শুনে এত মুগ্ধ হল দবির, কয়েক পলক মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাসিমুখে প্রত্যেকটা গাছের গলায় হাঁড়ি ঝুলাল, যত্ন করে ভার তুলল কাঁধে। যাই বুজি, বিয়ালে তো দেহা অইবোঐ।
মরনি বলল, যাওন নাই। তয় আমার বাড়ির রস আপনে ইট্টু মুখে দিলে পারতেন। রসটা কেমুন পড়ল বোজতাম।
ঠিক তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে এল মজনু। চোখে ঘুম লেগে আছে। এক হাতে চোখ ডলছে। মজনুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে দবির বলল, ঐ যে তোমার বইনপো উটছে। অরে খাওয়াও। আমি একজন মাইনষেরে কথা দিছি, তারে রস না খাওয়াইয়া নিজে মুখে দিমু না।
কারে কথা দিছেন? মাইয়ারে?
না গো বুজি, আছে আরেকজন। বিয়ালে কমুনে তোমারে।
ভার কাঁধে দ্রুত হেঁটে দবির তারপর চকে নেমেছে। এই সময় হাঁটার গতি এত বাড়ে দবির গাছির, যেন হাঁটে না,সে দৌড়ায়। কাঁধে রসের ভার থাকার ফলে পালকির বেহারাদের মতো মুখ দিয়ে তার হুমহাম শব্দ বের হয়। তীব্র শীতের সকালেও গায়ে থাকে না সুতার তেনাটি (জামা অর্থে)। গা ভিজা থাকে জ্যাবজ্যাবা ঘামে। এই বছরের শীতের প্রথম দিন আজ। রসের প্রথম দিন। পরিশ্রমটা আজ বেশিই যাবে দবির গাছির। কয়েক দিন গেলে এই পরিশ্রম আর গায়ে লাগবো না। সয়ে যাবে। শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহাবেন তাহাই সয়।
ভোরবেলার দেশ গ্রাম তখনও জেগে ওঠেনি। চারদিক ডুবে আছে কুয়াশায়। খোলা চকমাঠ, ছাড়াবাড়ির গাছপালার আড়াল আর গিরস্তবাড়ির কোণাকানছিতে (আনাচ কানাচে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার একটু একটু করে সরছে। পায়ের তলার মাটি আড়মোড় ভাঙছে। এই মাটির ওপর দিয়ে ভার কাঁধে ছুটে যায় এক মাটির সন্তান। এইবাড়ি যায় ওইবাড়ি যায়, রসের নেশায় মাতাল হয়ে খাজুরগাছে চড়ে, হাঁড়ি নামায়। দুনিয়ার আর কোনওদিকে খেয়াল থাকে না তার।
মিয়াদের ছাড়াবাড়ির কাছাকাছি আসতেই রোদ উঠে গেল। রোদের আলোয় দূর থেকে বেঁকা গাছটার হাঁড়িতে বুলবুলি পাখিটাকে রসে ঠোঁট ডুবাতে দেখল দবির। দেখে গভীর আনন্দে বুক ভরে গেল। পয়লা দিনই এত রস পড়ছে! গলা তরি ভরছে ঠিল্লা! এই গাছের পা ছুঁয়ে যে দয়া চেয়েছিল দবির গাছ তা হলে সেই দয়া করেছে।
বুক ভরে শ্বাস নিল দবির। গাছটাকে বলল, মা মাগো, আল্লায় তোমারে বাচাইয়া রাখুক মা। রোজ কিয়ামতের আগতরি বাইচ্চা থাকো তুমি।
দ্রুত হেঁটে খাজুরতলায় এল দবির। এসেই আলফুকে দেখতে পেল খাজুরতলায়। বসে বিড়ি টানহে। পায়ের কাছে কাত হয়ে পড়ে আছে পিতলের বড় কলসি। দবিরকে দেখে হাসল। এত দেরি করলা ক্যা গাছি?
কাঁধের ভার নামিয়ে দবির বলল, বেবাক কাম সাইরা তার বাদে আইলাম। তুই আইছস কুনসুম?
আর কইয়ো না, বিয়াইন্না রাইত্রে কুট্টিরে দিয়া ডাক পারন শুরু করতাছে বুজানে। রসের চিন্তায় রাইত্রে মনে অয় ঘুমাইতে পারে নাই।
বুজান অহনতরি ঢাকা যায় নাই?
না। রস না খাইয়া যাইবো নি?
এত রস কাঁচা খাইবো?
