এখন একবার সেই কথাটা মনে হল পারুর। চোখের সামনে একটা দৃশ্য দেখতে পেল সে। দোগাছির ওদিককার এক গিরস্ত বাড়ির ঘাটে কোষানাও নিয়া বসে আছে মুকসেদ। লগে ছাতি নাই। পাছার চারটে বসে তুমুল বৃষ্টিতে ভিজছে সে।
কেন যে এই দশ্যটা পারুর চোখে ভেসে উঠল! মানুষ যে মনের চোখ দিয়া কতকিছু দেখে!
.
বাপ চাচাঁদের মিলে কয়েক শরিকের বাড়ি আলী আমজাদদের।
বাড়িতে ঢোকার মুখের ঘরটাই আলী আমজাদের। পাটাতন করা ঘর না, মাটির ভিটির ঘর। তবে উঠান থেকে ভাল রকম উঁচা। লম্বা ধরনের বড় সাইজের ঘর। সামনের দিকটায় দুই থাকের ওটা। তারপর ঘরে ঢোকার দরজা। বর্ষার পানি বারবাড়ির কাছে এসে থেমে আছে। বারবাড়ি থেকে অনেকখানি জায়গা হেঁটে গিয়ে আলী আমজাদের ঘর। সেখানটায় দুইটা আমগাছ, একটা কদম আর একটা বকুল গাছ। ঘরের পশ্চিমদিকে, চালের উপর এসে পড়েছে একটা ঝাঁপড়ানো তেঁতুলগাছ।
বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়াল হাফিজদ্দি। আতাহাররা চারজন নেমে সোজা এসে দাঁড়াল আলী আমজাদের ঘরের সামনে। আতাহার একখান কাশ দিয়া বলল, কনটেকদার সাব বাইত্তে আছেননি? ও কনটেকদার সাব।
ভিতর থেকে লগে লগে সাড়া এল, কেডা?
আতাহার বলল, আমার গলাও আপনে চিনতে পারেন না? ভাইজান, অধমের নাম আতাহার। পিতা আবদুল মান্নান মাওলানা। সাং মেদিনীমণ্ডল।
আতাহারের নাম শুনে যতটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বের হয়ে আসবার কথা আলী আমজাদের ততটা ব্যস্তভঙ্গিতে সে আসলে না। একটু ধীর স্থির ভঙ্গিতেই আসল। পরনে সাদার ওপর হালকা বেগুনি ডোরা দেওয়া পুরানা লুঙ্গি। গায়ে ময়লা একখান স্যান্ডোগেঞ্জি ছিল সেই গেঞ্জির উপর ফুলহাতা নীল রঙের শার্ট পরতে পরতে বের হয়ে এল। মুখে আট-দশদিনের দাড়িমোচ, মাথার চুল এলোমেলো। আগের সেই ভাবটা যেন নাই। ভুড়ি একদমই কমে গেছে। দাড়িমোচের কারণেই কি না, মুখটা বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।
আলী আমজাদকে দেখে আতাহাররা চারজনই অবাক। আতাহার কথা বলবার আগেই আলমগীর বলল, এমুন বদচেহারা হইছে ক্যা আপনের? শইল খারাপনি?
হ রে ভাই শইলডা ইট্টু খারাপ। আহো ঘরে আহো তোমরা।
ওরা চারজন ঘরে ঢুকল।
ঘরের মাঝ বরাবর ঢেউটিনের বেড়া। বেড়ার পুবপাশে ভিতর দিককার দরজা। ঘরটা উত্তর-দক্ষিণে। উত্তর দিকে বারবাড়ি। হাফিজদ্দি নাও নিয়া সেদিকটায় বসে আছে।
এই ঘরে সস্তা ধরনের কাঠের একসেট সোফা আছে। সোফার গদি কটকটা হলুদ আর খয়েরি রঙের ডোরা দেওয়া। তবে ছিড়াভিড়া। এদিক ওদিক ফেঁসে গেছে গদির গিলাপ। ভিতরকার ফোম দেখা যায়। সেগুলিও ময়লা। কাঠের একটা সেন্টার টেবিল আছে। সেটার দশাও সুবিধার না। পশ্চিম পাশে একটা চকি। চকিতে অতি সাধারণ বিছানা। চকির উত্তর মাথার খালি জায়গায় আলী আমজাদের ফিফটি সিসির হোন্ডাটা দাঁড় করানো। পুরানা একটা চাদর দিয়া ঢাকা হোন্ডা।
আলী আমজাদের ঘরে ঢুকে ওরা চারজন একটু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। সড়কের কাজে এত টাকাপয়সা কামাই করল যে লোক, তার ঘরের এই দশা ক্যান? ঘর আর আলী আমজাদের চেহারা একই রকমের বিষণ্ণ। ঘটনা কী?
