শ্বশুরের কথা শুনে ভিতরে ভিতরে আনন্দে ফেটে পড়ছিল পারু। অতিকষ্টে আনন্দটা সে চেপে রাখছিল। শ্বশুর হওয়ার পরও মান্নান মাওলানাকে সে পছন্দ করত না। তার স্বভাব চরিত্র সবই পারু জানে। রহিমার লগে সম্পর্কের কথা জানে। মন্তাজের ঘরে গিয়া ফিরোজার লগে খাতির করবার চেষ্টা করছে এইসবও সে উদিস পাইছে, মাকুন্দা কাশেমের মতন এত পুরানা নিরীহ একজন মানুষকে যেভাবে চোর সাজাইয়া, মাইর ধইর কইরা জেলে দিল, ছনুবুড়িরে নিয়া ফতোয়া দিল, সহ্য করতে না পেরে নূরজাহান তার মুখে ছ্যাপ দিল, নূরজাহান জানত নিরীহ মানুষটাকে কেন এই দশা করলেন মান্নান মাওলানা। এই বাড়ির বউ হয়ে আসার পর থেকেই একে একে বাড়ির ভিতরকার চেহারাটা পারু দেখেছে, মান্নান মাওলানার চরিত্র টের পেয়েছে। নিজে জড়িয়ে গেছে আতাহারের লগে এই কারণে মুখ ফুটে অনেক কিছুরই প্রতিবাদ সে করতে পারে নাই। চালনি যদি সুঁইরে কয় তর পাছায় ছিদ্র, সেটা কেমন হবে। নিজে এক দোষে দুষি হয়ে অন্যের দোষ সে ধরতে যাবে কেন?
অনেক কিছু দেখেও পারু এজন্য কখনও কোনও কথা বলে নাই। নিজেরে নিয়া ছিল, আতাহারকে নিয়া ছিল। তার শরীর, তার মাথা ধরা এসব থেকে মুক্তিই ছিল তার বেঁচে থাকা। স্বামীর কাছ থেকে ধাক্কা খেয়ে এক বিকালে সে চলে গিয়েছিল আতাহারের হাতে। সেই হাত ধরেই দশ-এগারোটা বছর পার করেছে। এখন বাকি জীবনটা পার করার ব্যবস্থা হচ্ছে। মান্নান মাওলানা যত খারাপ লোকই হোক, আতাহারও তেমন সুবিধার ছেলে না, তবু তারা যে পারুর জীবনটা একটা সোজা পথে এনে দিচ্ছে এইজন্য মান্নান মাওলানার ওপর খুবই খুশি সে। খুবই কৃতজ্ঞ সে মানুষটার কাছে।
দশ-বারোটা বাছাই করা কইমাছ আজ রান্না করেছে পারু। রহিমারে বলছে সবচাইতে বড় দুইখান হুজুররে দিতে। তার একখান খেয়ে শেষ করেছেন মান্নান মাওলানা। এখন পরেরটা তার পাতে তুলে দিল পারু। এক চামচ ভাত দিল। ঝোল দিল অনেকখানি।
এই বয়সেও মান্নান মাওলানা খান প্রায় দুই মানুষের খাবার। অনেকক্ষণ ধরে রসাইয়া রসাইয়া খান। পরের কইমাছ পাতে পড়ার পর বললেন, শিরি নসুরা খাইছে?
মাথার ঘোমটা একটুখানি নেমে গিয়েছিল। সেই ঘোমটা টেনে পারু বলল, এতক্ষণে মনে হয় খাইয়া হালাইছে।
তোমার ছোটডাঃ নূরি?
শিরি অরে খাওয়াই দিছে। আগে অরে খাওয়াইয়া, নসুরে খাওয়াইয়া তারবাদে শিরি খায়।
তোমার বড় মাইয়াডা বহুত লক্ষ্মী অইছে। বহুত সংসারী অইবো মাইয়াডা। এই বয়সেই সবকিছু গুছাইয়া গাছাইয়া করে।
লেখাপড়ায়ও ভাল।
পরের কইমাছ ভাঙতে ভাঙতে মান্নান মাওলানা বললেন, আতাহার কই গেছে?
