অহন আর সিকরেট খামু না। আপনে কন।
আলী আমজাদ সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, শেষদিকে আইয়া এত মাইট্রাল লইয়া, রাইত দিন কাম কইরাও সারতে পারলাম না। কথা আছিল বৈশাখমাস, বড়জোড় জস্টিমাসের মাঝামাঝি সময়ের মইধ্যে ফেরিঘাট তরি মাটি হালানের কাম শেষ করুম, রাস্তা বাইন্দা। হালামু। পারলাম না। আসল কনটেকদার হইল আসলাম সাহেব। ঢাকায় দৌড়াইয়া গেলাম তার কাছে। কইলাম পুরা ঘটনা। হেয় চেইত্তা গেল। কইলো আমি কিছুই বুজুম না। তোমার লগে কথা আছে ওই কথা মতন কাম করন লাগবো নাইলে বিল পাইবা না। বহুত নিয়ারা করলাম তারে, বহুত চেষ্টা করলাম। হেয় কোনও কথাই হোনলো না। তার ওই এক কথা, যেই টাইমের মইদ্যে যতাহানি কাম করনের কথা অতাহানি কাম। কইরা আমার ইনজিনিয়াগো বুজাইয়া দেও, তারা রাস্তা মাইপা তোমার বিল দিয়া দিবো। হেতোদিনে আমি ফকির অইয়া গেছি। দশটা টেকাও নাই জেবে। ওই যে কুমারবুগ তরি আইয়া, চৌরাস্তা থিকা পশ্চিম মিহি ইট্টু আউগগাইয়া কাম বন্দ কইরা দিলাম। তহন জস্টিমাসের শেষদিক। ম্যাগ বিষ্টি শুরু অইয়া গেছে। তখন থিকাই আমার দশা খারাপ। আমি খালি ঢাকা দৌড় পাড়ি। আসলাম কনটেকদারের অফিসে গিয়া বইয়া থাকি। তারা আমার লাহান মানুষ কোরঐ (কেয়ারই) করে না। এককাপ চাও খাইতে দেয় না। আসলাম সাব তার রোমে আমারে ঢুকতেই দেয় না। ম্যানেজার দিয়া না কইরা দেয়।
আতাহার বলল, এইডা তো মাস দুই আগের কথা। এতদিনে আপনের লগে তো কহেকবার দেহা অইলো আমার। আপনে দিহি কিছু কইলেন না। মুক তো তহন এত ব্যাজারও দেহি নাই।
তহন তরি আশায় আশায় আছি, বেবস্তা অইবো। টেকাপয়সা পাইয়া যামু। তিনদিন আগে বুইজ্জা গেছি আর কোনও উপায় নাই। টেকা তো গেছে, অহন জেলেও যাইতে অইতে পারে।
কন কী?
হ। আসলাম কনটেকদারের কম্পানির নামে কেস অইয়া গেছে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাবে এই রাস্তার ব্যাপারে খুবই কঠিন। টাইম বাইন্দা দিছিল। এমুক টাইমের মইদ্যে অবশ্যই কাম শেষ করন লাগবো। সেই টাইম মতন কাম শেষ অয় নাই। তিনি চাপ দিছেন যোগাযোগ মন্ত্রীরে। যোগাযোগ মন্ত্রী হইলেন বিরাট কঠিন মানুষ। যেই মন্ত্রীর লেইগা বিক্রমপুরের উপরে দিয়া এই সড়ক খুলনা তরি গেল, ইসলাম খান সাব, আমিনুল ইসলাম খান সাব, তার লগে যোগাযোগ মন্ত্রীর খুব ভাল সম্পর্ক। তিনি যোগাযোগ মন্ত্রীরে কইছেন, কী ভাই, কাম শেষ অয় না ক্যা? মাওয়া তরি গাড়ি যাইবো কবে? হুইন্না যোগাযোগ মন্ত্রী গেছেন খেইপ্পা। একদিকে প্রেসিডেন্ট এরশাদের চাপ আরেকদিকে আমিনুল ইসলাম সাবের ওই কথা, আসলাম কনটেকদারের কোম্পানির নামে যোগাযোগ মন্ত্রী শোকজ করছেন। তারবাদে কেস হইয়া গেছে। আমার তো সাতাইশ-আঠাইশ লাখ টেকার বিল, তার তো কুট্টি কুট্টি টেকার বিল। বেবাক আটকাইয়া গেছে। তারপর কেস। করছে তার নামে আর সে কেস করছে আমার নামে। বিল তো আমি জিন্দেগিতেও পামু না। অহন জেলে যাওন লাগবো। আর এইরকম কেসে জেলে গেলে বেইল (বেল, জামিন) অইবো না। বেইল অওনের চেষ্টাই করবো কে? কোর্ট কাঁচারিতে টেকা পয়সা লাগবো না? উকিল মুক্তারকে টেকা দেওন লাগবো না? আমার তো অহন সংসার চলে না। এই হগল চলবো কেমতে!
