ছাতি হাতে নৌকা থেকে নামলেন মতি মাস্টার। মুকসেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনে নামবেন না দাদা।
নামতাছি।
নৌকা থেকে নেমে নৌকাটা হ্যাঁচকা টানে একটুখানি চটানে তুলে রাখল মুকসেদ। পানির টানে যাতে ভাইসা না যায়। তারপর মতি মাস্টারের পিছন পিছন উঠানে উঠল। উঠান থেকে রোদ উঠে গেছে গাছের মাথায়। শেষ বিকালের নরম আলো চারদিকে। এই আলোয় জামগাছতলায় হিরা-মানিকের লগে খেলছে পারুর ছোটমেয়ে নূরি। বছর ছয়েক বয়সের মেয়েটা একদমই মিশা গেছে প্রতিবন্ধী ভাইবোন দুটির লগে। তাদের মতো করে কথা বলে, তাদের মতো করে হাসে। হিরা মানিক বোঝে নূরির কথা, নূরিও বোঝে হিরা মানিকের কথা। একেকজন একেকজনকে দেখলে এত খুশি হয়!
মুকসেদকে দেখলেও খুশিতে ফেটে পড়ে হিরা-মানিক। যেন তাদের কত আপন মানুষটি তাদের কাছে ফিরেছে। পারুর মেয়েটিও মুকসেদকে দেখলে হিরা-মানিকের মতোই খুশি হয়।
এখনও হল।
বাড়িতে উঠে মতিমাস্টার একবার আমতলার দিকে তাকালেন, তারপর চলে গেলেন বড়ঘরে।
মতি মাস্টার আর মুকসেদকে দেখে আছিয়া দৌড়ে গেছে রান্নঘরে। দুইজন মানুষের জন্য চা বানাবে, একথাল করে মুড়ি দিবে। ঘরের সামনের তক্তায় বসে চা মুড়ি খাবে দুইজনে, গল্পগুজব করবে। হিরা মানিককে দিতে হবে না কিছুই। বিকালে মুড়ি মিঠাই তারা খেয়েছে। আর এখন তো মুকসেদ বাড়ি ফিরেছে, এখন তাদের আছে অন্য আকর্ষণ।
আমতলায় এসেই শিশু তিনটির মতো করে তাদের মাঝখানে মাটিতে বসে পড়ল মুকসেদ। হিরা মানিক ছেড়ে পেছড়ে একজন এল তার কোলের কাছে, একজন এল পিঠের কাছে। নিজেদের অথর্ব হাত দিয়া জড়াইয়া ধরতে চাইল মুকসেদকে। নূরি দাঁড়িয়ে রইল দূরে। হিরা-মানিক তখন তাদের অবোধ্য ভাষায় শব্দ করছে। মুকসেদের শার্ট লুঙ্গি ধরে টানাটানি করছে। মুকসেদ ছেলেমানুষি কায়দায় হাসতে হাসতে বলল, ওলে আমাল সোনালে, ওলে আমার মানিকলে, দিতাছি মা, দিতাছি। বাজান তোমারেও দিতাছি। এই যে দেহো কী আনছি আইজ। এই যে দেহো।
শার্টের ঝুল পকেট থেকে একমুঠ লজেন্স বের করল মুকসেদ। দুই ভাইবোন থাবাথাবি শুরু করল সেই লজেন্স নিয়া। একজনে একটা ধরে তো দুইটা ছিটকা পড়ে মাটিতে। ওরা লেছড়ে পেছড়ে যায় সেই লজেন্সের কাছে। মুকসেদ সেই ফাঁকে ইশারা করে নূরিকে। নূরি গুটিগুটি পায়ে আগায়া আসে। একহাতের মুঠ থেকে দুইটা লজেন্স নূরিকে দেয় মুকসেদ। তিনটি শিশুর লজেন্স নিয়া আনন্দে ফেটে পড়া মুখ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। মনে মনে। ভাবে, এর থিকা সুন্দর দৃশ্য কি আল্লাহপাকের দুনিয়াতে আর আছে!
.
কী রে টাকি, খবর কী?
