নতুন কোষানাও নিয়া মুকসেদ যেদিন মতিমাস্টারকে বলল, মাস্টার সাব, আমি আইজ থিকা আপনের নৌকার মাঝি। বর্ষার শুরু দিককার কথা। ততদিনে মুকসেদের লগে সম্পর্ক অনেক স্বাভাবিক হয়েছে মতির। লোকটা সারাদিন তার ছেলেমেয়ে দুটির পাশে আছে। তাদের লগে হাসছে খেলছে, মজা করছে। পারুর ছোট মেয়েটাও এসে জুটছে। চারজনের ভাল একটা দল। মাস্টার তখন চিন্তায় পড়েছেন এই বর্ষা আর বৃষ্টি বাদলায় ছাত্র পড়াবার কাজটা কীভাবে করবেন। নৌকা তো নাই। গনি মিয়াকে যে বলবেন, দাদা একখান নৌকা কিনা দেন। পুরানা ধুরানা হইলেই চলবো। আমার তো নাইলে না খাইয়া মরণ। ছাত্র পড়াতে যাই কেমনে!
বলে লাভ নাই। গনি মিয়া বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন নিজের স্বার্থে। একটা পয়সা দিয়াও সাহায্য করেন না। ওই থাকতে দেওয়া পর্যন্তই। ঢাকার যাত্রাবাড়িতে ছয়তলা বাড়ি তুলে ফেললে কী হবে, জাপানি টাকায় বড়লোক হয়ে গেলে কী হবে, দশ-বিশটা টাকাও হাতে ওঠে না। দুনিয়ার কিরপিন।
এই অবস্থায় মুকসেদের কোষানাও আর ওই কথা, মতিমাস্টার হা হা করে উঠেছিলেন। হায় হায় দাদা, এইটা কী বলেন? না না এইটা হয় না।
মুকসেদ হেসেছে। হয় মাস্টার সাব, হয়। কইছি না, আমি মানুষ হইতে চাই। আপনে আমারে মানুষ হওনের পথটা দেখান।
পথ তো আপনে পাইয়াই গেছেন। যেই কাজ করতেন সেইটা ছাইড়া দিছেন। ওই কাজ ছাইড়া দেওয়ার অর্থই তো মানুষ হওয়ার পথ।
তারপরও আপনের সেবা কইরা আর একটু মানুষ হইতে চাই। আপনে মাস্টার সাব না করবেন না। না করলে মনে বহুত কষ্ট পামু আমি। মাস্টার মানুষ হইয়া মাইনষের মনে আপনে কষ্ট দিতে পারেন না।
এই কথার পর আর কী বলার থাকে! মুকসেদকে নিয়াই আছেন মতিমাস্টার। রোদ বৃষ্টিতে তিনি ছাতি মাথায় দিয়া কোষানাওয়ের মাঝখানে বসে থাকেন আর মাথায় টুপি দিয়া নাও বেয়ে যায় মুকসেদ। এই গ্রাম ওই গ্রাম। সকালবেলা, বিকালবেলা। ভাইয়ের এই পরিবর্তনে জামসেদ তো অবাকই, তার বউ পোলাপানও অবাক। আর মুকসেদ বিড়ি সিগ্রেট ছাইড়া দিছে, পান তামাক ছাইড়া দিছে এটাও একটা আশ্চর্য ঘটনা। সাত-আট মাসে একটা মানুষ পুরাপুরি বদলাইয়া গেল। নতুন মানুষ হয়ে গেল!
