তারপর পারুর লগে আতাহারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, মোতাহারের শারীরিক সমস্যা, পারুর তিনটা পোলাপানই যে আতাহারের ঔরসে সবই ফইজুকে বলল বসির। শুনে ফইজুর হাত থেকে বইঠা প্রায় খসে পড়ে। গভীর বিস্ময়ের গলায় বলল, কন কী ঘটকদাদা?
হ বেডা। এইডা তো দেশগেরামের বেবাকতেই জানে। তুই জান না?
না দাদা। আমি গরিব মানুষ, সংসারে বিরাট ভেজালের মইদ্যে থাকি। মাইনষের কথায় কান দেওনের আজাইর পাই নাই।
বুজছি বুজছি। হোন ফইজু, পারুরে আইজঐ আমি পয়লা দেখলাম। দেইক্কা মাইয়াডা আমার চোক্কে এক্কেবারে লাইগ্যা গেল। কী সোন্দর মাইয়া। আমি আতাহার আর পারুর ঘটনা জানি। জাইন্নাও হুজুরের কথায় আর টেকাপয়সার কাম হইবো দেইক্কা আতাহারের লেইগা মাইয়া দেখতাছিলাম। বইলতলি গ্রামের এক মাইয়া দেখছি, তারা আতাহারের খোঁজখবর লইয়া জানছে পোলার সবাব চরিত্র ভাল না। না কইয়া দিছে। তারবাদে মাইয়া দেকলাম গাদ্দা। ওয়াজদ্দি সাবের মাইয়া কমলা। হুজুররে কইছি মাইয়ার একখান খুঁত আছে, মাইয়া লক্ষ্মীট্যারা। তয় এমতে সোন্দরঐ। এইডা আমি মিছাকথা কথা কই নাই। মিছা কথা কইছি ট্যারাডা লইয়া। আসলে মাইয়া লক্ষ্মীট্যারা না, পুরা ট্যারা। একমিহি চাইলে আরেক মিহি দেহে। তাও হুজুরে কয় এই মাইয়া আমারে আইন্না দে। খাট পালং আলমারি আর সোনাদানার লগে পাঁচলাখ নগদ দেওন লাগবো। এইডা কইলাম সম্ভব। ওই ট্যারা মাইয়া পাঁচ-দশলাখ খরচা কইরা ওয়াজদ্দি সাবে পার করবো। আমারও ভাল ঐ টেকাপয়সার কাম হইবো। তারবাদেও পারুরে দেইক্কা হুজুররে আমি কইলাম….
পারু আর আতাহারের ব্যাপারে মান্নান মাওলানাকে যা যা বলেছিল সবই ফইজুকে বলল বসির। তারপর মান্নান মাওলানাকে একটা গালি দিল। বেবাক হুইন্না শালার পো শালায়। আমারে কয় কী, তয় পাঁচলাখ টেকা তুই আমারে দে। শালায় একবারও ভাবলো না, ওর। বাড়ির বদলাম যাতে বাইরে আর না রটে এর লেইগাঐ কথাডা আমি কইছি। নিজের লোসখান মাইন্না লইয়াঐ কইছি। ঠিক আছে, তারবাদে আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছি ওয়াজদ্দি সাবের ওই টেরি মাইয়াঐ শালার বাড়ির বউ কইরা আমি আইন্না দিমু, তয় এমুন ঝুলাইতে ঝুলাইতে আনুম, এমুন টেকা খামু অর কাছ থিকা ওই হালার আলিস (গুহ্যপথের ভিতর দিককার মাংস) বাইর কইরা হালামু।
ফইজু মন খারাপ করা গলায় বলল, হেইডা তো করবেন, তয় পারু মাইয়াডার তো জিন্দেগি ছারখার অইয়া যাইবো। যেই দেওরের লেইগা এত বদলাম মাইয়াডার, যার পোলাপান পেডে লইছে, যারে মন পেরান শরীল বেবাক দিছে, যারে লইয়া অহন নতুন সংসার করনের খোয়াব দেখে, আহা এমুন মাইয়াডার বেককিছু ছারখার হইয়া যাইবো। বহুত দুঃখ পাইবো মাইয়াডা।
এর লেইগাঐ নিজের লোসখানের কথা না ভাইবা কথাডা শালারে আমি কইছিলাম। শালায় তারপর বালছাল চ্যাট ম্যাট এমুন সব কথা কইলো, শালায় বলে মাওলানা, মাথায় টুপি আছে, টুপি মাথায় দিয়া এই হগল কথা কওন যায়। অর যে অজু ভাইঙ্গা যাইবো, একবারও ভাবলো না? শালার পো শালায় মানুষ না, খাডাস। টেকাপয়সার লোভে আপনা পোলার বউডার জিন্দেগি বিনাস করতাছে।
হেয় নাইলে এই চিন্তা ভাবনা করতাছে, আর তার পোলায়? আতাহারে?
