ঢেঁকির দিকে তাকিয়ে ঘরের ভিতরকার এই একটা মাত্র জিনিস পরিষ্কার চিনতে পারল ছনুবুড়ি। আশ্চর্য এক অনুভূতি হল। ছনুবুড়ি টের পেল তার দেহ আর মানুষের দেহ নাই, দেহ তার মরা কাঠের ঢেঁকি হয়ে গেছে। কারা যেন দুইজন অদৃশ্যে থেকে তার দেহঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে। ধুপ ধুপ, ধুপ ধুপ। পাড়ে পাড়ে ললাটে মুখ থুবড়ে পড়ছে সে। সেই ললাটে ধানের মতো খোলসমুক্ত হচ্ছে ছনুবুড়ির জীবন।
তারপর আবার সেই কলিজাফাটা তৃষ্ণা টের পেল ছনুবুড়ি। মনে হল কোনও পুকুরে নেমে উবু হয়ে, আঁজলা ভরে পানি তুলে জীবন ভর খেলেও এই তৃষ্ণা মিটবে না। পানি খেতে হবে পুকুরে মুখ ডুবিয়ে। এমন চুমুক দিবে পানিতে, এক চুমুকে পুকুর হবে পানিশূন্য তবু তৃষ্ণা মিটবে না ছনুবুড়ির।
ছনুবুড়ি তারপর পাগলের মতো হাঁড়ি মালসা হাতাতে লাগল, ঘটিবাটি হাতাতে লাগল। একটু পানি, একটু পানি কি নাই, কোথাও! ভুল করেও কি কেউ একটু পানি রাখে নাই কোনও হাঁড়িতে!
ছনুবুড়ির ইচ্ছা হল গলার সবটুকু জোর একত্র করে চিৎকারে চিৎকারে দুনিয়াদারি কাঁপিয়ে তোলে, পানি দেও, আমারে ইট্টু পানি দেও। আমার বড় তিয়াস লাগছে।
এক সময় একটা হাড়িতে সামান্য একটু পানি ছনুবুড়ি পেল। দুইহাতে সেই হাঁড়ি তুলে মুখে উপুড় করল সে! দিকপাশ ভাবল না।
কিন্তু এ কেমন পানি? এ কোন দুনিয়ার পানি পানি কি এমন হয়! গলা দিয়ে যে নামতেই চায় না! এ কেমন পানি!
ঠিক তখনই মাটির তলায় লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য আনমনা মাছ মনস্ক হয়। প্রবল বেগে দিকবিদিক ছুটতে শুরু করে। ফলে আচমকা এমন টান লাগলো ছনুবুড়ির দেহে, বহুকাল মাটিমুখি ঝুঁকে থাকা দেহ তার কঞ্চির ছিপের মতো ভেঙে যায়।
ছনুবুড়ি মুখ থুবড়ে পড়ে।
আকাশের চাঁদ তখন মাত্র হাঁটতে শিখেছে এমন শিশুর মতো অতিক্রম করেছে কয়েক পা, জ্যোৎস্না হয়েছে আরেকটু স্নান। কুয়াশা যেন মুর্দারের কাফন। থান খুলে সেই কাফনে কে যেন ঢেকে দিয়েছে দুনিয়া, ছনুবুড়ির পর্ণকুট্টির। এই কাফন পেরিয়ে বয়ে যাওয়ার সাধ্য নাই হাওয়ার। ফলে হাওয়া হয়েছে স্তব্ধ।
গাছের পাতায় পাতায়, লতাগুল্ম এবং ঘাসের ডগায় ডগায় তখন ঝরছিল নিশিবেলার অবোধ শিশির। গ্রাম গিরস্থের খাজুরগাছ হাঁড়ি পূর্ণ করছিল বুক নিংড়ানো মধুর রসে।
.
