখে আর কোনও কথা নাই, বাজারে মাছ বেচতে যাওয়ার কথা ভুলে সোজা আসল এনামুলের কাছে। আবদুল বলল, ওঠেন দাদা, ওঠেন। আপনেরে বাইত্তে নামায় দিয়া তারবাদে বাজারে যামু। আলালদ্দি, দাদার বিফকেস ল।
আলালদ্দি লাফ দিয়া নাইমা এনামুলের হাতের ব্রিফকেস নিল। নাওয়ে চড়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াল এনামুল। তার পরনে জিনসের প্যান্ট আর হলুদের কাছাকাছি টি-শার্ট, পায়ে কেডস। বর্ষাবাদলার দিনে এরকম পোশাকই ভাল। গলার মোটা সোনার চেন রোদে দুইবার ঝিলিক দিয়া উঠল। চোখে সানগ্লাস এনামুলের আছেই।
আবদুলের দিকে তাকিয়ে এনামুল বলল, খবর কী আবদুলদা? আছেন কেমুন?
আবদুল বিনীত গলায় বলল, আল্লায় রাখছে দাদা। ভালঐ রাখছে।
যাইতাছেন কই?
বাজারে। মাছ বেচুম।
মাছের কথা শুনে খুবই উৎসাহী হলো এনামুল। কী মাছ বেচবেন?
হারারাইত দাঐনে মাছ ধরি দাদা। গুড়াগাড়ি নানান পদের মাছ। ওই যে দেহ ডুলা ভরা। বাপপুতে মাছ ধরি, মাছ বেচি। বাইষ্যাকালে অন্যকাম নাই তো। তয় মাছ ধইরা ভালঐ আছি।
ডুলার দিকে তাকিয়ে মাছ দেখল এনামুল। পুঁটি ট্যাংরা গোলসা ফলি, পাবদা টাকি, শিং রয়না বাইল্লা কই। তাজা মাছের প্রতি বেজায় লোভ এনামুলের। মাছ দেখে সে মুগ্ধ। বলল, দুই ডুলায় কয় টেকার মাছ অইবো আবদুলদা?
আবদুল না, আলালদ্দি বলল, সাড়ে তিন-চাইরশো টেকার অইবো কাকা।
আবদুল বলল, আবার বিশ-তিরিশ টেকা বেশিও অইতে পারে।
হ অইতে পারে। আইজকাইল মাছের অনেক দাম। ভাল মাছ পাওয়াই যায় না। বিক্রমপুরের মাইনষের টেকা অনেক। মাছ কিননের সময় উস থাকে না।
হ দাদা। কথা ঠিক।
তয় আপনে এককাম করেন আবদুলদাদা, বাজারে আইজ আর যাইয়েন না। বেবাক মাছ আমগো বাইত্তে দিয়া দেন। চাইরশো টেকা আমি আপনেরে নৌকা থিকা নাইম্মাঐ দিয়া দিতাছি।
আবদুল বিনীত গলায় বলল, ঠিক আছে দাদা, ঠিক আছে।
আলালদি খুশি। তয় এতদূর নাও বাইয়া আমগো আর বাজারে যাইতে অইলো না।
আবদুল বলল, তুমি বাইত্তে থাকবা কয়দিন?
আইজ বিয়ালেই যামু গা। ওই রিকশাআলারে কইছি বিকাল চাইরটা- পাঁচটার দিকে আইয়া আমারে ছিন্নগর লইয়া যাওনের লেইগা।
রিকশাঅলার কথা শুনে চট করে তছির কথা মনে পড়ল আবদুলের, রুস্তম রিকশাআলার কথা মনে পড়ল। সেদিনও এনামুলই রিকশা নিয়া আসছিল। গ্রামে প্রথম রিকশা আসছিল। ওই একটা দিনে তছির জীবনটা বদলাইয়া গেল। খুনি হয়ে গেল তছি।
আবদুলকে আনমনা দেখে এনামুল বলল, কী চিন্তা করেন আবদুলদাদা?
আবদুল হাসল। না দাদা কিছু চিন্তা করি না। তুমি আইজ বিয়ালেই যাইবাগা, তয় এত মাছ দিয়া কী করবা?
আমি কহেক পদের মাছ দোফরে খামু আর জিয়াইন্না মাছটি আম্মার লেইগ্না রাইখা যামু।
তয় ঠিক আছে।
তারপরই আবদুল বলল, একবেলার লেইগা কী কামে আইলা দাদা?
আইছি দাদা মজজিদের কামে। ঢাকা থিকা ইটা পাডামু হেই হগল বন্দবস্ত করতে আইছি।
আইচ্ছা আইচ্ছা।
এনামুল বাড়িতে ওঠার পর দেলোয়ারাদের সীমানায় সাড়া পড়ে গেল। একে এনামুল লগে দুই ডুলা মাছ, রাবি বেতিব্যস্ত হয়ে গেল। কোন মাছ রানবো, কোনটা জিয়াইয়া রাখবো এই নিয়া চিন্তায় পড়ল। আবদুল আর আলালদি দুইজনেই তাকে সাহায্য করতে বসল। বাদলা বড় বড় দুইটা ঘোপা নিয়া আসল, সেও হাত লাগাল মাছে। শিং টাকি কই। ফলি কয়েকটা বড় বড় রয়না যেসব মাছ জীবিত, ঘোপায় রাখলে অনায়াসে দুই-চাইরদিন। বাঁচবে সেইগুলি বেছে বেছে ঘোপায় রাখল তিনজনে মিলে। মরে গেছে তবে এখনও তাজা এমন কয়েক পদের মাছ কুটতে বসে গেল রাবি। বাড়িতে কেবিনের আলমারিতে লুঙ্গি গেঞ্জি শার্ট একজোড়া স্যান্ডেল রেখে যায় এনামুল। সেসব বের করে একবেলার জন্য পরল। মোতালেব বাড়িতেই ছিল। এনামুলের আসার খবর শুনে দৌড়ে এল। কুনসুম আইলা মামু?
নিমতলায় দুইটা চেয়ার এনে রাখছে মতলা। একটায় দেলোয়ারা বসেছেন, বসে আঁচলে চশমার কাঁচ মুচছেন, আরেকটায় বসতে বসতে এনামুল বলল, এইত্তো আইলাম মামু।
একবার রানঘরের দিকে তাকিয়ে আবদুলদেরকে দেখল মোতালেব, মাছ দেখল। এত মাছ কিনছো ক্যা মামু?
কিনলাম আর কী! তাজা মাছ দেইখা কিন্না হালাইলাম।
মাছের বন্দোবস্ত করে আবদুল আর আলালদ্দি তখন ফাঁকা ডুলা হাতে নিয়েছে। আবদুলকে ডেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট দিল এনামুল। গলার মোটা সোনার চেন হাতাতে হাতাতে বলল, আইজকার মাছের দাম চাইরশো টেকা। আর একশো টেকা বেশি। দিলাম। একশো টেকার ভাল মাছ একদিন আম্মারে দিয়া যাইয়েন আবদুলদা।
