টিপা হি হি করে হাসল। তুমি বইবা না, নানা? ইব্রা নানায় একলা বইবোনি?
মুকসেদ মুগ্ধ। আরে বেড়া, তুই তো বিরাট চালাক। হ আমারও তো বহন লাগবো।
আকাশ আজও মেঘলা। রোদ ওঠে নাই। আকাশের একদিক থেকে আরেকদিকে কানিবকের মতন উড়ে যাচ্ছে মেঘ। যখন তখন নামবে। আবার হয়তো এইদিকটায় নামলই না, অন্যদিকে গিয়া নামল।
পিঁড়িতে বসেই শার্টের বুকপকেট থেকে কেঁচি (সিজার্স) সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল ইব্রা। মুকসেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়া বলল, নেন দাদা, সিকরেট খান।
নারে টাকি, সিকরেট আমি ছাইড়া দিছি।
কন কী?
আরে হ বেড়া।
তামুক?
তামুকও ছাড়ছি।
আমার তো বিশ্বাসই অইতাছে না।
হোন বেড়া, চুরির নিশাই যহন ছাড়তে পারছি তয় এই হগল বিড়ি সিকরেট পান তামুক এই হগল পারুম না ক্যা?
আপনে পারেনও দাদা।
ইব্রাহিম নিজে সিগ্রেট ধরাল।
মুকসেদ বলল, তয় চা’র নিশাডা আমার আছে। তাও বেবাকতের হাতের চা না। দোকানের চা না। আছিয়াবুজির চা।
আছিয়াবুজিডা আবার কেডা?
মতিমাস্টারের বউ।
মতিমাস্টার, আছিয়া আর হিরা মানিকের কথা ইব্রাকে বলল মুকসেদ। সবই বলল। নিজের বউর কথা তার মনেই পড়ে না। মারা গেছে কত বছর আগে। শ্বশুরপক্ষের লোকজনও মুকসেইদ্দা চোরের লগে সম্পর্ক রাখে নাই। পোলাটারে নিয়া গেছে তার ফুফু। সেই বোনও মুকসেদকে ভাই হিসাবে স্বীকার করে না। শ্বশুরবাড়ির দিক নাই, একমাত্র বোনের দিক নাই, আছে শুধু ভাই জমসেদ আর তার আট ছেলেমেয়ে। মেয়ে তিনটা আর তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন কতটা স্বীকার করে না করে কে জানে, তবে জমসেদের পোলাপান আটটা খুবই মান্যগণ্য করে মুকসেদকে। তাদের জায়গা সম্পত্তি সংসারের আয় উন্নতির মূলে যে মুকসেদের বিরাট অবদান এটা আর ভোলে নাই। মুকসেদ এই বাড়িতে রাজার হালেই থাকে। আর এবার জেল থেকে ফিরা আসার পর থেকে যে চুরির কাজ ছেড়ে দিয়েছে সে এটা দেশগ্রামে রটে গেছে। তাতে সবাই খুবই খুশি। মতি মাস্টারের মতন একজন ভাল মানুষের লগে মিলামিশা করছে, তার প্রতিবন্ধী পোলাপান দুইটারে জান দিয়া ভালবাসে, আগলাইয়া রাখে এসব কথা শুনে মানুষ ধীরে ধীরে মুকসেদের অতীত ভুলতে শুরু করেছে। দিনে দিনে পুরাটাই হয়তো ভুলে যাবে। মানুষের খারাপ দিকটা বেশিদিন মানুষ মনে রাখে না, ভাল দিকটাই রাখে।