বিয়ার কথা হওয়ার পর থেকে আতাহারের নামটা উঠলেই শরম পায় পারু। এখনও সেই শরমটা পেল। মাথা নিচা করে বলল, হাফিজদ্দিরে লইয়া বাজারের দিকে গেছে।
দোফর অইয়া গেল অহনতরি আইলো না। বাইত্তে হাফিজদ্দির কামকাইজ আছে না? গোরুর ঘাসমাস আছেনি?
আছে। আথালে দেকলাম বিয়ানে অনেক কচুরি আর দল দিয়া রাখছে হাফিজদ্দি। গোরুডি হারাদিন ধইরা খাইতে পারবো।
অগো খাওনদাওন লাগবো না।
হেয় দোস্তগো লগে চা মিষ্টি খাইবোনে বাজারে বইয়া।
ও নাইলে খাইলো, হাফিজদ্দির খাওন লাগবো না? ওই বেডা না খাইয়া অর লগে বইয়া থাকবো?
একথার জবাব দিল না পারু। বলল অন্যকথা। আজাহারের লেইগা কোন গেরামের সমন্দ আনছেন ঘটকে?
লগে লগে মান্নান মাওলানা বলল, মাইয়াগো গেরাম অইলো মালিরঙ্ক। বাপের অবস্থা ভাল। ভাইভুইরা বিদেশে থাকে। তয় এই হগল সমন্দ আইন্না লাব কী? আজাহারের মতলবঐত্তো বুজতাছি না।
আপনে একবার ঢাকা গিয়া ফোনে অর লগে কথা কন।
ও হেইডাঐ করুম।
মাছভাত খেয়ে দুধভাত নিয়েছেন মান্নান মাওলানা। রেকাবি ভরতি সামান্য ভাত, একদলা খাজুড়া মিঠাই। আগে ভাত মিঠাই খেয়ে ফুরুক করে দুধে একটা চুমুক দিলেন। এক চুমুকে রেকাবি খালি। তারপর পানি খেলেন। তার খাওয়া দাওয়া শেষ। এখন রেকাবি আর তরকারি পেয়ালা বাটি যতটা সম্ভব নিয়া যাবে পারু। যা থাকবে রহিমা এসে নিবে। মান্নান মাওলানা এখন একটা ঘুম দিবেন।
মান্নান মাওলানার ঘর থেকে বের হয়ে পারু দেখে আগের রোদেলা ভাবটা নাই। আকাশ মেঘলা হয়েছে। যখন তখন নামবে বৃষ্টি। আকাশের দিকে তাকিয়ে তার প্রথমে মনে হল হিরা মানিকের কথা। নূরিকে ডাকতে গিয়া সে দেখছে জামতলার ভিজা মাটিতে বসেই খেলছে পোলাপান দুইটা। তার ছোট মেয়েটাও আছে তাদের সঙ্গে। ভিজা মাটিতে ছেড়ে পেছড়ে বসার ফলে জামা কাপড়ে ভিজা ভিজা ভাব। তাও হাছড় পাছড় করে খেলছে, খলবল খলবল করে হাসছে। নূরিও তাদের লগে হাসছে মজা করছে।
ভিজা মাটিতে কেন পোলাপান দুইটারে বসাইছে মাস্টারের বউকে কথাটা জিজ্ঞাসা করেছিল পারু। বউটা মুশুরি ডাল বাগার দিয়া বলল, ঘরে থাকতেই চায় না। আর বাইত্তে তো কেঐ নাই। আপনের ছোড মাইয়াডা আহে খেলতে। আমি থাকি রান্নঘরে। রানঘর থিকা চোক্কে চোক্কে রাখতে পারি অগো। চাইরমিহি পানি। লেছড়াইতে লেছড়াইতে পানিপুনির মিহি যায়গানি রান্দনবাড়নের ফাঁকে ফাঁকে চাইয়া চাইয়া দেহি।
তখনই মতিমাস্টারকে নিয়া কোষানাও কইরা আসলো মুকসেদ। মতিমাস্টারের মাথায় ছাতি, মুকসেদের মাথায় টুপি। নূরিকে নিয়া ফিরার সময় পারুর মনে হয়েছিল, ছাত্র বাড়িতে গিয়া মাস্টার তো বাড়িতে ঢুইকা ছাত্র পড়ায়, মুকসেদ বইসা থাকে নাওয়ে। রইদ বিষ্টিতে কি এমতেই বইয়া থাকে নাকি তারও একখান ছাতি আছে, ছাতি মাথায় দিয়া বইসা থাকে!
