তর বিয়ার দায়িত্ব বলে মন্তাজ কাকার? অর মারে তুই দেহচ, সে তোর বিয়া দিয়া দিবো।
হেইডারও ঠিক নাই।
ক্যা, ঠিক নাই ক্যা?
দাদি মরলে তারবাদে সেন আমারে লইয়া কাকায় চিন্তা করবো। হের মরণের কি ঠিক আছে? কাইলও মরতে পারে, আবার এই অবস্থায় পাঁচ-দশ বচ্ছর বাঁইচাও থাকতে পারে।
হ এইডা ঠিক। মাইনষের বাঁচন মরণের কথা আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেঐ জানে না।
তয় ভাবিছাব আপনেরে আমি একখান কথা কই। এই যে খরালিকালে আমি চকের মিহি চাইয়া থাকি, বাইষ্যাকালে চাইয়া থাকি, এই চাইয়া থাকতে থাকতে আমার খালি মনে অয়, আমি একদিন কেরে কিছু না কইয়া এই চক দিয়া হাইট্টা যামু গা।
পারু চমকাল। কই যাবি গা?
হেইডা আমি জানি না।
কী?
হ। আমি জানি না আমি কই যাইতে চাই। তয় যাইতে চাই।
তগো বাইত্তে যাইতে চাছ?
না।
অন্য কোনও আততিয় বাইত্তে?
না তাও না।
তয় কই যাইতে চাছ?
কইলাম না, হেইডা আমি জানি না। তয় যাইতে চাই। কই যে যাইতে চাই জানি না।
পারু হাসল। ধুরো ছেমড়ি। তুই একটা পাগল।
ফিরোজা কথা বলল না, হাসল। এই কথাডা আমি একদিন নিখিল দাদারে কইছিলাম আর আইজ কইলাম আপনেরে। আর কেঐরে কোনওদিন কই নাই।
চোখ মুখের সুন্দর ভঙ্গি করল পারু। কী লো ছেমড়ি, নিখিলের লগে ভাব চক্কর করছস নি? আ? মোসলমান মাইয়া অইয়া হিন্দু পোলার লগে পেরেম?
আরে না।
তয়?
তয় কী?
তার লগে কীয়ের এত কথা?
সে মানুষটা বড় ভাল ভাবিছাব। শয়তান বদমাইশ না। বদচোখে আমার মিহি কোনওদিন চায় নাই। খরালিকালে একবিকালে এহেনে এমতে খাড়ইয়া রইছি আমি, হেয় আইসা আমার সামনে খাড়ইলো। কথায় কথায় তারে আমি এই কথাডি কইছিলাম। হুইন্না হেয়ও আপনের লাহান অবাক অইছে।
তারপরই যেন পারুকে খেয়াল করে দেখল ফিরোজা। দেখে মুগ্ধ হল। ইস আপনেরে যা সোন্দর লাগতাছে না ভাবিছাব।
পারু লগে লগে বলল, সোন্দর তো লাগনের কথাঐ।
ক্যা, আথকা আইজ বেশি সোন্দর লাগবো ক্যা?
