আলমগীর বলল, এইডা ঠিক। তয় আপনের লেইগা রাস্তার কাম অনেক পিছাইয়া গেল।
সুরুজ বলল, এতদিনে রাস্তা চালু অইয়া যাইতো। আপনে মাডির কাম শেষ করলে, ইট বিছাইন্না অইয়া যাইতো, কারপেটিং অইয়া যাইতো। রাস্তা চালু অইয়া যাইতো।
আলী আমজাদ কথা বলল না, খোলা দরজা দিয়া বাইরে তাকিয়ে সিগ্রেট টানতে লাগল।
নিখিল বলল, এই হগল লইয়া আপনে কোনও ঝামেলায় পড়েন নাই তো?
না কীয়ের ঝামেলা?
তবে আলী আমজাদের গলায় তেমন জোর পাওয়া গেল না। তার মেয়ে ফরিদা দুই হাতে দুই প্লেট মুড়ি নিয়া আসল, টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে যেভাবে আসছিল সেভাবেই চলে গেল। আবার দুই প্লেট মুড়ি নিয়া আসল। সেই ফাঁকে কিশোরী মেয়ের স্বভাব অনুযায়ী আড়চোখে নিজের বাপ ছাড়া প্রত্যেকের মুখ একবার দেখল।
ফরিদা দেখতে তেমন ভাল হয় নাই। অতি সাধারণ, আলী আমজাদ টাইপের চেহারা, শরীর। একটু গাবদা গোবদা। তবু কিশোরী বেলার লাবণ্য মুখে একটুখানি আছে। আতাহার একটু তাকিয়ে মেয়েটিকে দেখল। একমুঠ মুড়ি নিয়া মুখে দিতে গিয়া, সিগ্রেটে শেষটান দিল। পায়ের কাছে ফেলে কেডস দিয়া পিষা দিল।
সিগ্রেট প্রায় সবারই শেষ। দুপুর শেষ হতে চলল। পেটে ক্ষুধা সবারই। সিগ্রেট ফেলে মুড়ির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সবাই।
নিখিল বলল, আতাহার, হাফিজদ্দিও তো না খাওয়া…
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আতাহার বলল, চাকর বাকর লইয়া তর এত চিন্তার কাম নাই বেডা। অগো না খাইয়া থাকনের অব্বাস আছে। বাইত্তে গিয়া ভাত খাইবোনে।
নিখিল ভেবেছিল তার কথা শুনে আলী আমজাদ হয়তো তার মেয়েকে ডেকে বলবে, মা ফরিদা, বাইর বাড়ির সামনে তর আতাহার কাকার নৌকা আছে। যেই বেড়া নৌকা বাইয়া আইছে তারেও মুড়ি মিডাই দিয়া আয়।
আলী আমজাদ সেই লাইনে গেলই না। যেন কথাটা সে শোনেই নাই এমন ভঙ্গিতে সিগ্রেট টানতে লাগল। চোখে চিন্তার ছায়া।
আতাহাররা তখন একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। যে চিন্তা নিয়া এই বাড়িতে আসছিল, আচ্ছা চাটামি খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি হবে, হাসি মজা ঠাট্টা হবে তার কিছুই নাই। যার বাড়ি সেই আছে মেন্দা মাইরা।
পরিবেশ হালকা করার জন্য আতাহার বলল, আপনের ঘটনা কী কনটেকদার সাব? আসলে অইছে কী? খোলসা কইরা কইতাছেন না ক্যা?
গলা একটু নিচা করে বলল, ভাবির লগে কাইজ্জা করছেননি?
আলী আমজাদ ম্লান হাসল। না রে ভাই।
তয়?
আলমগীরও আতাহারের মতন গলা নিচা করে বলল, আরেকখান বিয়া করবেন। কইছিলেন, তাও আমগো গেরামের নূরজাহানরে, হেই বিয়ার কী করলেন?
সিগ্রেটে শেষ টান দিল আলী আমজাদ। এক বিয়াতেই আড়াবিচি কারে উইট্টা গেছে (অণ্ডকোষ মাথায় উঠে যাওয়া অর্থে), চাইরহান পোলাপান, তারবাদে আবার বিয়া?
