বিকালবেলা যখন চার দোস্ত চকের মাঝখান দিয়া বাড়ি ফিরছে, দুপুরে ভাত না খাওয়া হাফিজদ্দি যখন ক্লান্ত ভঙ্গিতে বইঠা বাইছে, আকাশে এখন মেঘ নাই, বিকালবেলার রোদ বর্ষার পানির মতন নরম কোমল, পদ্মা থেকে হাওয়া আসছে, মাথার উপর দিয়া উড়ে যাচ্ছে পাখি, তখন আলমগীর একবার জিজ্ঞাসা করল, কনটেকদার সাবে এতক্ষণ ধইরা কী কইলো তরে?
আতাহার উদাস গলায় বলল, পরাইভেট (প্রাইভেট) কথা। কেঐরে কওন যাইবো না। তোমার ভাস্তি হাসু গেল কই? আর দিহি এই বাইত্তে আহে না?
বিকালবেলা বড়ঘরের ওটায় বসে পারুর মাথায় তেল দিয়া দিচ্ছে রহিমা। হাতের কাছে ছোট্ট একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে অনেকখানি নারকেল তেল আর রহিমার কোলে লম্বা কালো রঙের একটা কাঁকুই। চুলের গোড়ায় গোড়ায় তেল দিয়া মাথা আঁচড়ে দিবে রহিমা। তেলটা চুলার আগুনে একটুখানি গরম করে আনছে রহিমা। চুলের গোড়ায় গোড়ায় তেল দিয়া, খানিকক্ষণ ঘষে তারপর আবার তেল নিচ্ছে আঙুলের ডগায়, আবার ঘষছে চুলের গোড়ায়। এই কাজ শেষ করে তারপর মাথা আঁচড়ে দিবে।
পারুর কথা শুনে একটু চমকাল রহিমা। হাসুর কথা মনে পড়ল। অনেকদিন পর এই বাড়ির কেউ হাসুর নামটা নিল। যদিও তার কথা রহিমার মনে পড়ে রোজই। সেই যে মউছামান্দ্রার বাড়ি থেকে, পুরুষমানুষের কারণে রাতে ঘুমাতে না পেরে এই বাড়িতে ফুফুর কাছে চলে আসত, দিনভর ফুফুর লগে কামকাইজ করত, রাতেরবেলা ফুফুর পাশে শুয়ে আরামছে ঘুমাত। এই বাড়ি থেকে যেতেই চাইত না। শেষ তরি মান্নান মাওলানারে বইলা হাসুরে এই বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করছিল রহিমা। আর তখনই জ্বরে পড়ল মাইয়াটা। সতেরো দিনের জ্বরে মেয়ে থেকে ছেলে হয়ে গেল।
এই কথা দুনিয়ার আর কেউ জানে না। জানে শুধু হাসু নিজে আর রহিমা। হাসু যে মউছামান্দ্রার ওই বাড়িতে আর ফিরত যায় নাই, এই কথাও তারা দুইজন ছাড়া আর কেউ জানে না। তবে হাসু রহিমাকে বলে গিয়েছিল ঢাকায় গিয়া কাজ কাম জোগাড় কইরা একটু খাড়ইতে পারলে কোনও না কোনও ভাবে রহিমারে এই বাড়ি থেকে নিয়া যাবে। ঢাকায় ফুফু-ভাস্তি, না না ফুফু-ভাতিজা জীবন কাটাবে। আহা রে, কবে যে আসবো সেই দিন। কবে যে হাসুর লগে আবার দেখা হইবো।
দিনভর কাজে ব্যস্ত থাকে বলে হাসুর কথা সেভাবে ভাবতে পারে না রহিমা। ভাবে রাতেরবেলা, হাসুর কথা মনে হয় রাতেরবেলা। মনে হয় আর বুকটা পোড়ে। রোজ রাতেই মনে মনে হাসুর লগে সে কথা বলে। হাসু, হাসু রে, তর লেইগা যে আমার কইলজাড়া পোড়ে তুই হেইডা উদিস পাছ না?
