এখন তারা ফিরল সীতারামপুর থেকে। সীতারামপুরের বদর কারিগরের ছোট ছেলেটাকে পড়ান মতিমাস্টার। শ্রাবণমাসে দেশগ্রামের ইসকুলগুলি বন্ধ থাকে। কাজির পাগলা স্কুল বন্ধ, খাইগো বাড়ির স্কুল বন্ধ। এইজন্য ছাত্রছাত্রীরা বাড়িতেই পড়াশুনা করে। সকাল বিকাল মিলাইয়া চারজন ছাত্রছাত্রী পড়ান মতিমাস্টার আর খাইগোবাড়ির স্কুলে মাস্টারি। সব মিলিয়ে টাকা যেটুকু পান, সংসার চলতেই চায় না। গনি মিয়া কিরপিন মানুষ। তাও বাড়িতে এলে পঞ্চাশ-একশো টাকা ধরিয়ে দিয়া যান, তাও ফুরিয়ে যেতে সময় লাগে না। সংসারের চাউল ডাইল বাজার হাট, খরচা কি কম! তব বড় একখান ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে মুকসেদ। সেই যে সাত-আটমাস আগে এক সকালে একখান টুপি মাথায় দিয়া আইসা বলল, মাস্টার সাব, আমি মানুষ হইতে চাই। আপনে আমারে মানুষ হওনের পথটা দেখান।
কী পথ মতি মাস্টার তাকে দেখাবে? যদি অল্প বয়েসি পোলাপান হত তা হলে না হয় পড়ালেখা শিখাতে পারত। মানুষ তো মানুষ হয় লেখাপড়া শিখেই। তারচেয়ে বয়সে বড় একজন মানুষ, দেশগ্রামের বিরাট নামকরা দাগি চোর তাকে কীভাবে মানুষ হওয়ার পথ দেখাবেন মতি মাস্টার? তিনি তো চব্বিশঘণ্টা আছেন প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে দুইটার চিন্তায়, বউর চিন্তায়। নিজেকে নিয়া চারজন মানুষ কীভাবে খেয়ে পরে বাঁচবেন এই চিন্তায়। এই অবস্থায় একটা দাগি চোর আইসা লগে ভিড়ছে। গনির সীমানার পরই তার বাড়ি। আর মতি মাস্টারের স্বভাব এমন, সে কোনও ব্যাপারে কাউকে না করতে পারে না। মুকসেদকে এড়ায় কেমন করে? আস্তে আস্তে এমন হল, মতি মাস্টার আর তার বউ আছিয়া উদিসই পেল না, মুকসেদ তাদের সংসারের মানুষ হয়ে গেল। বাজারে গেছে, হঠাৎ মাঝারি সাইজের একখান বোয়ালমাছ কিনা নিয়া হাজির। মতির বউ হবে তার মেয়ের বয়সি, তাকে ডাকে বুজি। বোয়ালমাছ এনে রানঘরের সামনে ফেলে বলল, ভাল কইরা রান্দো বুজি। বেবাকতে মিলা খামু নে।
মাছ রানতে যে তেল মশলা লাগে, পিঁয়াজ লাগে মতির ঘরে সেইসব আছে কি না ভাবে না। আর আসল জিনিস যেটা, চাউল, চাউল আছে কি না তারও তো খবর নাই মুকসেদের। তখন হয়তো দুপুরবেলার ঠা ঠা রোদ। হিরা মানিক জামতলায় রোদে পুড়েছে। কুলে করে তাদেরকে হয়তো ঘরে নিতে হবে, তার আগে পুকুরঘাটে নিয়া গোসল করাতে হবে, আছিয়া সেই কাজ করবে না বোয়াল মাছ কুটবে! মতি মাস্টার তখনও বাড়িই ফিরে নাই।
আছিয়া পড়ে বিপাকে।
