বিকালবেলা সাজগোজের অভ্যাসটা পারুর আছেই। আজ সে কচুরিফুল রঙের শাড়ি পরেছে। তেল দিয়া সুন্দর একখান খোঁপা করছে, চোখে একটুখানি কাজল, কপালে ছোট্ট কালো টিপ, হাসি আনন্দে ঝলমল করা মেয়ে। আতাহারের লগে বিয়ার কথা ঠিকঠাক হওয়ার পর থেকে সে আর হাঁটে না, প্রজাপতির মতন উড়ে উড়ে বেড়ায়। মান্নান মাওলানা বাড়িতে না থাকলে খিলখিল করে হাসে। হাসি আনন্দে ফেটে পড়ে।
আজ মান্নান মাওলানা বাড়িতে। আতাহার নাও নিয়া গেছে, হাফিজদ্দিরে নিয়া গেছে। যদিও ছোট্ট আরেকটা কোষানাও আছে। ইচ্ছা করলে ওই নাও নিয়া বাইর হইতে পারেন হুজুরে। তবে বাইর হন নাই। এই তো কিছুক্ষণ আগে আছর নামাজের আজান দিলেন। নিজের ঘরে বসে নামাজ পড়লেন। এখনই রহিমাকে ডাকবেন চা নাস্তার জন্য।
শ্বশুরের বিকালের চা-নাস্তাও পারুই দেয় আজকাল। তবে পারুকে ডাকেন না মান্নান। মাওলানা। ডাকেন রহিমাকে।
এখনও ডাকলেন। রহি, চা-নাস্তা দে।
দিতাছি।
বলেই দৌড়ে রান্নঘরের দিকে গেল রহিমা। পারুর মাথার কাজ তখন একদমই শেষ। রহিমাকে বলল, পটে টোস বিসকুট আছে। চা আর তিন-চাইরখান টোস বিসকুট দেও। আমি ইট্ট গনি কাকাগো ওই মিহি যাই।
আইচ্ছা যান।
পারু তারপর যেন একটা উড়াল দিল। পুব-উত্তরের ঘরের মাঝখানকার চিপা দিয়া। মন্তাজদের সীমানার ওদিকটায় চলে এল।
এই দিকটা সব সময়ই নির্জন। মাত্র দুইজন মানুষের বাস। মন্তাজের বুড়া মা আর তার দেখভাল করবার জন্য যুবতী আত্মীয় মেয়ে ফিরোজা। খুবই নিরীহ চুপচাপ ধরনের। মেয়ে। গলার আওয়াজ তার শোনাই যায় না। নিঃশব্দে রান্নাবান্না করে, সংসারের কাজ। করে, বুড়ির নাওয়াধোওয়া খাওয়াদাওয়া সবই করায় এত সুন্দর করে, কোনও অভিযোগ নাই, ঝগড়াঝাটি মনোমালিন্য নাই বুড়ির লগে। অদ্ভুত একটা জীবন। সপ্তাহে সপ্তাহে ঢাকা। থেকে মন্তাজের লোক আসে মোবারক। সে আইসা হাটবাজার কইরা দিয়া যায়। সবই। জিয়ল মাছ দিয়া যায়। ঘোপা ভরা সেইসব মাছ একেকদিন একেক পদেরটা বের করে। ফিরোজা। কুটেকেটে রান্নাবান্না করে। তরিতরকারি, চিনি মিঠাই অন্যান্য খাবারদাবার ঢাকা
থেকে নিয়া আসে মোবারক। সাগরকলা, পাউরুটি, বিসকুট। বেপারি বাড়ির ইদরিস দুধ। দিয়া যায় সকালবেলা। মাসকাবারি পয়সা। সব ব্যবস্থা এত সুন্দর, মন্তাজের বুড়িমা যেমন আরামে আছে, ফিরোজাও আছে মন্দ না।
আজ বিকালবেলা গনি মিয়ার সীমানার দিকে যাওয়ার সময় পারু দেখে ফিরোজা দাঁড়িয়ে আছে উত্তর দিককার আমগাছটার তলায়। পরনে দুর্বাঘাসের মতন রঙের শাড়ি। আমগাছটার অদূরে, বাড়ির ঘাটে বর্ষার পানি। এদিকটায় দাঁড়ালে বিশাল চকমাঠের উত্তরে দোগাছি গ্রাম, উত্তর-পুবে সীতারামপুর, উত্তর-পশ্চিমে মেদিনীমণ্ডলের শেষ সীমানা দেখা যায়। বিকালবেলার রোদে মায়াবী হয়ে আছে চারদিক। চকেমাঠে গিরস্তের দুই-একখান নৌকা এদিক ওদিক যায়, বর্ষার পানিতে মাথা তুলে থাকা ঘাস বিচালি, ধইনচা হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খায়। কুব কুব করে ডাকে ডাহুকপাখি। এই বর্ষাভাসা খোলা চকমাঠের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ফিরোজা। কী দেখে কে জানে! কী ভাবে কে জানে।
পারু এসে তার পিছনে দাঁড়াল।
ফিরোজা এতটাই মগ্ন হয়ে আছে চকমাঠের দিকে তাকিয়ে, একজন মানুষ যে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে উদিসই পেল না। পারু একেবারে পোলাপানের ভঙ্গিতে পিছন থেকে ফিরোজার চুল ধরে টান দিল। চমকে পিছন ফিরে তাকাল ফিরোজা। হাসল। ও ভাবিছাব! আপনে আইলেন কুনসুম?
