তহুরা বেগম মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারের ভার যেমন কাঁধে তুলে নিয়েছে পারু, তেমন শ্বশুরের তিনবেলার খাওয়ার দায়িত্বটাও নিয়েছে। আতাহারেরটা তো নিয়েছেই, মান্নান মাওলানারটা নিয়েছে এমনভাবে যেন মা মারা যাওয়ার পর সংসারের বড়মেয়ে তার বুড়া বাপের দায়িত্ব নিয়েছে। তহুরা বেগম বেঁচে থাকতে এই ঘরের পালঙ্কে বসে ভাত খেতেন মান্নান মাওলানা। খাওয়ার সময় হলে পালঙ্কে দস্তরখান বিছিয়ে দিত রহিমা। খাবার সাজিয়ে দিত, হাত ধোয়ার জন্য দিত পিতলের চিলমচি আর তহুরা বেগম এসে বসতেন পাশে। রেকাবিতে ভাত তুলে দিতেন, তরকারি তুলে দিতেন, মান্নান মাওলানা ধীরে ধীরে খেতেন আর তহুরা বেগম সংসার নিয়া পোলাপান নিয়া টুকটাক কথা বলতেন। মান্নান মাওলানা খেতে খেতে কথা বলতেন।
এখনও আগের নিয়মটাই আছে। জহুর নমাজের পর পরই রহিমা তার অভ্যাস মতন পালঙ্কে দস্তরখান বিছায়, চিলমচি দেয়, ভাত তরকারি সাজিয়ে দেয় আর তহুরা বেগমের জায়গায় এসে বসে পারু। অতিযত্নে শ্বশুরের রেকাবিতে ভাত তরকারি তুলে দেয়, তিনি তার ভঙ্গি মতন খেতে শুরু করেন।
খাওয়ার সময়ও মান্নান মাওলানার মাথায় টুপিটা আছে। খানিক আগে জহুর নমাজ পড়েছেন। হাতে তসবি ছিল। তসবি এখন বালিশের কাছে রাখা। এই অবস্থায়ও পারুর কথা শুনে ডাহা মিথ্যা কথাটা তিনি বললেন।
রান্নাবান্না শেষ করে গোসল সেরেছে পারু। তার আগে ছোট মেয়েটাকে ডেকে এনেছে গনি মিয়ার সীমানা থেকে। মেয়েটা প্রায় সারাদিনই থাকে ওদিকটায়। মতিমাস্টারের প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে দুটি, হিরা মানিক সারাদিন বসে থাকে উঠানের পাশের জামগাছতলায়। মাটিতে লেছড়ে পেছড়ে পঙ্গু শরীরে যতটা পারে নড়াচড়া করে, অবোধ্য ভাষায় শব্দ করে, হাসে। নূরি কেমন কেমন করে ছেলেমেয়ে দুইটার লগে মিশা গেছে। যেন চার-পাঁচ বছরের এতটুকু বাচ্চাটা প্রতিবন্ধী ভাইবোন দুটির কথাবার্তা আচার আচরণ সবকিছুর অর্থ বোঝে। তাদের সঙ্গে খেলে, কথা বলে, হাঁটে। আর একজন মানুষও আছে এই তিনটি শিশুর সঙ্গে। মুকসেদ আলী। দেশগ্রামে মুকসেইদ্দা চোরা নামে পরিচিত। সাত-আট মাস হল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সেই যে বাড়িতে এসে বসেছে, চুরি ধাউরামি ছেড়ে দিয়ে মানুষ হওয়ার লাইন ধরেছে। এই বয়সে মতিমাস্টারের ছাত্র হয়েছে। লেখাপড়া শিখার ছাত্র না, মানুষ হওয়ার ছাত্র। সারাদিন আছে মতিমাস্টারের লগে। মাস্টার এদিক ওদিক ছাত্র পড়াতে যায়, খাইগোবাড়ির ইসকুলে যায়। নিজের নাও নাই মাস্টারের। হদ্দ গরিব মানুষ। মুকসেদ থাকে ভাইয়ের সংসারে। ছোট ভাই, ভাইর