আরে ওই শুয়োরের পোয় তো আরও খারাপ। ভাবীর লগে এতদিন থাকছে অর অহন নতুন মাইয়া দরকার। টেকার দরকার। অর কি অহন আর পুরানা পিরিতি ভাল লাগবোনি?
ফইজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আহা রে, পারুর জিন্দেগি বিনাস অইয়া যাইবো। এত সোন্দর মাইয়াডার কপাল যে আল্লায় ক্যান এমুন করল?
সীতারামপুরের খালে ঢুকে বসিরের দিকে তাকিয়েছে ফইজু, দেখে বসির আবার সিগ্রেট ধরিয়েছে। দেখে ফইজুরও খুব ইচ্ছা করল একটা সিগ্রেট খায়। অন্য সময় হলে বসিরের কাছে সিগ্রেট চাওয়ার সাহস হত না। এখন হল। খুবই বিনয়ের গলায় বলল, ঘটকদাদা, আমারে একখান সিকরেট দিবেন?
বসির কিছুই মনে করল না, প্যাকেট থেকে একটা সিগ্রেট বের করল। নে।
তারপরই বলল, ধরাইয়া দেই। তুই তো নাও বাইতাছস, ধরাবি কেমতে?
ম্যাচ জ্বেলে ফইজুর সিগ্রেটটা ধরিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিল বসির। সিগ্রেট নিয়া মুগ্ধ ভঙ্গিতে টান দিল ফইজু। ধুমা ছেড়ে বলল, বহুত খুশি হইলাম ঘটকদাদা, বহুত খুশি হইলাম।
বসির কথা বলল না।
ফইজু মনে মনে বলল, এক মানুষের ভিতরে আসলে থাকে দুইজন মানুষ। খারাপ আর ভাল। দুইজন মানুষই সমায় সমায় বাইর হয়। ঘটকদাদার ভিতরের ভাল মানুষটা আইজ এইমাত্র একবার বাইর হইলো। আরেকবার বাইর হইছিল পারুর বিষয়ে হুজুরের লগে কথা কওনের সমায়। আল্লাহপাকের কারবারঐ এমুন। পুরা ভাল কইরাও বানাই নাই কেঐরে, আবার পুরা খারাপ কইরাও বানায় নাই। ভালর মইধ্যেও কমবেশি খারাপ আছে, খারাপের মইদ্যেও কমবেশি ভাল আছে।
এখন রোদ নাই দেখে ছাতি বুজাইয়া ফালাইছে বসির। খোলা আশমানের তলায়, চারদিকে বর্ষার পানি, ঝিরঝিরা হাওয়ায় সিগ্রেট টানতে টানতে উদাস হয়ে আছে। হঠাৎই ফইজুর দিকে তাকাল সে। আরেকখান কথা হোনলে তো তুই চইমকা উটবি ফইজু।
ফইজু সিগ্রেট টানছে আর আয়েশি ভঙ্গিতে বইঠা বাইছে। বসিরের কথা শুনে তার দিকে তাকাল। কী কথা?
ওই যে কয়দিন আগে দবির গাছির বাইত্তে গেছিলাম, ক্যান গেছিলাম জানচ?