শার্টের বুতাম লাগাতে লাগাতে আলী আমজাদ বলল, বহো বহো।
ওরা যে যার মতন বসল।
আলী আমজাদ বসল চৌকিতে। আথকা কী মনে কইরা?
আতাহার বলল, আপনেরে কতদিন দেহি না, আইজ চাইর দোস্তে একলগে অইছি, ভাবলাম আপনের লগে ইট্টু দেহা করি।
নিখিল বলল, তয় আইয়া মনে হয় ভাল করি নাই।
ক্যা?
আপনার শইল খারাপ।
আতাহার বলল, মনে অয় মনও খারাপ।
আলী আমজাদ হাসল। কথা বলল না।
সুরুজ বলল, জ্বর আইছেনি আপনের?
না।
তয়?
আছে ইট্টু সমস্যা আছে।
আলী আমজাদ আতাহারের দিকে তাকাল। চা খাইবা? চা দিতে কমু?
না না দোফরবেলা চা খামু না। এইডা তো ভাত খাওনের টাইম।
ভাত খাইবা? ভাত রানতে কমু?
আতাহার সামান্য সময় কী ভাবল তারপর বলল, না থাউক। বাইত্তে গিয়াঐ খামু নে।
পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেটা বের করে আলী আমজাদের দিকে আগায়া দিল। নেন, সিকরেট খান।
আলী আমজাদ নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে সিগ্রেট নিল। আতাহার ম্যাচ জ্বেলে তার সিগ্রেট ধরায়া দিল। তারপর নিজে ধরাল, দোস্তদের দিল। আলী আমজাদের ঘরের অর্ধেকটা সিগ্রেটের ধুমায় ভরে গেল।
এসময় ভিতর দিককার দরজার মুখে চারটা পোলাপান দেখা গেল। দুইটা মেয়ে, দুইটা ছেলে। বড়টার বয়স এগারো-বারো বছর হবে। মেয়ে। তার পরেরগুলি বড়টার চেয়ে এক-দেড় বছর করে ছোট হবে। বোঝা গেল আলী আমজাদের চার পোলাপান বাড়িতে কারা আসছে দেখার জন্য দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দুই মেয়ে দুই ছেলে আলী আমজাদের।
আলী আমজাদ তাদের দিকে তাকাল। বড়মেয়েকে বলল, ফরিদা, তর মারে ক, পাঁচ কাপ চা বানাইতে। আর মুড়ি মিডাই দিতে ক।
আতাহার বলল, না না দরকার নাই।
আলী আমজাদ স্নান গলায় বলল, খাও দাদা, খাও।
পোলাপানের দল তখন দরজা থেকে উধাও। নিখিল শুরু থেকেই তীক্ষ্ণচোখে আলী আমজাদকে খেয়াল করছিল। হঠাৎ বলল, আপনের অন্য কোনও অসুবিদা অয় নাই তো কনটেকদার সাব?
আলী আমজাদ চমকে নিখিলের দিকে তাকাল। কী অসুবিদা?
রাস্তার কামকাইজ লইয়া?
না।
আতাহার বলল, তয় কামের অর্ডার আপনের যা আছিল ওইডা তো আপনে শেষ করেন নাই। আপনের কথা আছিল ফেরিঘাট তরি মাটি হালাইবেন, আপনে কুমারবুগ তরি আইয়া থামাইয়া দিলেন।
কী করুম কও? বাইষ্যাকাল আইয়া পড়ল। ম্যাগ বিষ্টি শুরু অইলো। ম্যাগ বিষ্টিতে তো আর মাডি কাড়নের কাম করন যায় না।
