এমন দাপটের একজন মানুষের এই অধঃপতন, আতাহারের যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বগলা সিগ্রেটে টান দিচ্ছে ঠিকই, তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের মুখের দিকে।
আলী আমজাদ বলল, আমার মুখে বহুত খারাপ গন্দ। এর লেইগা আমার মুখের সামনে বেশি আইতো না নূরজাহান। আমার মুখের গন্দে বলে অর উকাল আহে। সোনার দাঁত দামি অইয়া গেছে হুইন্না, বিপদে আপদে পড়লে এই দাঁত আমি বেচুম হুইন্না কইছিল, সোনারুগো কাছে যাওনের আগে দাঁতহান ভাল কইরা মাইজ্জা লইয়েন। নাইলে এমুন পচাগন্দের দাঁত সোনারুরা কিনবো না। হাসির কথা। তয় আইজ আর আমার হাস (হাসি) আহে না। সত্যঐ যেদিন দাঁতহান বেচুম, খুইল্লা ভাল কইরা ছাই দিয়া মাইজ্জা লমু।
আলী আমজাদের কথা খুবই এলোমেলো মনে হচ্ছে আতাহারের। কই কনটেকটারি কাজের বিল, আসলাম কনটেকটার আর কই নূরজাহান আর সোনার দাঁত। কনটেকদার শালার পো শালায় কি পাগল অইয়া যাইতাছে নি?
আলী আমজাদ বলল, আমি বুজছি ক্যান আমার কপালে এই শনি লাগছে। রাস্তার কামে তিনডা বহুত খারাপ কাম আমি করছি। বদর নামে আমার একখান মাইট্টাল আছিল। কান্দিপাড়া বাড়ি। বহুত ভাল আছিল পোলাড়া। যেমুন কাজের, তেমুন ফুর্তিবাজ। একদিন কাজির পাগলা বাজার থিকা চা আর রসোগোল্লা আনছিল। হিসাবের পয়সা অরে আমি দিছি। একটা পয়সাও ওহেন থিকা চুরি করন সম্ভব না। তাও ছেমড়ারে আমি চোর কইলাম। মনে বহুত দুঃখ পাইছিল ছেমড়াডা। আমি কি আর ও খালি আমারে কয়, আপনে আমারে চোর কইলেন? আমি চোর না সাব। আমি বহুত ভালবংশের পোলা। আমি অরে চোর কইছি, ওই এক কথায় মাথাডা য্যান খারাপ অইয়া গেল ছেমড়াডার। যারে পায় তারেঐ কয়, কন, আমি বলে চোর। সপ্তার টেকা নেওনের লেইগা লাইনে খাড়ইছে, কাম করছে চাইরদিন, তাও ঠিকঠাক মতন করে নাই, ওই যে মাথাডা ইট্টু ইট্টু খারাপ অইছে। আমি তো তহন ওই হগল বুজি না, হেকমতরে কইলাম, কাম ঠিক মতন করে নাই। সাতদিন তো করেই নাই, করছে চাইরদিন, চাইরদিনের পয়সাও পুরা দেওন উচিত না। ঠিক মতন কাম করে নাই তো, দিমু ক্যা? বদর কইলো, দিয়েন না সাব, টেকা দিয়েন না। এই চাইরদিনের টেকা আমি চাই না। তাও আপনে কন, আমি চোর না। শেষ তরি মাথাডা বিগড়াইয়া গেল ছেমড়ার, আর কামঐ করল না, বহুত দুঃখ লইয়া গেল গা। হেই ছেমড়ার অদিশাপটা (অভিশাপ) আমার লাগছে। আমি একটা নির্দোষ মানুষরে দুষি করছিলাম। বিরাট গুনার কাম করছিলাম। হেই গুনার শাস্তি আল্লায় তো আমারে দিবোই।