খানিক আগে বড় বড় দুই টুকরা ইলিশমাছ ভাজা দিয়া একথাল পান্তাভাত খেয়েছে মুকসেদ। লগে কাঁচা মরিচ পিঁয়াজ ছিল। খাওয়াটা দারুণ হয়েছে। আজ শুক্রবার। মতি মাস্টারের ছাত্র পড়াবার কাজ নাই। সারাদিন বাড়িতেই থাকবে। মুকসেদও থাকবে সেই বাড়িতে। অন্য একটা পরিকল্পনা আছে তার। এজন্য একবারে টাইট করে খেয়ে নিছে। এখন মাস্টার সাবের বাড়িতে গিয়া আরামছে এককাপ চা খাবে তারপর কাজে নামবে। আছিয়াবুজি চা-টা যা বানায় না! তুকখ্খার (তুখোড়)! পানি ফুটে ফুটে যখন টগবগ টগবগ শব্দ ওঠে তখন ছাড়ে চা-পাতা। চিনি আগেই দিয়া দেয় পানিতে। চা-পাতা গাঢ় খয়েরি রং। হওয়ার পর দেয় ঘন দুধ। তুকখার চা, তুকখৃখকার।
সেই চায়ের লোভে মাত্র ঘর থেকে বের হয়েছে মুকসেদ, ইব্রাজোলা এসে হাজির। ঘাটপারে ডিঙ্গিনৌকাখান রেখে উঠানে উঠছে। ঝুলপকেটঅলা নীল শার্টের বুতাম লাগাতে লাগাতে মুকসেদ মাত্র ঘর থেকে বের হয়েছে, দেখে ইব্রা এসে উঠছে। ইব্রা কথা বলবার আগেই সে খুবই ফুর্তির গলায় প্রশ্নটা করল।
ইব্রা লাজুক হাসল। আছি দাদা, মন্দ না।
তুই তো কোনওদিনও মন্দ আছিলি না বেড়া! মন্দ আছিলাম আমি। চুরি কইরা ধরা পড়তাম, মাইরা ধইরা মাইনষে হাড্ডিগুড়ি গুড়াগুড়া করতো, থানায় দিতো, ওহেনে পিডাইতো পুলিশে, তারবাদে জেল। আমার জিন্দেগি তো মাইর খাইতে খাইতে গেল রে! আর তুই আছিলি টাকি মাছের লাহান। খালি পিছলাইয়া যাইতি। কোনওদিন ধরা পড়ছ নাই, কোনওদিন একখান কিলতা খাচ নাই। বউ পোলাপান নাতি নাতকুড় লইয়া আরামের জীবন। আমি করতাম চুরি, হেই মাল বেইচ্চা ফোকটে (ফাউ) টেকা কামাতি।
ইব্রা কথা বলল না, হে হে করে হাসল।
তয় হেইদিন আমার নাইরে টাকি। চুরির কাম আমি ছাইড়া দিছি। ভদ্রলোকরা চাকরি থিকা রিটার (রিটায়ার) করে না, ভাল বাংলায় কয় অবসর গ্রহণ, আমি চুরির চাকরি থিকা রিটার করছি। অবসর গ্রহণ করছি। অহন জমসেদের সংসারে থাকি আর মতি মাস্টারের কাছে মানুষ হওনের পড়াডা পড়ি।
জমসেদের সইজ্জা মেয়ের নাম করিমন। বিয়া হইছে দামলা গ্রামে। জামাইর লগে বনিবনা হয় না। একটা মাত্র পোলা করিমনের। বছর সাতেক বয়স। ভারী টরটইরা (চঞ্চল) পোলা। নাম টিপু। বাড়ির সবাই ডাকে টিপা। মুকসেদের খুবই বাধুক টিপা। মুকসেদের লগে বসে সেও পান্তাভাত আর ইলিশমাছ ভাজা খাইছে। এখন উঠানে দৌড়াদৌড়ি করছে। মুকসেদ বলল, ওই টিপা, ইব্রা নানারে একখান ফিরি দে।
দিতাছি নানা।
দৌড়ে গিয়া দুইখান পিড়ি নিয়া আসল টিপা।
মুকসেদ অবাক। তরে কইলাম একখান ফিরি আনতে তুই দিহি আনলি দুইডা?