আহা কই আছে হাসু, কী করতাছে, কী খাইতাছে আল্লাই জানে! যেহেনেঐ থাকে আল্লায় য্যান অরে ভাল রাখে। পুরুষপোলাগো হাত থিকা নিজেরে বাঁচানের লেইগা মনে মনে ও যা চাইছিল আল্লায় তো আর হেইকথা হুনছে। অরে তো মাইয়া থিকা পোলা বানাইয়া দিছে। বাকি জীবনডাও ও যা চায় আল্লায় য্যান অর হেই আশাও পূরণ করে।
পারু বলল, কী অইলো, কথার জব দেও না ক্যা?
রহিমা যেন ভুলেই গিয়েছিল পারুর কথার জবাব দেওয়া হয় নাই। একটু হাসল সে। হাসু তো দ্যাশে নাই।
দেশে নাই?
হ।
তয় কই গেছে?
ঢাকা গেছে গা।
ক্যা?
ডাহা মিছাকথা বলতে শুরু করল রহিমা। কোন এক বড়লোকের বাইত্তে কাম লইছে। খাওনদাওন, কাপড়চোপড় বাদে ছয়শো টেকা বেতন। এর লেইগা মউছামান্দ্রার ওই বাড়ির কাম ছাইড়া ঢাকা গেছে গা।
ভালই করছে। ঢাকায় কামের মাইনষের অনেক দাম। ভাল বাইত্তে যুদি কাম পায় তয় বহুত আরামে থাকবো। ভাল খাইবো ফিনবো, টেলিভিশন দেখবো। রিকশায় গাড়িতে কইরা এই মিহি ওই মিহি যাইবো। চেহারা সুরত বদলাইয়া যাইবো। একদিন না একদিন বিয়াশাদিও অইয়া যাইবো। হাসু তো আছিল একটু বেডা বেডা পদের, টাউনে থাকলে হেই ভাবটা থাকবো না। বদলাইয়া যাইবো। এমতে চেহারা সুরত খারাপ আছিল না ছেমড়ির। দেশগেরামের এত কষ্টের কামে চেহারা খারাপ অইয়া গেছিল।
রহিমা মনে মনে বলল, মাইয়ার চেহারা তার আর কোনওদিনও অইবো না। দিনে দিনে অর চেহারা অইবো জুয়ান মরদো পুরুষপোলার লাহান। বিয়া করলে অর গরভে না অর ঔরসে অইবো পোলাপান।
কথা তারপর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল রহিমা। আতাহার বাজানে আইজ কই গেল? বিয়ানে বাইর অইলো, বিয়াল অইয়া গেল অহনও বাইত্তে আইলো না? কই খাইলো না খাইলো…
পারু বলল, তার খাওনের আকাল আছেনি? কোন দোস্তের বাইত্তে গিয়া খাইছে কে জানে? আর নাইলে মাওয়ার বাজারের হইটালে খাইয়া লইছে।
হেয় নাইলে খাইলো, হাফিজদ্দি খাইবোনে কই?
হ এইডা আমিও চিন্তা করছি। হেয় তো আর হাফিজদ্দির কথা চিন্তা করবো না। বেডারে। মনে অয় হারাদিন না খাওয়াইয়া রাখছে।
মাথায় তেল ডলা শেষ করে লম্বা কাকুই দিয়া পারুর চুল আঁচড়ে দিচ্ছে রহিমা। মাথায় এত ঘনচুল পারুর, বাড়ির বড়পোলার বউ, তিনটা পোলাপান, এগারো-বারো বছর হল। বিয়া হইছে, সেটা পারুকে দেখে মনেই হয় না। এখনও আবিয়াত মেয়েদের মতন অবস্থা। এই জন্যই তো হুজুরের মাজারো পোলায় এমুন পাগল তার লেইগা হইছে। এতদিনকার সম্পর্ক। তিনটা পোলাপানের বাপ হইয়াও নতুন কইরা পারুরেই বিয়া করতাছে।
শিরি আর নসু সাচ্চারা খেলছে উঠানে। নূরি গেছে গনি মিয়ার সীমানায়। হিরা মানিকের লগে খেলা করছে হয়তো। আর নয়তো ছেলেমেয়ে দুইটার মতন অবোধ্য ভাষায় তাদের লগে কথা বলছে, হাসছে।
