আমি নিজে নিজে আগেঐ চিন্তা করছিলাম দাদা…
কী চিন্তা করছিলি?
এই লাইন ছাইড়া দিমু। আইজ আপনের কাছে আইয়া আরও ভরসা পাইলাম। আমগো বয়স অইছে দাদা। এই বয়সে চুরিচামারি কইরা ধরা পড়লে, মাইরধইর খাইলে আর বাঁচুম না। পঙ্গুম অইয়া যামু। বিচনায় পইড়া থাকন লাগবো। হাইগ্না মুইত্তা বিচনা বিনাস করুম। বউ পোলাপানে চাইয়াও দেখবো না। ওই হগলের থিকা ভিক্কা কইরা খাওন ভাল।
ইব্রার কথা শুনে বহুত খুশি মুকসেদ। এইত্তো লাইনে আইছরে টাকি। ঠিক, একদম ঠিক।
তয় আইজ আপনের কাছে আইয়া, আপনের কথা হুইন্না আরও বল ভরসা পাইলাম। তিন মাইয়ার বিয়া দিয়া হালাইছি, বউ আছে নাতি নাতকুড় লইয়া, আমি ঢাকায় থাইক্কা সমন্দির লগে কাপড়ের দালালি করি। বেশি টেকার আমার দরকার নাই। নিজে চলতে পারলেই হইলো। আমিও আপনের লাহান জীবন বদলাইয়া হালাইছি।
তয় খালি নিজেরডা দেহিচ না বেডা, মাইনষের লেইগাও কিছু করি।
মাইনষের লেইগা কী করুম দাদা?
মাইনষের ইট্টু উপকার করলি, বিপদে পড়া মাইনষেরে ইট্টু সাহায্য করলি। এই হগল আর কী? ওই হগল কাম করলে দেখবি মন ভাল থাকবো, আরাম পাবি। রাইত্রে ভাল ঘুম অইবো। এই যে ধর আমি মতিমাস্টারের সংসারে পইড়া থাকি, বড় আরাম পাই থাইকা। লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ। তয় গরিব। এমুন গরিব, তরে কইয়া আমি বুজাইতে পারুম না। দুইডা পয়সা দিয়া সাহাইয্য করনের কেউ নাই। না মাস্টারের নিজের দিকে, না হৌরবাড়ির দিকে। ছাত্র পড়ায়া, খাইগোবাড়ির ইসকুলে মাস্টারি কইরা কয় টেকা পায়। বাড়িঘর যা আছিল পঙ্গু পোলাপান দুইডার তিকিস্সায় (চিকিৎসায়) বেবাক গেছে। গনি মিয়া বাইত্তে জাগা না দিলে রাস্তায় থাকতে অইতো। এই ধরনের মানুষের অসুবিদা। কী জানচ, কইতেও পারে না, সইতেও পারে না। না ফকিরের লাহান মাইনষের কাছে
হাত পাততে পারে, না কিছু করতে পারে। ঘরে বইয়া কান্দে আর না খাইয়া থাকে। গনি মিয়ার অবস্থা ভাল, তয় শালায় অইলো দুনিয়ার কিরপিন। বাইত্তে আইলে পঞ্চাশ-একশো টেকা দেয়। মাস্টার রুজি করে আর কয় টেকা। আমি যেডু পারি করি। আর পোলাপান। দুইডার লেইগা যে আমার কী মায়া লাগে রে ভাই। মাস্টার যেমুন ভাল মানুষ, আছিয়া বুজি তার থিকাও ভাল মানুষ। এমুন দুইডা ভাল মানুষরে কেন যে আল্লায় দুইডা পঙ্গু পোলাপান দিল? আমি সারাদিন পোলাপান দুইডার লগে থাকি। অগো লেইগা যা পারি। করি। হারাজীবন চুরি কইরা টেকাপয়সা রুজি করছি, ভাইরে সচ্ছল কইরা দিছি। অহন হেই হগল টেকাপয়সা জাগাজমিন থিকা যেডু পারি মতিমাস্টারের পঙ্গু পোলাপান দুইডার লেইগা খরচা করুম। লগে আমার নিজের পরিশ্রম। যেমতে পারি অগো বাঁচাইয়া রাখুম। অগো সেবাযত্ন যা লাগে করুম।
ইব্রাহিম খুশি মনে মাথা নাড়ল। খুব ভাল কাম, খুব ভাল। মুকসেদ বলল, একদিন রাইত্রে ওই বাইত্তে গেছি। অনেক রাইত। গিয়া একটা খারাপ দৃশ্যও দেখছি মান্নান মাওলানার সীমানায়। যাইহোক, খারাপ দৃশ্যমূশ্য লইয়া আমি আইজকাইল আর মাথা ঘামাই না। ওই হগল দেকতেও চাই না। তয় যেইডা দেইখা ডরাইলাম হেইডা অইলো, মতি মাস্টারের উডানে অনেকটি ব্যাং ফালাইতাছে। আর পুব দিককার হিজল বউন্না ডুমইর ছিটকি টোসখোলা এই হগল জঙ্গল থিকা বিরাট একটা সাপ আইতাছে।
কন কী?