মুকসেদের এইসব কথা পারু শুনেছে মতিমাস্টারের বউর কাছ থেকে। দেশগ্রামের নামকরা চোর, তাগড়া জুয়ান মুকসেদ দিনরাত পড়ে আছে মতিমাস্টারের বাড়িতে, মতিমাস্টারের বউ আর মুকসেদকে নিয়া দেশগ্রামের মানুষ কথা তুলতে পারে, ভেবে ভাল একটা তরিকা ধরছে মুকসেদ। মাস্টারের বউকে ডাকে বইন। আর ভঙ্গি এত বিনয়ী, মনে। হয় সত্যি সে মাস্টারের বউয়ের ভাই। বয়সে যত বড়ই হোক।
শিরি আর নসু নিজেরাই নিজেদের কাজগুলি করে। নাওয়া ধোওয়া, শরীরে মাথায় তেলপানি দেওয়া। শুধু নূরির কাজগুলি করতে হয় পারুকে। আজ রান্নাবান্না শেষ করে, নূরিকে নিয়া নিজে গোসল করেছে পারু। ততক্ষণে মান্নান মাওলানার নমাজ শেষ। রহিমা খাবার নিচ্ছে তাঁর ঘরে। মাথায় নতুন বউর মতন ঘোমটা দিয়া পারু এসে বসেছে শ্বশুরের সামনে। তার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছে। কইমাছটা তুলে দিয়েই প্রশ্নটা করল, ডাহা। মিথ্যাটা মান্নান মাওলানা ছেলের বউকে বললেন।
আতাহারের লগে তার বিয়ার ব্যাপারটা তহুরা বেগমের কথায় মেনে নিয়েছেন মান্নান মাওলানা, এটা জানার পর থেকে শ্বশুরের প্রতি বেদম একটা ভক্তি শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে। পারুর। শ্বশুরের যে-কোনও কথাই তার কাছে বিরাট দামি। অন্য সময় তাঁর লগে কথ বার্তা তেমন হয় না। হয় শুধু দুপুর আর রাতের খাবারের সময়। সকালের নাস্তার সময় কথাবার্তার তেমন সুযোগ নাই। নাস্তা করার সময় আর কতটা! ওইটুকু সময়ে কী কথা হবে!
আজাহারের বিয়ার কথা শুনে পারু একটু চিন্তিত হল। আম্মায় মইরা যাওনের পর থিকা তো আজাহারের তেমন রাও শব্দ নাই।
কইমাছের পিঠের দিকটা ভাঙতে ভাঙতে মান্নান মাওলানা বললেন, রাও শব্দ নাই অর্থ কী?
চিঠিপত্র লেখে না। টেকাপয়সাও পাড়ায় না আগের লাহান।
হ পোলাডারে লইয়া আমি ইকটু চিন্তিত। জাপানে বিয়াশাদি করল কি না কে জানে!
ওইডা না জাইন্না অর বিয়াশাদির চেষ্টা করন…
হ ঠিক অইতাছে না। তয় আমার কথা অইলো, বাপ হিসাবে আমার দায়িত্ব অইলো লায়েক পোলা মাইয়ার বিয়াশাদি দেওন। আমি মাইয়া মুইয়া দেইখা রাখলাম। মাইয়া পছন্দ অইলে ঢাকা গিয়া আজাহাররে ফোন করুম। ও যুদি কয় হ দেশে আইবো, বিয়া করবো তয় কথা ফাইনাল করুম, নাইলে না কইরা দিমু। তহন আমার আর কোনও দায় রইল না। বাপ হিসাবে আমি আমার দায়িত্ব শেষ করতে চাইছি। বিদেশে থাকা পোলা হেইডা করে নাই। দায় আমার না, দায় পোলার।
বড় এক লোকমা ভাত মুখে দিলেন মান্নান মাওলানা। চাবাতে চাবাতে বললেন, সব দায়িত্বই আমি শেষ কইরা আনছি। মাইয়াগো বিয়া দিছি, মোতাহাররে বিয়া করাইছিলাম, পোলাডা গেল মইরা। সমস্যা আছিল আতাহার আর তোমারে লইয়া হেই সমস্যাডাও মিটা গেছে। তোমার হরি বাঁইচ্চা থাকলে এতদিনে বিয়াশাদি তোমগো অইয়া যাইতো। হেয়। মইরা গেল দেইখা বিয়া আমি পিছাইয়া দিলাম। পৌষ-মাঘ মাসে বিয়া হইয়া যাইবো। বিয়া হইয়া গেলে আতাহারও লাইনে আইবো, সংসার দেখবো। তহন আমার আর কোনও দায়িত্ব নাই। এনামুল সাবে মজজিদ করতাছে আমি থাকুম মজজিদ লইয়া।