আর একটা সিগ্রেট ধরাল আলী আমজাদ। হেকমতরেও সন্দ করতাম আমি। আমার খালি মনে অইতো সাইটে গিয়া দেহুম হেকমত নাই, কাম ফাঁকি দিয়া কোনও বাইত্তে ঘুমাইতাছে। মাইট্টালগো কাছ থিকা একটেকা দুইটেকা কইরা কমিশন খাইতাছে। মাইট্টাল লাগাইছে ষাইটজন, ওহেনে হয়তো একজন দুইজন কম আছে। সপ্তাহ নেওনের দিন লাইনে আইন্না খাড়া করাইয়া দিছে দুইজন বেশি মাইট্টাল। ওই টেকা ভাগ কইরা নেয়। বহুত চেষ্টা কইরা, বহুত রকমভাবে পরীক্ষা কইরা দেখছি, না, হেকমত খুবই খাঁটি একজন মানুষ। একজন খাঁটি মানুষরে আমি চোর মনে করছি, এইটাও বড় একখান গুনা। এই গুনার শাস্তিও আল্লায় আমারে দিবো। আমার সাইটে দিনরাইত চব্বিশ ঘণ্টা কাম করতে করতে জয়েনডিস (জন্ডিস) অইয়া গেল হেকমতের। পেরায় মরণদশা। আমি অর মিহি চাইয়াও দেকলাম না। কাম থিকা ছাড়াইয়া দিলাম। হেকমত বাঁইচ্চা আছে না মইরা গেছে জানিও না। পাপে বাপেরেও ছাড়ে না। এই হগল পাপে আমারে ছাড়বো না। এই হগল পাপেই আমারে ধরছে।
একটু থামল আলী আমজাদ। তারপর আরও কী বলতে গেল, আতাহার বলল, আপনে যে এহেনে বইয়া এই হগল কইতাছেন, ভাবিছাবে আর আপনের পোলাপানরা হোনতাছে না?
না।
তারা কো?
ঘরে কেঐ নাই।
কেমতে বুজলেন।
আমার কাছে কেঐ আইলে পোলাপানরা আগে আইয়া দেইক্কা যায়। গিয়া অর মা’রে কয়। হেয় মনে করে পুরুষপোলারা একলগে বইলে কতপদের কথাবার্তা কয়, হেই হগল না হোননঐ ভাল। এর লেইগা হেয় পোলাপান লইয়া ভিতর বাড়ির উডানে যায়গা। বাড়ির বউঝিগো লগে গল্প গুজব করে। পোলাপানরা তাগো মতন খেলে।
তয় ঠিক আছে।
উদাস চিন্তিত চোখে কিছুক্ষণ সিগ্রেট টানল আলী আমজাদ। তারপর বলল, আর আসল গুনার কামডা তো তুমি জানোঐ। কামারগাঁওয়ের বুড়া একটা মাইট্টাল, নমজ পড়তে বইছিল, অন্য মাইট্টালরা অর উপরেই মাডি হালাইছে। হেই রাইত্রে আমি আছিলাম তোমগো বাইত্তে। বিয়ানে হেকমত আইয়া খবর দিল মাডির তল থিকা মাইনষের একহান হাত বাইর অইয়া রইছে। হায় হায় রে, এতবড় গুনাহ আল্লায় সইবো না। এর লেইগাঐ আল্লায় আমারে বেবাক দিয়া বেবাকঐ আবার ফিরত নিতাছে। আর গুনার শাস্তি হিসাবে জিন্দেগিড়া আমার ছারখার কইরা দিতাছে। কাইল বিয়ানেই আমি পলামু। সংসার বউ পোলাপানের কপালে যা আছে তাই অইবো। আমি চইলা যামু সিলেট। সিলেটে গিয়া। হযরত শাহজালাল সাবের দরগায় পইড়া থাকুম। দরগার ফকির মিসকিনরা যেমতে খাইয়া। পইরা বাঁচে, অমতেই বাঁচুম। যহন মরণ আইবো মইরা যামু। ওহেন থিকা দারোগা পুলিশে আমারে ধরবো না। তয় সড়কের কামে তিনহান যেই বিরাট গুনার কাম আমি করছি, ওই গুনার শাস্তি হিসাবে আল্লায় আমার মনের মইদ্যে যেই জেলখানা বানাইয়া দিছে, ওই জেলখানা থিকা মরণ ছাড়া বাইর অইতে পারুম না আমি। মনের জেলখানায় আমার যাবজ্জীবন অইয়া গেছে।
