সিগ্রেটে টান দিয়া হাসল আতাহার। হ এই রকমই মায় ভাবছিল। আমি আর বাবায় উপরে উপরে তার কথায় রাজি হইছিলাম, ভিতরে ভিতরে আমগো বাপ-পোলার আছিল
অন্য মতলব।
কেমুন মতলব?
মা’রে আর পারুরে বুজতে দিমু না কিছু। ঘটকায় গোপনে অন্য জাগায় বিয়া ঠিক করবো। এমুন জাগায় বিয়া ঠিক করবো যেহেন থিকা খাট পালং আলমারি আর সোনাদানার লগে নগদ টেকাও পাওয়া যাইবো। ওই টেকা দিয়া ব্যাবসা বাণিজ্য কইরা আমি বড়লোক অইয়া যামু। মা’রে আর পারুরে তহন বাবায় আর আমি মিলা বুজ দিমু।
এইডা তো দোস্ত বিরাট বেইমানি।
আমি আর আমার বাপে ইমানি-বেইমানি বুজি না বেডা। আমরা বুজি খালি মাল। টেকা পয়সা।
সিগ্রেটে বড় করে টান দিয়া আতাহার বলল, মা’য় মরলো ক্যা জানচ তুই?
না তো? তয় তর মা’র হাট এটাক করছিল এইডা তুই আমারে কইছস।
হ মা’র হাটের অসুখ আছিল। তয় আথকা হাট এটাক তার করল ক্যা হেইডা হোন। সিনামার লাহান কাহিনি।
সেন্টুর দোকানের পুবদিক থেকে হেঁটে আসছিল ওরা। দোকানের পাশে খোলা একটুখানি জায়গা। আতাহার বলল, ল এহেনে খাড়ইয়া ঘটনা তরে কই। তারবাদে দোকানে ঢুকি।
ঠিক আছে।
জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আতাহার পর পর দুইবার সিগ্রেটে টান দিয়া সিগ্রেটের পিছন দিকটা ছুঁড়ে ফেলল। আমি আর আমার বাপে বাংলাঘরে বইয়া আমগো পেলান লইয়া কথা কইতাছিলাম। মায় আইতাছিল ওইঘর মিহি। আমগো বেবাক কথা হেয় হুইন্না হালাইতাছে। হুইন্না আর সইজ্য করতে পারে নাই। লগে লগে হাট এটাক করছে। ফিনিশ অইয়া গেছে।
আতাহারের মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল নিখিল। মাথা নেড়ে বলল, ঘটনা আইজ আমি বুজলাম। তয় পারুর অবস্থা কী?
সে তো মনের আনন্দে আছে। অহনও জানে অর লগে আমার বিয়া অইবো। মা’য় মরছে দেইক্কা বিয়া পিছাইছে। শীতের দিন আইলেঐ বিয়া অইয়া যাইবো।
হাসলো আতাহার। হ শীতের দিনেঐ বিয়া আমি করুম। তয় পারুরে না। অন্য মাইয়া।
পারুরে তহন ম্যানেজ করবি কেমনে?
পয়লা বাবায় অর লগে কথা কইবো, তারপরে আমি কমু।
কী কবি?
কমু এই বিয়ায় আমার মত আছিল না। বাবার কথায় রাজি হইছি।
আর তর বউ যহন তগো বাড়িতে আইয়া হুনবো পারুর লগে তর সম্পর্ক আছিল, পোলাপান তিনডা তর, তহন তর নতুন বউ কী মনে করবো?
চ্যাট মনে করবো। এইরকম কত অয়।
একটু থামল আতাহার তারপর বলল, তয় দোস্ত, তরে বিশ্বাস কইরা কথাডি আমি কইলাম। এই কথা য্যান কেঐর কানে না যায়।
নিখিল ম্লান হেসে বলল, না যাইবো না। ল অহন সেন্টুর দোকানে যাই। চা খাওন। লাগবো। তর কথা হুইন্না আমার মাথা ধইরা গেছে।
আতাহার হাসল। তোমার মাথা আবার বেশি মুলাম দোস্ত। কথায় কথায় ধরে।
.