১.২৪
মিয়াদের ছাড়াবাড়ির কাচির (কাস্তে) মতো বেঁকা খেজুরগাছটার গলার কাছে তাবিচের মতো বাঁধা হাঁড়ির মুখে বসে একটা বুলবুলি পাখি ঠোঁট ডুবাচ্ছে রসে। শীত সকালের সূর্য পুব আকাশ উজ্জ্বল করেছে খানিক আগে। এখন গাছপালার বনে, শস্যের চকমাঠ আর খাল পুকুরে, ঘাসের ডগায় আর মানুষের উঠান পালানে ছড়িয়ে যাচ্ছে রোদ। কুয়াশা উধাও হয়েছে কোন ফাঁকে। প্রকৃতির নিঃশব্দ কান্নার মতো ঝরেছে যে শিশির, সেই শিশির এখনও সিক্ত করে রেখেছে চারদিক। সারারাত আশ্চর্য এক শীতলতা উঠেছে মাটি থেকে, ঘাসবন আর গাছপালা থেকে, খাল পুকুর আর মানুষের ঘরবাড়ি থেকে। পাখির ডানার তলায় লুকিয়ে থাকার মতো রোদের উষ্ণতা এখনও ছড়াতে পারেনি চারদিকে। তবে শিশিরসিক্ত গ্রামখানি রোদে আলোয় ঝকমক ঝকমক করতাছে। যেন বা এই মাত্র স্বামীর সংসার থেকে পালকি চড়ে বাপের বাড়ি আসছে কোনও গৃহস্থ বউ, পালকি থেকে নেমে বহুকাল পর মা-বাবা ভাই বোনকে দেখে গভীর আনন্দে হাসছে, তার সেই হাসির দ্যুতি মোহময় এক আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে।
ভার কাঁধে দবির গাছি বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ফজরের আজানের পর। ভারের দুই দিকে দুইটা দুইটা করে চারটা মাটির ঠিলা। এক ঠিলার মুখে এলুমিনিয়ামের বড় একটা মগ। যে যে বাড়িতে গাছ ঝুড়েছে দবির সেই সেই বাড়িতে গিয়ে গাছের গলা থেকে খুলবে হাঁড়ি। হাঁড়ির অর্ধেক রস দিবে গিরস্তকে বাকি অর্ধেক ঢালবে নিজের ঠিলায়। এই ভাবে এক সময় কানায় কানায় ভরবে চারটা ঠিলা, দবির রস বেচতে বের হবে।
আজ প্রথম দিন। বাড়ি থেকে বেরিয়েই দবির গেছে হালদার বাড়িতে। মজনুদের চারটা গাছ ঝুড়েছে, সেই সব গাছের রস নামিয়েছে। রস তেমন পড়ে নাই। কোনও হাঁড়িরই বুক ছাড়িয়ে ওঠেনি। তবু সেই রস নিয়ে মজনুর খালা মরনির কী আগ্রহ। দবির পৌঁছাবার আগেই ঘুম থেকে উঠে বালতি হাতে খাজুরতলায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভাগের রস বুঝে নেওয়ার পর ডাকাডাকি করে তুলেছে মজনুকে। ও মজনু মজনু, ওট বাজান, রস খা। দেখ কেমুন রস পড়ছে! কেমুন মিড়া রস!
নিজে তখনও মুখে দেয়নি রস তবু বলছে মিষ্টি রস। শুনে হেসেছে দবির। ঠাট্টার গলায় বলেছে, ও মরনি বুজি, তুমি তো অহনরি রস মুখে দেও নাই, মুখে না দিয়া কেমতে কইতাছো মিডা রস?
দবিরের দিকে তাকিয়ে মরনিও হেসেছে। আমগো গাছের রস মিডাই অয় গাছি। আমি জানি।
সব বচ্ছর রস কইলাম এক রকম মিডা অয় না। এহেক বচ্ছর এহেক রকম অয়। এইডা অইলো মাডির খেইল। মাড়ি যেই বচ্ছর আমোদে থাকে, খাজুরের রস, আউখের রস হেই বচ্ছর খুব মিডা অয়। আর মাডি যদি ব্যাজার থাকে তাইলে রস অয় চুকা (টক)।
একটু থেমে হাতের কাজ করতে করতেই দবির বলেছে, তুমি ইট্টু মুখেদা দেহ না বুজি রস এই বচ্ছর কেমুন মিডা!
মরনি লাজুক হেসে বলল, না। পোলা আছে বাইত্তে, অরে আগে না খাওয়াইয়া গাছের রস আমি মুখে দিতে পারি না।