আথকা না, আমার হরি মইরা যাওনের কয়দিন আগে থিকাঐ আমারে সোন্দর লাগে। তুই খ্যাল কইরা দেহ নাই।
এইবার বুজছি। আতাহার দাদার লগে বিয়া অইবো এর লেইগা আপনে সোন্দর অইয়া গেছেন। বিয়ার আগে কোনও কোনও মাইয়া খুব সোন্দর হয়।
বিয়ার পরেও হয়।
সেইটা আপনেও অইবেন। আরও সোন্দর অইবেন। অবশ্য আপনে এমতেই সোন্দর। বিরাট সোন্দর। আতাহার দাদার ভাগ্যি ভাল আপনের লাহান বউ পাইতাছে।
খালি বউ না, মনের মানুষও।
হ, হেইডা তো জানিঐ। তয় আল্লার কাছে হাজার শুকুর, যারে আপনে মন দিছেন, যার লেইগা এতকিছু করছেন তার লগেঐ আপনের বিয়া হইতাছে। আপনের হরি একখান কামের কাম কইরা গেছে। হুজুরেও যে আপনের আর আতাহার দাদার মন বুইজ্জা বেবাক কিছু মাইন্না নিছে এইডাও আল্লার কুদরত। আল্লার ইশারা ছাড়া গাছের পাতা লড়ে না। আপনে ভাল মানুষ দেইখা আল্লায় আপনের মনের আশা পূরণ করছে। আপনেরে লজ্জা শরমের হাত থিকা বাঁচাইছে। দেশগেরামের বেবাকতেই কমবেশি আপনের আর আতাহার দাদার ঘটনা জানে। অহন বিয়াশাদি হইয়া গেলে এই হগল কথা আর কেঐ কইবোও না, মনেও রাখবো না। এইরকম ঘটনা দুনিয়াতে অনেক হয়। আপনের পোলাপান তিনডাও বড় অইয়া মনে কোনও দুঃখ পাইবো না। আপনেরে কোনও দোষ দিতে পারবো না। নাইলে বড় অইয়া অরা মনে করতো আমার মা’য় ভাল আছিল না, বাপরে ছাইড়া চাচার লগে সম্পর্ক করছে। অহন আপনের সবদিক ঠিক থাকবো। পোলাপানের কাছে কোনওদিনও ছোড অইতে অইবো না আপনের।
ফিরোজার কথা শুনে খুবই অবাক পারু। আরে এই মাইয়া তো দেকতে যত সাদাসিধা, বলদা পদের মনে অয়, আসলে তো তা না। মাইয়ার তো বুদ্দিসুদ্দি ভাল। বহুত কিছু চিন্তা করা মাইয়া। অর বাইরে এক রকম মনের মইদ্যে আরেক রকম! আল্লায় যে কার ভিতরে কী দিয়া রাখছে বাইরে থিকা দেইখা বোঝনের কোনও উপায় নাই। আইজ এই বিয়ালে ফিরোজার লগে কথা না কইলে তো অর ভিতরের এই চিন্তা ভাবনাগুলি জানা হইতো না।
পারুকে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফিরোজা হাসল। কী দেকতাছেন ভাবিছাব?
তরে।
আমারে নতুন কইরা দেহনের কী অইলো?
তরে এতদিন আমি যা ভাবছি তুই তা না।
কী ভাবছেন আমারে?
সোজাপদের মাইয়া।
আমি সোজাপদের মাইয়াঐ। বলদা।
আরে না। তুই খুবই চালাক মাইয়া। তর বুদ্দিসুদ্দি ভাল।
কেমতে বুজলেন?
তর কথা হুইন্না। যেই হগল কথা আমারে কইলি, কেঐরে লইয়া কেঐ চিন্তা না করলে এই হগল কথা কইতে পারে না। আমি বহুত খুশি অইলাম তর কথা হুইন্না।
আর আমি খুশি আপনের কথা চিন্তা কইরা। আল্লায় আপনের মনের আশা পূরণ করতাছে। আপনের মান সনমান বাঁচাইতাছে, পোলাপানের কাছে কোনওদিন আপনেরে ছোড করবো না, এইডা চিন্তা কইরা আমি বহুত খুশি।
মন্তাজদের বড়ঘর থেকে মন্তাজের বুড়ি মা অবোধ্য ভাষায় শব্দ করতে লাগলেন এসময়। সেই শব্দে চঞ্চল হল ফিরোজা। ওই যে দাদি উটছে। ডাক পাড়তাছে আমারে। ভাবিছাব, আমি গেলাম।
হ যা।
ফিরোজা দৌড়ে চলে গেল।
ফিরোজা চলে যাওয়ার পরও আমগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে রইল পারু।
৩.৫ শেষ বিকালে
শেষ বিকালে গনি মিয়ার ঘাটে কোষানাও ভিড়াল মুকসেদ। নামেন মাস্টার সাব।
মতিমাস্টার বসেছিল নাওয়ের মাঝখানকার পাটাতনে। কোষানাওখান কিনার পরই। নতুন বাঁশের চটি দিয়া সুন্দর করে মাচা করছে মুকসেদ। বেশ শক্তপোক্ত মাচা। আরামছে বসা যায়। মতিমাস্টার সেই মাচায় বসে থাকেন, রোদ বৃষ্টি থাকলে তার মাথায় পুরানা ছাতি। মুকসেদের ছাতির দরকার হয় না। মাথায় গোল একখান টুপি আছে ওই টুপি যেন। ছাতির কাজ দেয়। রোদ বৃষ্টি কিছুই যেন মাথায় লাগে না।
