তেমুন সুবিদার অয় নাই।
সেন্টুর মুখটা কালো হয়ে গেল। সুবিদার অয় নাই? কন কী? আমার চা তো আইজ তরি কেউ খারাপ কয় নাই।
আলমগীর বলল, আমার তো ভালই লাগতাছে।
সুরুজ বলল, হ ভাল।
আতাহার নিখিলের দিকে তাকাল। তুই কী কচ রে নিখিলা?
আমি কিছুই কমু না।
ক্যা?
অসুবিদা আছে।
কী অসুবিদা?
আলমগীর আরেক চুমুক চা খেয়ে বলল, অর অসুবিদাটা আমি বুজছি।
আতাহারও চায়ে চুমুক দিল। কী অসুবিদা ক তো আমারে?
আলমগীর নিখিলের দিকে তাকালো, কমুনি রে নিখিলা?
ক।
সত্যঐ কমু?
তয় মিছানি!
আলমগীর আতাহারের দিকে তাকাল। ও ভালমন্দ কিছু কইবো না ক্যা জানচ? কইবো না একখান কারণে। ভাল কইলে আমরা মনে করতে পারি সেন্টু দাদায় আর অরা একজাত দেইখা, হিন্দু দেইখা সেন্টুদাদার খারাপ চারেও নিখিলা ভাল কইতাছে। আর খারাপ হইলে সেন্টুদাদায় মনে করবো, জাতভাই অইয়াও নিখিল আমার চা খারাপ কইলো।
শুনে নিখিল একেবারে হা হা করে উঠল। যা বেডা। এই হগল চিন্তা আমার মাথায়ই আহে না। হিন্দু মোসলমান গইনা আমি কথা কই না।
সেন্টু বলল, আমিও কোনওদিন ওইভাবে চিন্তা করি না। চা একদিন ইকটু খারাপ একদিন ইকটু ভাল হইতেই পারে। হাতে বানাইন্না জিনিস সবসময় একরকম নাও অইতে পারে।
আলমগীর চায়ে চুমুক দিয়া নিখিলের দিকে তাকাল। হাসিমুখে বলল, নিখিলা, তয় ক আইজ সেন্টুদাদার চা কেমুন অইছে।
সুরুজ বলল, হ রে নিখিলা, কইয়া হালা।
আতাহার হাসিমুখে বলল, তয় আমারে খুশি কর নাইলে সেন্টুদাদারে খুশি কর। একজনরে তো খুশি করন লাগবো।
নিখিল হাসল। চা লইয়া আইজ আমি কোনও কথাই কমু না। আইজ আমি অন্যকথা কমু।
কী কথা?
এই যে হিন্দু মোসলমানের প্যাঁচটা আমগো চাইর দোস্তের মইদ্যে লাগছে, এই প্যাঁচটা কি আগে আছিল? আছিল না। কে লাগাইছে ক তো?
আলমগীর বলল, আমি জানি। এইডা লাগায়া দিয়া গেছে ওই শালা মাটির কনটেকদারে। আলী আমজাদ। যেদিন প্যাঁচটা হেয় লাগাইছিল আমিঐ পয়লা ধরছিলাম কথাডা। কইছিলাম দুস্তির মইদ্যেও ধর্মের প্যাঁচখান আপনে লাগায়া দিলেন মিয়া। আপনে বহুত ত্যান্দর।
আতাহার চায়ে চুমুক দিয়া বলল, হ আমারও মনে আছে।
তারপর সেন্টুর দিকে তাকাল সে। আমার কথা হুইন্না মনে কষ্ট নিয়েন না সেন্টুদাদা। আমি আপনের লগে ফাইজলামি করছি। চা আপনের ভাল অইছে। বহুত ভাল। একদোম। ফাসকেলাস।
এবার সেন্টুর মুখে হাসি ফুটল। সত্য কইতাছো?