জমসেদের জায়গা সম্পত্তি টাকা পয়সার অর্ধেকের অংশীদার মুকসেদ। তবে ওইসব নিয়া সে কখনও কোনও দাবি করে না। বাড়িতে তাকে একটা ঘর দিয়া দিছে জমসেদ। খাওয়াদাওয়া মানসম্মান সব ঠিক আছে। নগদ টাকাপয়সার দরকার হলেই জমসেদ দেয়। মতি মাস্টারের সংসারের জন্য এই তো কয়দিন আগে দুই বস্তা চাউল নিয়া গেল মুকসেদ, ওই নিয়া কেউ কোনও টু শব্দও করল না। তার বদলে ফেলা জীবন ভালই কাটাচ্ছে মুকসেদ। মনের মতন কাটাচ্ছে। গভীর আনন্দে।
এসব শুনে ইব্রাহিম আরও অবাক। তয় তো দাদা একদমই অন্য জীবন অইয়া গেছে। আপনের।
হ বেড়া। তয় কী কইতাছি তরে। জিন্দেগিতে তো ভাল কাম কিছুই করি নাই। খালি মাইনষের মাথায় বাড়ি দিছি। গরিব গিরস্ত মানুষ ধান বেইচ্চা টেকা আইন্না রাখছে ঘরে, সিং (সিধ) দিয়া হেই ঘরে ঢুইক্কা টেকাডি চুরি কইরা লইয়াইছি। গিরস্তের মাথায় বাড়ি। হেরা খাইয়া বাঁচলো না মরলো চিন্তা করি নাই। গরিব গিরস্তে মাইয়া বিয়া দিব, সোনাদানা, পিতলের কলস, তামার থাল বেবাক চুরি কইরা লইয়াইছি। দিঘলি গিয়া তুই হেই হগল বেইচ্চা টেকা আনছস। আমার অন্য শাগরেদগো লগে তুইও ভাগ পাইছস। জিন্দেগিতে পাপের আকাল নাই আমার। জানি না হেই হগল পাপের মাপ, গুনার মাপ আল্লায় আমারে করবো কি না! তয় অহন থিকা যেই কয়ডা দিন বাঁইচ্চা থাকতে পারুম হেই কয়ডা দিন জানা মতে কোনও গুনা করুম না।
ইব্রা ফুক ফুক করে সিগ্রেটে দুইটা টান দিল।
টিপা ছেলেটা তিন-চার হাত লম্বা কঞ্চির একটা ছিপের মাথায় চিকন সুতায় বাঁধা বঁড়শি নিয়া বারবাড়ির দিককার আমগাছতলায় চলে গেছে। আধার নিছে একমুঠ পান্তাভাত। রাতভর পানিতে ভিজে ভাতগুলি গোটা গোটা হয়েছে। ওই ভাত বঁড়শির আধার। এই আধার পুঁটিমাছে টপাটপ খায়।
একবার টিপার দিকে তাকাল মুকসেদ। তারপর ইব্রার দিকে তাকিয়ে বলল, খালি তো আমার প্যাচাইলই পারতাছি রে টাকি। তর খবর কী? তর কথা তো কিছু কইতাছস না?
সিগ্রেটে শেষটান দিয়া উঠানের মাটিতে ডলে ডলে নিভাল ইব্রা। আমি দাদা ভালই আছি। তিন মাইয়ার বিয়া দিছি কত আগে। বড় মাইয়ার বিয়া অইছে আমগো বাইত্তেঐ, চাচাতো ভাই ইনুসের পোলা রমজানের লগে। অর নাম তো আপনের মনেই আছে।
আরে হরে টাকি। তর তিন মাইয়ার নাম আমার মনে আছে। ফরিদা আরজু গুনাই। তর বউর নামও মনে আছে। জহুরা। কী রে, নাম ঠিক কইছি না?
ইব্রা হাসল। হ। একদম ঠিক।
হেয় তো নাতিনাতকুড় লইয়াঐ আছে, নাকি?
হ।
তর মিহি চাইয়া দেহে?
আগে দেখতো না। অহন ইকটু ইকটু দেহে।
ঢাকায় জহুরার ভাইর বাসায় গিয়া না তুই আগে থাকতি?
হ। ঢাকা গেলে অহনও থাকি।
ঢাকা যাচ ক্যা?
কায়কারবার করার চেষ্টা করতাছি।
কী কায়কারবার?
ইসলামপুরে কাপড়ের দালালি। আমার সমন্দি করে। কামাই রুজি ভাল। আমি ওই লাইনডা ধরনের চেষ্টা করতাছি।
ভাল ভাল। ঢাকায় থাকনের চেষ্টাই কর। তয় চুরির বদলামডা তরও ঘুচবো।