পাগল অইছো! দুনিয়ার কিরপিন মানুষ। নিজে একলা আদা (আধা) গেলাস খাইয়া বেবাক রস কুট্টিরে দিয়া জ্বাল দেওয়াইবো। তোয়াক (গুড় করার আগের অবস্থাটিকে বলা হয়। আসলে তরল গুড়) কইরা রাখবো। পয়লা পয়লা কহেক বতল তোয়াক বানাইবো তার বাদে বানাইবো খালি মিডাই। শীতের দিনে কুট্টির খালি এই কাম। আর আমার আইয়া কলস লইয়া বইয়া থাকতে অইবো খাজুরতলায়।
দবির আর কথা বলল না। বেঁকা গাছটার পায়ের কাছে হাত দিয়ে সালাম করল তারপর তড়তড় করে উঠে গেল গাছে। বুলবুলি পাখিটা তখন আর নাই। কোন ফাঁকে উড়ে গেছে।
এই বাড়ির কাজ সারতে সারতে বেলা আরও খানিকটা বাড়ল। প্রথম দিন হিসাবে রস ভালই পড়েছে। আলফুর কলসি প্রায় ভরে গেছে। দবিরের চারখান ঠিলা পুরা ভরেনি। তবু মন প্রফুল্ল তার। মনে মনে গাছগুলিকে শুকরিয়া জানিয়ে ভার কাঁধে তুলল।
আলফু বেশ কায়দা করে নিজের কলসিটা কাঁধে নিয়েছে। বাড়িমুখি হাঁটতে হাঁটতে বলল, কই যাইবা গাছি?
দবির বলল, যামু এক জাগায়। পয়লা দিনের রস একজন মানুষরে খাওয়ান লাগবো।
.
১.২৫
বড় ঘরের সামনে, মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে বসে বিলাপ করতাছে বানেছা। এভাবে ছড়িয়ে বসার ফলে তার সাত সোয়াসাত মাসের পেট ডিমআলা বোয়াল মাছের পেটের মতো বেঢপ হয়ে আছে। থেকে থেকে বুক চাপড়াচ্ছে সে, মাটি চাপড়াচ্ছে। প্রায়ই তার বুক থেকে, পেট থেকে সরে যাচ্ছে শাড়ি। ইচ্ছা করেই যেন তা খেয়াল করতাছে না সে। বিলাপ করে কাঁদছে ঠিকই তবে চোখে একফোঁটা পানি নাই।
অদূরে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আজিজ, চোখে নিঃশব্দ কান্না। তার হাতের কাছে রাখা আছে তামা পিতলের ভার। ভার কাঁধে সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়েছিল, রোজকার মতো গাওয়ালে যাবে, যাওয়া হয়নি। তার আগেই হামেদ দৌড়ে এসে বলল, বাবা ও বাবা, দাদী দিহি ল্যাংটা অইয়া পইড়া রইছে।
শুনে চমকে উঠেছে আজিজ। কোনহানে?
ঐ ঘরে, মুখের সামনে কাইত অইয়া রইছে মাইট্টা তেলের হাড়ি।
কচ কী?
হ।
ল তো দেহি।
উঠানের কোণে ভার নামিয়ে ঢেঁকিঘরে গিয়ে ঢুকেছে আজিজ। ঢুকে দেখে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে ছনুবুড়ি। গায়ে কাপড় নাই। একপাশে পড়ে আছে তার বিছানা আর ছেঁড়াকাঁথা। ছনুবুড়ির মুখের কাছে কাত হয়ে পড়ে আছে মাইট্টাতেলের হাঁড়িটা। একফোটা তেলও নাই হাঁড়িতে। বড় ঘরের পশ্চিম উত্তর কোণার খাম ঘুণে ধরছে। একদিন গাওয়ালে না গিয়া খামে মাইট্টাতেল লাগারে আজিজ এই ভেবে কোলাপাড়া বাজার থেকে দুই তিনদিন আগে তেলটা কিনে এনেছিল। সেই তেল ফেলে দিয়েছে ছনুবুড়ি ভেবে প্রথমে খুব রেগে গেল আজিজ। রেগে গেলে দাঁতে কটমট শব্দ হয় তার। সেই শব্দ করে চাপা গলায় বলল, ওমা, কেন ঘুমান ঘুমাও? শইল্লে কাপোড় থাকে না, পোলাপানে আইয়া ল্যাংটা দেহে, শরম করে না তোমার! তেলের হাড়িডা হালায় দিছো! পাশসিকার (পাঁচসিকা) মাইট্টাতেল কিন্না আনলাম পশশু, বেবাকটি হালায় দিলা! কেমুন ঘুমান ঘুমাও!