হ বেডা! কী সাপ চিনতে পারলাম না। সানকি অইতে পারে, জাইতও অইতে পারে। উডানে আইয়া সাপটায় টপাটপ টপাটপ ব্যাং গিলতে লাগল। দেইক্কা এমুন ডরাইলাম আমি। ওই জঙ্গলের পাশেই জামগাছতলায় পঙ্গু পোলাপান দুইডারে বহাইয়া রাখে মাস্টার সাবে। কোনদিন জানি পোলাপান দুইডারে সাপে খায়। এর লেইগা রোজ বিয়ানে দোফরে আর বিয়ালে বড় একখান বাশ দিয়া জঙ্গল পিডাই আমি। সাপসোপ থাকলে য্যান পলায়। আইজ বিয়ানে উইট্টা চিন্তা করছি, জঙ্গলডি আইজ আমি কাইট্টাই হালামু।
ইব্রাহিম অবাক। বাইষ্যার পানিতে জঙ্গল কাটবেন কেমতে?
কাডন যাইবো। কাইট্টা জঙ্গলের লগের ছোট্ট গড়ে (ডোবায়) জঙ্গলডি হালাইয়া রাখুম। বাইষ্যাকালের পানি নাইম্মা গেলে গড়ের ওই কাডা জঙ্গল ঝাঁকার কাম দিবো। মাছ পড়বো গড়ে। এককামে দুইকাম অইবো।
হ ভাল বুদ্দি।
মুকসেদ উঠল। তয় তুই যা রে টাকি। আমিও মাস্টার বাইত্তে যাই। গিয়া চা খাইয়া কামে লাগি।
ইব্রাহিমও উঠল। হ যান দাদা। আমি আইছিলাম আপনের সমবাত লইতে।
মুকসেদ হাসল। সমবাত লইছস?
ইব্রাহিমও হাসল। খালি লইছিনি, বিরাট লওন লইছি।
বুকপকেট থেকে টুপিখান বের করে মাথায় দিল মুকসেদ। আমিও তর সমবাত লইলাম। লইয়া খুশি অইলাম। একটা জীবন আমগো কাইটা গেছে খারাপ কামে। চুরি হ্যাঁচরামি, জেল মাইর। অহন শুরু অইছে আরেকটা জীবন। এই জীবনডা অইলো মাইনষের জীবন। আয় রে টাকি, আমরা দুইজন দুইজনের লেইগা দোয়া করি, বাকি জীবনডা আল্লায় য্যান আমগো মানুষ হিসাবে বাঁচাইয়া রাখে। মাস্টার বাড়ির জঙ্গল কাইট্টা, সাফ কইরা সাপসোপ যেমতে আইজ আমি খেদামু, আল্লায় য্যান ঠিক অমুন কইরা আমগো মন থিকা বেবাক গুনার কাম খেদাইয়া দেয়।
.
আজ সকাল থেকেই ঠাঠা পড়া রোদ।
চইত বৈশাখ মাসের মতন গরম। আশমানের দিকে তাকালে মনেই হয় না শ্রাবণমাস। এইরকম দিনে সকাল দশটার দিকে এনামুল এসে হাজির। শ্রীনগর বাজারের ওদিকে তার এক বন্ধুর বাড়ি আছে। বন্ধুর নাম নূর ইসলাম। নূর ইসলামদের বাড়িতে গাড়ি রেখে রিকশা নিয়া মেদিনীমণ্ডল চলে আসছে। লগে একটা ব্রিফকেস। জাহিদ খাঁ-র বাড়ি বরাবর রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটাচ্ছে, তাকে দেখতে পেল হাজামবাড়ির আবদুলের বড়পোলা আলালদি। সারারাত বিলের বাড়ির ওদিকে দাঐন বাইয়া বিয়ানবেলা বাড়ি ফিরেছে বাপপুতে। মাজেদার দেওয়া তিনশো টাকা নিয়া সেই যে দান বাওয়ার কাজ শুরু করেছিল, আল্লার রহমতে সেই তিনশো টাকার বরকতে আবদুলের সংসারের চেহারা বদলাইয়া গেছে। মাজেদাকে তিনশো টাকার লগে দশবিশ টাকা করে যা লাভ দিয়েছে তাতে মাজেদার টাকা হয়েছে পাঁচশোর ওপর। মাজেদা তো খুশিই, আবদুল আর আলালদ্দির খুশির অন্ত নাই। সারারাতে বাপপুতে মাছ যা ধরে, কোনও কোনওদিন তিন-চারশো টাকা তরি হয়ে যায়। কে বলেছে দেশগ্রামে মাছ নাই? ইরির চাপে, সার আর কীটনাশকের ঠেলায় বিল বাওয়েরের মাছ সব পলাইছে! এখনও তো বিলে দাঐন বাইতে গেলে মাছ। ভালই ধরে।