একটু থামলো আলী আমজাদ। তারপর বলল, ঢাকা থিকা কাইল বাইত্তে আইছি আমি। তোমার ভাবিরে অহনতরি এই হগল কথা কই নাই। হেয় হোনলে তো ডরে মইরা যাইবো। পোলাপানডি ডরে মইরা যাইবো। কী যে করুম আমি অহন কিছুই বুজতাছি না।
আলী আমজাদের ঘটনা শুনে আতাহার স্তব্ধ হয়ে গেছে। কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। টেবিলের উপর রাখা আলী আমজাদের বগলা সিগ্রেট একটা নিয়াই ধরাল। এই সিগ্রেটটা খুবই কড়া। বড় করে টান দিয়াও কড়া না ঠান্ডা সিগ্রেট বুঝতে পারল না।
আলী আমজাদ বলল, মাসেকখানি আগে তোমগো বাইত্তে একদিন গেলাম না! হে দিন একখান ভুয়া সংবাদ পাইছিলাম। আসলাম কনটেকদারের অফিসের একজনরে ধরছিলাম, ভাই, আপনেরে কিছু টেকাপয়সা দিমুনে, দেহেন আমার কামডা কইরা দিতে পারেন নি। হেয় আশা দিছিল, পারবো। তয় তারে টেকা দেওন লাগবো ফাইভ পারসেন্ট। অর্থাৎ লাখে পাঁচ হাজার। তাতেই রাজি হইছিলাম। কোনওরকমে দশহাজার জোগাড় কইরা দিছি। ওইদিন হেয় খবর পাডাইছে, বেবস্তা অইয়া গেছে। আপনে ঢাকায় আহেন। শুইনা মনডা এত ভাল লাগলো, গেলাম তোমার লগে দেহা করতে। পরদিন গেলাম ঢাকা। আসলাম সাবের অফিসে গিয়া হুনি ওই হালায় আরও তিনজন সাব কনটেকদারের কাছ থিকা একই কায়দায় টেকাপয়সা খাইয়া পলাইছে। আসলাম কনটেকদারের ম্যানেজারে আমারে কইলো, বিল পাওনের কোনও আশা নাই। অহন জেলে যাওন কেমতে ঠেকাইবেন। হেই চেষ্টা করেন গিয়া। সরকার আমগো সাবরে ধরলে আমগো সাব ধরবো আপনেরে। এইবার ঢাকা গিয়া হোনলাম, কেস অইয়া গেছে। আমি যহন তহন এরেস্ট অমু। আসলাম সাব কুট্টিপতি। তার টেকা আছে। সে টেকা দিয়া বেবাক মিটমাট কইরা হালাইবো। মরুম আমি।
অনেক পর কথা বলল আতাহার। তয় অহন আপনে কী করবেন?
আলী আমজাদ হতাশ গলায় বলল, কিছু জানি না। কেঐরে কিছু না কইয়া, বউ পোলাপান হালাইয়া পলামু।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। নূরজাহান মাইয়াডা আছে না, অরে একদিন আমার এই সোনার দাঁতটা লইয়া কইছিলাম, সোনার দাম বাড়ছে, আমার দাঁতটারও অহন অনেক দাম। এইডা আমার একখান সম্পদ। বেচলে ভাল টেকা পামু। আমার পকেডে চাইর আনা পয়সাও নাই। এই সোনার দাঁতহান লইয়াঐ পলামু। তোমার ভাবিরে একহান চিডি লেইক্কা রাইখা যামু, মটর সাইকেলডা বেইচ্চা যেই কয়দিন চলতে পারে চলবো। তারবাদে বাপের কাইল্লা (কালের) কিছু জাগাজমিন আছে ওইডি বেইচ্চা য্যান খায়। আমার আশা য্যান ছাইড়া দেয়।