হ দাদা, সত্যঐ কইতাছি।
নিখিলের দিকে তাকাল আতাহার। এইবার তুই ক নিখিলা, সেন্টুদাদার চা তর কেমুন। লাগছে। অহন আর আমারে তর খুশি করনের কাম নাই।
নিখিল তার চায়ে শেষ চুমুক দিল। কাপ নামিয়ে রেখে বলল, সিগ্রেট দে।
আতাহারও তার চায়ে শেষ চুমুক দিল। আগে চায়ের কথা ক, তারবাদে সিগ্রেট।
ফাইজলামি করি না আতাহার।
আমি ফাইজলামি করতাছি না। আগে তর কওন লাগবো।
কইলাম না, এইডা লইয়া আমি আইজ কথাই কমু না। সেন্টুদাদার চা তর ভাল লাগছে তুই তার সুনাম কর। মন্দ লাগলে দুরনাম কর। আমি কোনওডাই করুম না।
বহুদিন পর খুবই সাহসী একটা কাজ তারপর করল নিখিল। আতাহারের টি-শার্টের বুক পকেটে ক্যাপস্টান সিগ্রেটের প্যাকেট। আতাহারের পকেট থেকে টেনে সিগ্রেটের প্যাকেটটা বের করল। নিজের পকেটে ম্যাচ ছিল। যেন নিজের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট ধরাচ্ছে এমন ভঙ্গিতে আতাহার প্যাকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাল। মুখ ভরে ধুমা ছেড়ে প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।
নিখিলের কারবারে আতাহার তো অবাক হয়েছেই, আলমগীর আর সুরুজও অবাক। সবাই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নিখিলের দিকে। ওদের ওইরকম তাকানো দেখে হাসল নিখিল। কী রে, এমতে চাইয়া রইছস ক্যা?
সুরুজ বলল, তর সাহস দেইখা।
কী করছি আমি?
আতাহারের জেব থিকা প্যাকেট লইয়া সিকরেট ধরাইলি।
এইডা সাহসের কিছু না।
তয় কী?
আতাহার আমার দোস্ত। দোস্তর জেবে হাত দিয়া প্যাকেট বাইর কইরা সিকরেট আমি ধরাইতেই পারি। আমার জেবেরটাও আতাহার পারে। তরটা পারে আলমগীর, আলমগীরেরটা পার তুই। তরটা পারে আতাহার, আলমগীরেরটা পারি আমি। দুস্তির নিয়মঐত্তো এইরকম, নাকি?
আলমগীর হাসল। সে চা খায় একটু সময় নিয়া। সবার চা শেষ হওয়ার পরও তার গেলাসে এক চুমুক চা রয়ে গেছে। সেই চা চুমুক দিয়া খেল সে। তর লগে চাইর-পাঁচদিন পর দেখা হইলো নিখিলা। এই চাইর-পাঁচদিনে তুই ইকটু বদলাইছস। এমুন কামও তর কোনওদিন দেহি নাই, এমুন কথাও তর মোখে কোনওদিন হুনি নাই।
আতাহার নিখিলের পিঠে ভাল রকম একটা থাবড় দিল। হাসিমুখে বলল,
সাবাস বাপের বেড়া
বাইচ্চা থাক চিরকাল
খুইট্টা যা চ্যাটের বাল
শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
ততক্ষণে আতাহারের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট নিয়ে ধরিয়েছে সবাই।
নিখিল বলল, আমগো দুস্তির মইদ্যে হিন্দু মোসলমানের প্যাঁচখান যে লাগাইয়া দিল, তার খবর কী রে আতাহার? তর দোস্ত আলী আমজাদ!
আরে কনটেকদারের তো কোনও খবরঐ নাই। দশ-বারোদিন আগে বাজারে একদিন। দেহা হইছিল। কইলো আমার লগে দেহা করতে আমগো বাইত্তে আইবো, আহে নাই।
আলমগীর বলল, তার তো অহন কোনও কামও নাই। বাইষ্যাকালে মাডির কাম কম। ওই যে দেহচ না কুমারবুগ মিহি অইয়া আধাবিধি অইয়া পইড়া রইছে রাস্তা। মাডি হালান অয় নাই। বাইষ্যাকালের পানিতে ভরা। এই কাম তো আলী আমজাদেরঐ আছিল।
