হামিদার কথা কিছুই কানে যাচ্ছে না দবিরের। অন্ধকার ঘরে তখনও হোগলায় বসে আছে সে। মেয়ের পাশে শুয়ে কথা বলে যাচ্ছে হামিদা আর দবির গাছি শুনছে টুপ টুপ শব্দে চারপাশের গ্রামের প্রতিটি খাজুরগাছ থেকে মাটির হাড়িতে ঝরছে রস। ঝরে ঝরে পূর্ণ করে তুলছে হাড়ি। ভোরবেলার একলা তৃষ্ণার্ত শালিখ পাখি হাড়ির মুখে বসে ঠোঁট ডুবাচ্ছে রসে। তৃষ্ণা নিবারণ করতাছে।
.
১.২৩
ছনুবুড়ির ঘুম ভাঙল রাত দুপুরে।
চাঁদ তখন ম্লান হতে শুরু করেছে। গ্রামের গাছপালা চকমাঠ খাল পুকুর আর মানুষের বসতভিটায় অলস ভঙ্গিতে পড়েছে দুধের সরের মতো কুয়াশা। জ্যোৎস্নার রঙ হয়েছে টাটকিনি মাছের মতো, কুয়াশার রঙ যেন বহুদিন থানবন্দি থাকা কাফনের কাপড়। রাত দুপুরের নির্জন প্রকৃতি, মেদিনীমণ্ডল গ্রামখানি ধরেছে অলৌকিক এক রূপ। শীত রাত্রির বুকপিঠ ছুঁয়ে হু হু, হু হু করে বইছে উত্তরের হাওয়া। উত্তরের কোন অচিনলোকে জন্ম এই হাওয়ার, মানুষের কল্যাণে কে পাঠায় হাওয়াখানি মানুষ তা জানে না।
রাত দুপুরের এই হাওয়ায় ছনুবুড়ির গা কাঁটা দিল না, প্রবল শীতে শরীরের অজান্তে কুঁকড়ে এল না শরীর। বুকটা কেমন আইঢাই করে উঠল, তৃষ্ণায় ফেটে যেতে চাইল গলা।
এরকম শীতের রাতে কার পায় এমন তৃষ্ণা! ঘুম ভাঙার পর কার বুক করে এমন আইঢাই!
ছনুবুড়ি বুঝতে পারল না এমন লাগছে কেন তার। ছানিপড়া ঘোলা চোখে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক তাকাতে লাগল।
ঘরের ভিতর গাঢ় হতে পারেনি অন্ধকার। চারদিকে আছে বাঁশের বেড়া। ঘর তোলার পর ছইয়াল (বাঁশের কাজ করে যারা) ডেকে কখনও সারাই করা হয়নি। বৃষ্টি বাদলায় খেয়েছে যা, গোপনে সময় নামের খাদক খেয়েছে তারচেয়ে বেশি। ফলে বেড়াগুলি এত জীর্ণ, এত নড়বড়া, না রোদ জ্যোৎস্না আটকাতে পারে, না বৃষ্টি বাতাস।
আজ রাতে জ্যোৎস্না ঢুকেছে চারদিক দিয়ে আর হাওয়া ঢুকছে শুধু উত্তর দিক দিয়ে। ছনুবুড়ি শুয়েছে উত্তরের বেডা বরাবর মুখ করে। হাওয়ার ঝাপটা সরাসরি এসে লাগছে তার মুখে।
ছনুবুড়ির পিঠের তলায়, মাটিতে পাতলা করে বিছানো আছে ডাটি। (ধানের ছড়া কেটে নেওয়ার পর দুটো অংশ হয় খড়ের। আকাশ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে যে অংশ তাকে বলে ডাটি। ডগা অর্থে। আর কাদা মাটিতে লেপটে থাকে যে অংশ তা হচ্ছে নাড়া। নাড়া ব্যবহার করা হয় রান্নার কাজে। ডাটি দিয়ে গরিব গৃহস্ত ঘর গোহালের বেডা তৈরি করে। শীতকালে পিঠের তলায় বিছিয়ে শোয়) তার উপর পুরানা ছেঁড়া একখানা হোগলা। হোগলার উপর মোটা ভারী, বেশ বড় একটা কাঁথা। কত জায়গায় যে ছিঁড়ে ঝুল বেরিয়েছে কাঁথার, ইয়ত্তা নাই। এই কথাখানা দুইভাগে ভাঁজ করে শোয়ার সময় ভিতরে ঢুকে যায় ছনুবুড়ি। এক কাজে দুইকাজ হয়। যে কাঁথা গায়ে সেই কথাই বিছানায়। তাতেই কী শীত মানে (নিবারণ)? মানে না। ডাটি হোগলা কাঁথা এই তিন শত্রু কাবু করে পাতাল থেকে ঠেলে ওঠে অদ্ভুত এক হিমভাব। উঠে সুঁচ ফুটাবার মতো ফুটা করে রোমকূপ। শরীরের ভিতর দখল নেয়। এদিকে শূন্যে আছে উত্তরের হাওয়া, কুয়াশা শিশির। সব মিলিয়ে শীতকালটা বড় কষ্টের। যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। বয়সের ভারে নত হওয়া মানুষ কত পারে যুদ্ধ করতে! ফলে মৃত্যুটা তাদের শীতকালেই হয় বেশি। শীতের মুখে মুখে গ্রামাঞ্চলের বুড়ারা তাই প্রমাদ গোনে। এই শীতটা পার করতে পারলে আর একটা বছর বেঁচে থাকা যাবে। বুড়াদের জন্য শীত যেন এক মৃত্যুদূত। আজরাইল ফেরেশতা। ঘাড়ের ওপর এসে দাঁড়িয়েই থাকে। এদিক ওদিক হলেই জান কবচ করবে, উদিস পাওয়া যাবে না।