বউ আর পোলাপান তাকে খাতির যত্ন যতটা করার করে। সয় সম্মানও করে। কারণ এই ভাইর জীবনটা মুকসেদই গড়ে দিয়েছে। তার চুরির টাকায় নিজের হয় নাই কিছুই মুকসেদের, সবই হয়েছে ভাইয়ের। খেতখোলা গোরু বাছুর বাড়িঘর। বউ পোলাপান আরামে আছে মুকসেদের জন্যই। তবে বেইমানিটা মুকসেদের ভাই জমসেদ মুকসেদের লগে করে নাই। ভাইকে রেখেছে মাথার ওপর। ভাই যা বলে তাই সই। গিরস্তি করার নৌকা একখান আছে জমসেদের। মুকসেদ এসে বাড়িতে থান গাড়ার পর দক্ষিণের ভিটির ভাঙাচোরা ঘরটা সে ঠিকঠাক করে দিয়েছে ভাইকে। এইবার বর্ষা শুরু হওয়ার পর পরই দিঘলির হাট থেকে ছোট্ট একখান কোষানাওও কিনা আনছে ভাইর জন্য। সেই নাও নিয়া মতিমাস্টারের লগে লাইগা আছে মুকসেদ। মাস্টাররে নিয়া নাও বাইয়া ছাত্র বাড়ি যায়, ইসকুলে যায়। মাস্টার ঘণ্টা-দুইঘণ্টা ধরে ছাত্র পড়ায়। মুকসেদের মতন এতবড় নামকরা চোর বাড়ির গোমস্তার মতন নাওয়ে বসে থাকে। নমাজ ধরে নাই, তবু তার মাথায় সাদা গোল টুপি। পরনে লুঙ্গি পিরন। মোচদাড়ি কামানো ছাইড়া দিছে। কাঁচাপাকা দাড়িমোচে মুকসেদকে এখন আর দাগি চোর মনে হয় না। মনে হয় দেশগ্রামের সাদাসিধা গিরস্তলোক। মতিমাস্টারের ছাত্রবাড়ির ঘাটে কোষানাওয়ের চারটে বসে সে আকাশ দেখে, গ্রামের গাছপালা আর বর্ষাকালের পানি দেখে, আকাশ আর মাটির মাঝখান দিয়া উড়ে যায় যেসব পাখি সেইসব পাখি দেখে, পানির তলার মাছ দেখে, রোদ দেখে, হাওয়া টের পায় আর আল্লাহপাকের কুদরতের কথা ভাবে। নিজের ফেলে আসা চোরজীবন নিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
আহা একটা জীবন চুরি কইরা কাটল। দিনরাত পরিশ্রম করে সংসার ছেলেমেয়ের জন্য সোনাদানা টাকাপয়সা তামা পিতল কত কিছু জোগাড় করে গিরস্তলোক, আর সেইসব চুরি করে, তাদের সর্বনাশ করে নিজের জীবন চালিয়েছে মুকসেদ। চুরির অপরাধে গিরস্তের হাতে ধরা পড়ে মার খেয়েছে, দিনের পর দিন জেল খেটেছে। এরকম না হয়ে তার জীবনটা তো অন্যরকমও হতে পারত। দেশগ্রামের স্বাভাবিক গিরস্তলোকের জীবন। জামসেদের যেমন হয়েছে। বউ পোলাপান, গোরু বাছুর, ঘরবাড়ি আর চাষের জমিন! জীবনের যে স্বাভাবিক চক্র সেই চক্রের মধ্যেই যদি থাকতে পারত মুকসেদ।
আজ এই বয়সে এসে কোষানাওয়ের চারটে বসে এইসব কথা ভাবে মুকসেদ। ওদিকে বাড়ির ভিতরে মতিমাস্টার হয়তো তার ছাত্রকে তখন পড়াচ্ছেন,
আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে…
মানুষের জীবন তো আসলে এক ছোট নদীই। বাঁকে বাঁকেই তো চলছে জীবন। এই বয়সে এসে মুকসেদের জীবন যেমন বাঁক নিয়েছে আরেক দিকে। চোরজীবন হারিয়ে গেছে জীবনের ফেলে আসা বাঁকে।