আইছি বেশিক্ষুন হয় নাই। পিছন থিকা তরে দেখতাছিলাম। তুই এমুন কইরা কী দেহছ রে? পেরায় পেরায়ই তরে দেহি এহেনে খাড়াইয়া চকের মিহি চাইয়া থাকচ।
দেখি না কিছুই, আবার বেবাকঐ দেহি। অহন দেহি বাইষ্যাকালের পানি, চক দিয়া দুই-একখান নৌকা যায়, হেই নৌকা দেহি। চকের কচুরিপেনা দেহি, ধইনচাখেত দেহি। আকাশ দিয়া পাখি উইড়া যায়, হেই পাখি দেহি। বাইষ্যাকালের পানিতে দুই একখান মাছে ডাব (ঘাই) দেয়, মাছের ডাব দেহি। আর দেহি ওই যে তিনমিহি তিনখান গেরাম, গেরামের বাড়িঘর, গাছগাছালি এই হগল।
এই হগল দেহনের কী আছে?
কী যে দেহনের আছে কইতে পারি না। তয় দেহি। চাইয়া চাইয়া দেহি। দেখতে ক্যান জানি ভাল্লাগে। যহন কোনও কামকাইজ থাকে না, একদোম আজাইর থাকি তহন এহেনে খাড়ইয়া চকের মিহি চাইয়া থাকি। এই চাইয়া থাকনটাই আমার আনন্দ।
একলা একলা চকের মিহি চাইয়া কী চিন্তা করচ?
তেমুন কিছু চিন্তা করি না ভাবিছাব।
নিজেগো বাড়িঘরের কথা চিন্তা করচ না, মা-বাপ ভাইবইনের কথা চিন্তা করচ না?
মাঝে মাঝে করি। সব সময় করি না।
ক্যা?
তাগো কথা আমার বেশি মনে পড়ে না।
তয় কী মনে পড়ে তর?
পারুর ঠোঁটে রহস্যময় একটু হাসি ফুটল। অন্য কেঐর কথা মনে পড়ে? তার কথা ভাবছ?
ফিরোজা অবাক হল। অন্য কার কথা মনে পড়বো? কার কথা ভাবুম?
বোজচ নাই?
না।
আরে ছেমড়ি আমি কইছি তর মনের মানুষের কথা। যারে তুই মন দিছস। যার লগে তর বিয়া হইবো।
এবার মিষ্টি করে হাসল ফিরোজা। আমার তো তেমুন কেউ নাই ভাবিছাব। মন দেওনের মতন মানুষ তো আমি অহনতরি পাই নাই। বিয়াশাদির কথাও চিন্তা করি না। আমগো মতন গরিব ঘরের মাইয়াগো বিয়াশাদির ঠিক আছেনি! দেহা গেল এই বাইত্তে কাম করতে করতে বুড়া অইয়া গেলাম তাও বিয়া অইলো না। বিয়ার বস গেল গা, এমনেই চেহারা সুরত সুবিধার না, বস অইলে চেহারা সুরত আরও বিগড়াইবো, তহন আর বিয়া করবো কে?