সুরুজ বলল, আপনের লাহান মাইনষের দুইহান ক্যা, চাইরহান বিয়া করলেই বা অসুবিদা কী? এত টেকাপয়সা আপনের। সড়কের কাম কইরা লাল অইয়া গেছেন।
টোকা মেরে দরজা দিয়া সিগ্রেট বাইরে ফেলল আলী আমজাদ। কথা বলল না, দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ফরিদা ট্রে-তে করে পাঁচ কাপ চা নিয়া আসল। চায়ের কাপগুলির দশা ভাল না। ঠেকা কাম চলে, এমন। প্রথম চায়ের কাপটা আলী আমজাদই নিল। আতাহারের দিকে তাকিয়ে বলল, নেও। চা খাও।
যে যার মতো চায়ের কাপ নিল।
এসময় অদ্ভুত একটা প্রস্তাব দিল আলী আমজাদ। আলমগীরের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা ঘরে বইয়া চা খাও, আমি আর আতাহার চায়ের কাপ লইয়াঐ বাইর বাড়ির মিহি যাই। অর লগে আমার কথা আছে।
আতাহার বলল, না না তার দরকার নাই। চা শেষ কইরা সবাই বাইরে যাউক। আমার সিগ্রেটের প্যাকেট লইয়া যাইবো। বাইরে খাড়াইয়া সিগ্রেট খাইবো আর আপনে আমি ঘরে বইয়াঐ কথা কমু নে।
তয় ঠিক আছে।
আতাহারের কথা মতোই হল সব। আলমগীররা তিনজন চা শেষ করে, আতাহারের সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ নিয়া বারবাড়ির দিকে চলে গেল। আলী আমজাদ আর আতাহার তখনও তাদের চা শেষ করে নাই।
ওরা বেরিয়ে যেতেই আতাহার বলল, কী অইছে? আলী আমজাদ আবার ফরিদাকে ডাকল। মা ফরিদা, আমার সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ দিয়া যা।
দিতাছি বাবা।
ফরিদা একদৌড়ে এসে সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ দিয়া গেল। সিগ্রেট দেখে অবাক আতাহার আলী আমজাদ খেত ক্যাপস্টান সিগ্রেট, আজ দেখি বগলা সিগ্রেটের প্যাকেট! মনে মনে বলল, শালায় কি পথের ফকির হইয়া গেছেনি? এই দশা ক্যা? মুখে বলল, বগলা ধরছেন ক্যা? আগে না ক্যাপিস্টিন খাইতেন?
আলী আমজাদ সিগ্রেট ধরিয়ে বলল, আগের দিন আমার নাই রে দাদা। আমি ফিনিশ অইয়া গেছি।
আবার আগের সেই কথাটা বলল আতাহার। কী অইছে আপনের?
ধরা খাইয়া গেছি।
কই ধরা খাইছেন? কী ঘটনা?
কনটেকটারি কামে ধরা খাইছি।
কেমনে?
আমি তো কাম করতাম সাব কন্টাক্টে। আসল কনটেকদারের কাজ থিকা মাটির কাম লইয়া করতাম। তুমি তো দেখছো, পয়লা থিকাই ধুমাইয়া কাম করতাম। পোনরো দিন কাম করতাম, পোনরো দিনের বিল লইয়া লইতাম। শেষদিকে কামের চাপ এমুন বাড়ন বাড়ল, যেই মাইট্টাল পাই তারেঐ কামে লই। দিন রাইত চব্বিশঘণ্টা কাম করি। হেজেক বাত্তি জ্বালাইয়া কাম করছি। বিরিফকেস ভইরা টেকা লইয়া গেছি সাইটে। মাইট্টাইলগো টেকা দিছি। ধরা খাইলাম শেষদিকে আইয়া। খাইবানি একখান বগলা?
না।
তয় নিখিলারে ডাক দেও। কেপিস্টিন দিয়া যাউক।