ছনুবুড়ির হচ্ছে উল্টা। না মাটির হিমভার না উত্তরের হাওয়া, আজকের এই রাত দুপুরে কোনওটাই গায়ে লাগল না তার বুকের ভিতর অচেনা অনুভূতি তো আছেই, কলিজা আর কণ্ঠনালী ফেটে যাচ্ছে প্রবল তৃষ্ণায়। তার ওপর হচ্ছে ভয়াবহ এক উষ্ণভাব। যেন পাতাল থেকে উঠে তার দীর্ঘকাল অতিক্রম করে আসা দেহে রোমকূপ ফুটা করে ঢুকছে অচেনা এক তুসের আগুন। উত্তরের হাওয়ায় একটুও নাই শীতভাব। খালিকালের কোনও কোনও দুপুরে দূর প্রান্তর অতিক্রম করে আসে এক ধরনের উষ্ণ হাওয়া, সেই হাওয়ায় গায়ের কাপড় ফেলে দিতে ইচ্ছা করে মানুষের, লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে পুকুরের পানিতে, উত্তরের হাওয়াটা এখন তেমন লাগছে ছনুবুড়ির। মাটির গর্তে বদনার নল দিয়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়ার পর যেমন ছটফট করে বেরিয়ে আসে তুরখোলা ঠিক তেমন করে কাঁথা থেকে বের হল সে। কাঁথার সঙ্গে শরীর থেকে যে খসে গেছে চামড়ার মতো লেগে থাকা মাটি রঙের থান, ছনুবুড়ি তা টের পেল না। শরীরে এমন এক উষ্ণভাব, ছনুবুড়ির ইচ্ছা করে শীতন্দ্রিা থেকে বেরিয়ে আসার পর সাপ যেমন করে তার ছুলুম (খোলস) বদলায় তেমন করে শরীর থেকে খুলে ফেলে বহু বর্ষা বসন্তের সাক্ষী ঝুলঝুলা চামড়া। শরীর শীতল করে। আর একটা আশ্চর্য কাণ্ড আজকের এই রাত দুপুরে নিজের অজান্তেই করে ফেলে ছনুবুড়ি। শিরদাঁড়া সোজা করে যৌবনবতী কন্যার। মতো মাথা তুলে দাঁড়ায়। কতকাল আগে দেহ তার বেঁকে গিয়েছিল মাটির দিকে, সেই দেহ আর সোজা হয়নি। দেহ হয়েছিল নরমকঞ্চির ছিপ। সেই ছিপের অদৃশ্য বড়শিতে গাঁথা পড়েছিল মাটির তলায় লুকিয়ে থাকা বিরাট এক মাছ। বহুকাল ধরে সেই মাছ ছনুবুড়িকে টেনে রেখেছিল মাটির দিকে। সোজা হতে দেয়নি। আজ বুঝি মাছ গেছে আনমনা হয়ে গেছে। সেই ফাঁকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছনুবুড়ি। দাঁড়াবার পর বহুকালের চেনা এই ঘর হঠাৎ করেই অচেনা লাগে তার চোখে। ছানিপড়া চোখে পরিস্কার দেখা যায় না সবকিছু। ছনুবুড়ির চারপাশে ছড়ানো আছে গিরস্থের কত না দীনহীন স্থাবর, দরকারে অদরকারে এই ঘরে এসে জড় হয়েছে কত না হাঁড়িকুড়ি, কত ঘটিবাটি। একপাশে লোটে মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছনুবুড়ির বয়সের কাছাকাছি বয়সের ঢেঁকি। ঢেঁকির পায়ের কাছে দুইজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পাড় দিতে পারে এমন একটা ভিত। ভিতের ঠিক উপরে বাতার সঙ্গে ঝুলছে মোটা দড়ির আংটা। ধানবানার সময় এই আংটা ধরে দাঁড়ায় বাড়ির বউঝিরা। তালে তালে ধান বানে, মনের সুখে গান গায় ‘ও ধান বানি রে, ঢেঁকিতে পাহার দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া’।