মুকসেদ প্রথম প্রথম এইসব বুঝত না। দিনে দিনে বুঝে গেল। এখন কোনও কোনওদিন হিরা মানিককে কুলে করে ঘর থেকে বের করে আনে সে, জামতলায় বসিয়ে দেয়। রোদ বৃষ্টিতে কুলে করে ঘরে নিয়া যায়। পুকুরঘাটে নিয়া মানিকরে কত সুন্দর করে গোসল করায়। হিরা মেয়ে। প্রতিবন্ধী হোক আর যাই হোক, মেয়ে তো, ষোলো-সতেরো বছর বয়স, তার কাজগুলি আছিয়াই করে। প্রতিবন্ধী হিরা মানিক অবোধের মতন এত কিছু করে, মুকসেদ বিরক্ত তো হয়ই না, তাদের মতন আচরণ করে, তাদের মতন হয়ে যায়। তাদের লগে শিশুর মতন খেলে, খলবল খলবল করে হাসে। মানিকের গুমুত সাফ করে, হোচাইয়া (শৌচকর্ম) দেয়। মতি আর আছিয়া বিস্মিত চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।
ইরি ধান ওঠার পর একদিন আড়াইমনি বস্তার দুই বস্তা চাউল নিয়া আসল। কাজির পাগলার চাউল কলে ধান ভাঙাতে গিয়েছিল মুকসেদের ভাই জমসেদ। বছর চলার ধানটা একবারেই ভাঙিয়ে ফেলে সে। মুকসেদের কারণে জমসেদের সংসার সচ্ছল। আটজন পোলাপানের মধ্যে তিনটা মেয়ে, তাদের বিয়া দিয়া দিছে, বড় মাজারো পোলা বিয়া করছে, পোলাপানের বাপ হইছে। ধানের জমি, গোরুবাছুর নগদ টাকাপয়সা কোনও কিছুর কমতি নাই সংসারে। তিন ছেলে জমসেদের লগে গিরস্তি করে। চার নম্বর পোলা ঢাকায় ব্যাঙ্কের দারোয়ান। ছোটটা মাওয়ার বাজারে চায়ের দোকান দিছে। তবে তারা সবাই মুকসেদকে খুবই মান্য করে। বউ পোলাপান নিয়া মহাসুখে আছে জমসেদ। তবে ভাইয়ের প্রতি বিরাট কৃতজ্ঞতা তার। ভাই যা বলে তাই সই (সঠিক)। ভাইয়ের কথার উপর দিয়া পরিবারের কেউ কোনও কথা বলে না। চুরি ছাইড়া দিয়া মুকসেদ যে মতিমাস্টারের সংসারে ঢুকছে, ওইসব নিয়া আছে এই কারণে জমসেদ আর তার বউ পোলাপানও খুশি। কারণ চোরের বদনাম এই করে করে মুকসেদের একদিন ঘুচলে সুবিধা তাদেরও। মুকসেইদ্দা চোরার ভাই ভাইস্তা এইসব পরিচয় আর থাকবে না। থাকুক মুকসেদ মতি মাস্টারের সংসারে। হিরা মানিককে নিয়া ব্যস্ত থাকুক। বুড়া বয়সে হলেও মানুষ হোক।
মুকসেদের কারণে সংসারের চেহারা বদলে যেতে লাগল মতিমাস্টারের। চাউল ডাল, বাজার সওদা, মাছ তরকারি সবই ধীরে ধীরে মুকসেদ আনতে লাগল। হিরা মানিকের জামা কাপড়, আছিয়ার জন্য শাড়ি, মাস্টার সাবের জন্য পায়জামা পানজাবি লুঙ্গি, নতুন একখান ছাতি আর একখান কোষানাও, নিজের সংসারে মুকসেদ কোনওদিনও যা করে নাই। সবই মতিমাস্টারের জন্য করছে। বউ মরেছে সেই কবে, তার কথা মুকসেদের মনে নাই। একমাত্র ছেলেটা আছে টেকনাফে ফুফুর কাছে, শুঁটকি মাছের কারবার করে। বাপ বলে যে একটা লোক আছে, মনেও রাখে নাই। রাখইন মাইয়া বিয়া কইরা সংসারী হয়ে গেছে। একটি অসহায় শিক্ষক পরিবার, তাদের দুটি প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েকে নিয়া এই বয়সে মুকসেদ নিজের জন্য নতুন একটা জগৎ তৈরি করেছে। তাদেরকে নিয়া নিজের মতন করে বাঁচছে, মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছে। আর এই ঘটনা দেশগ্রামের সব মানুষই জেনে গেছে। জেনে খুশি তারা। কোনও কোনও চোর যে ধর্মের কাহিনিও শোনে মুকসেদ তার প্রমাণ।