ভেন্না কাঠের নৌকাখানি
মাঝখানে তার গুড়া
আগার নাইয়া পাছায় গেলে
গলুই পড়ে খইয়া রে মাঝি বাইয়া যাও রে…
সেন্টুর দোকানে কোনও গাহেক নাই। আলমগীর আর সুরুজ বসে আছে একটা বেঞ্চে। সামনের টেবিলে তবলার মতন চাটি বাজিয়ে নিচা গলায় গান গাইছে আলমগীর। সুরুজ তেমন মুগ্ধ না, সেন্টু মুগ্ধ হয়ে আলমগীরের গান শুনছে।
আতাহার আর নিখিল এসে ঢোকার লগে লগে গান থামাল আলমগীর। আইছো দোস্তরা? আহো আহো। এত দেরি করলা ক্যা?
নিখিল বলল, আমরা যে আমু তরা জানতি?
সুরুজ বলল, জানুম না? আতাহার তো আমগো খবরঐ দিছে তোরা বাজারে আবি। সেন্টুর দোকানে বইয়া আমরা আড্ডাবাজি করুম।
আতাহার তো আমারে কিছু কয় নাই।
আতাহার হাসল। আমি তো বেডা তগো বাড়ি অইয়া আইছি। বাইত্তে উডি নাই। নৌকা থিকা জিগাইলাম তুই বাইত্তে আছসনি? তর বাপে আছিল বাইত্তে, কইলো, না, বাজারে গেছে। আমার ইচ্ছা আছিল তরে বাইত্তে থিকা লইয়ামু।
নিখিল একটা বেঞ্চে বসল। ও এই মতলব।
আতাহার বসল নিখিলের পাশে। সেন্টুর দিকে তাকিয়ে বলল, চা দেন সেন্টুদাদা। ফাসকেলাস চা দেন।
আলমগীরের দিকে তাকাল আতাহার। এই ফাঁকে গানহান শেষ করো দোস্ত। বহুত ভাল্লাগতাছিল তোমার গান।
আলমগীর কোনও কথা ছাড়াই আগের মতন গাইতে লাগল…
মাঝি বাইয়া যাওরে
অকুল দরিয়ার মাঝে
আমার ভাঙ্গা নাও রে মাঝি
বাইয়া যাও রে…
গান শেষ হওয়ার পর আতাহার বলল, দোস্তে আইজ বহুত মুডে আছে। ঘটনা কী?
আলমগীর হাসল। কোনও ঘটনা নাই। তগো লগে দেহা হইলো এই আনন্দে গান ধরছিলাম।
সুরুজ বলল, দোস্তে আমার বিরাট বয়াতি।
সেন্টু চায়ের গেলাসে দুধ চিনি মিশিয়ে কেটলি থেকে চায়ের লিকার ঢালল গেলাসে। চায়ের সুন্দর গন্ধে ভরে গেল চারদিক। তারপর চায়ের চামচে ফটাফট শব্দ করে গেলাসে চায়ের লিকার আর দুধ চিনির মিশেল দিতে দিতে সে বলল, আলমগীর দাদার গলাখান ভগবানের দয়ায় বিরাট সোন্দর। চেষ্টা করলে বিরাট বয়াতি অইতে পারতো দাদায়। খালেক দেওয়ান মালেক দেওয়ানের লাহান।
আলমগীর লজ্জা পেল। আরে ধুর। কই এত বড় বড় বয়াতি আর কই আমি। আরে আমি তো সেহের আলী পিয়নের পোলা হালিমের লাহানও অইতে পারতাম না।
নিখিল বলল, হালিম তো রেডিয়ো টেলিভিশনে পল্লিগীতি গায়। ভাল নাম করছে।
সুরুজ বলল, হ আমিও হুনছি।
সেন্টু চা বানিয়ে টিনের থালায় করে ওদের সামনে নামিয়ে রাখল। যে যার গেলাস নিয়া চুমুক দিল।
সেন্টু তাকিয়ে ছিল আতাহারের দিকে। আতাহার চায়ে চুমুক দেওয়ার পর বলল, চা কেমুন অইছে দাদা?
