হ।
এইডা একখান কামের কাম হইবো। এমুন একখান বউ, এই বসে বিধবা অইয়া থাকবো, এইডা আল্লায়ও সইবো না। এর লেইগাঐ হুজুররে দিয়া একপোলার বউরে আল্লায় আরেকপোলার বউ বানাইতাছে।
ফইজুর কথা শুনে শরম করছিল পারুর। সে কোনও কথা বলতে পারছে না। চুপচাপ মাটির দিকে তাকায়া বইসা রইল। মনে বিষম খুশির ভাব।
ফইজু মুড়ি চাবাতে চাবাতে চিন্তিত গলায় বলল, বড়পোলার বউর বিয়া হইবো মাজারো পোলার লগে, বেবাক ঠিকঠাক, তয় এই বাইত্তে ঘটক আইছে ক্যা?
এই জবাবটা পারু দিল। এই বাইত্তে আরেকখান পোলা আছে। ছোডপোলা। জাপানে থাকে। সে দেশে আইসা বিয়া করবো। এর লেইগাঐ ঘটক আইছে।
হ হেইডাঐ অইবো।
তারপর আবার চিন্তিত হল ফইজু। তয় ঘটকে আবার দবির গাছির বাইত্তে গেছিলো ক্যা? গাছিরে এত খাতির কইরা…
পারুও অবাক হল। দবির গাছির বাইত্তে গেছিল?
হ।
কবে?
এইত্তো দুই তিনদিন আগে।
এবার হাসল পারু। গাছির মাইয়ার লেইগা কোনও মিহি মনে অয় সমন্দ দেকছে, এর লেইগাঐ ওই বাইত্তে গেছে। ঘটকের কামত্তে এইরকম।
হ এইডা ঠিকঐ কইছেন মা। ওই বাইত্তে যাওনের লগে এই বাইত্তে আহনের কোনও সমন্দ নাই।
ফইজুর মুড়ি অর্ধেকখানি খাওয়া হইছে, বাংলাঘর থেকে বাইর হইয়া আসলো আতাহার। তার পরনে জিনসের প্যান্ট আর টি-শার্ট। পায়ে কেডস। ঘর থেকে বের হয়েই আথালের দিকে তাকায়া বলল, হাফিজদ্দি নাও রেডি কর। আমি বাইর অমু।
লগে লগে আথাল থেকে বের হয়ে আসল হাফিজদ্দি। অহনই রেডি করতাছি দাদা। আপনে আহেন।
তারপর রান্নঘরের দিকে তাকাল আতাহার। অচেনা লোকটাকে পারুর কাছাকাছি বইসা মুড়ি মিঠাই খাইতে দেইখা আগায়া আসল। এই, তুমি কে?
ফইজু কথা বলবার আগেই পারু বলল, ঘটকের লগে আইছে। তার নাও বায়।
ও আইচ্ছা।
তুমি যাও কই?
বাজার মিহি যামু। বাইত্তে ভাল্লাগতাছে না।
আইচ্ছা যাও।
আতাহার বাইর বাড়ির দিকে চলে গেল।
এক চুলায় চায়ের পানির লগে দুধ চিনি চাপাতা একলগে দেওয়া হইছে। বলক দিয়া সেই চায়ের ভাল রকম গন্ধ ছুটছে। মাছ কোটা হাতে ট্রেতে সাজানো তিনখান কাপে চা ঢালতে যাবে সে, পারু বলল, তোমার কাম নাই চা বানানের। আমি বানাইতাছি।
চটপটা হাতে তিনকাপ চা বানাইয়া ফেলল পারু। একটা কাপ ফইজুর দিকে আগায়া দিয়া বলল, খান।
রহিমা বলল, তয় অহন হুজুরের ঘরে চা দিতে যাইবো কে?
আমি বেবস্তা করতাছি।
শিরিনকে ডাকলো পারু। শিরি, ওই শিরি। এই মিহি ইট্টু আয় তো মা।
শিরি প্রায় লগে লগে আসল। কী মা?
দুই কাপ চায়ের ট্রে মেয়ের হাতে দিয়া পারু বলল, তর দাদার ঘরে দিয়ায়।
আইচ্ছা।
চায়ের ট্রে নিয়া মান্নান মাওলানার ঘরের দিকে পা বাড়াইছে শিরি, পারু বলল, নসু নূরি কো?
নসু অঙ্ক করতাছে। আর নূরি গেছে মন্তাজ দাদাগো ওই মিহি। হিরা মনিকের লগে খেলতাছে।
আইচ্ছা ঠিক আছে। তুই যা।
শিরিন যখন মান্নান মাওলানার ঘরে ঢুকছে, তার প্রায় লগে লগেই বাংলাঘরের ওদিক থেকে ল্যাংড়া বসিরও তার ল্যাংড়া পা টাইনা টাইনা সেই ঘরে আইসা ঢুকল। একবার সেইদিকে তাকাল ফইজু। চায়ে চুমুক দিয়া বলল, আমি জানি না মা আপনে কোন গেরামের মাইয়া, কোন বাড়ির মাইয়া। তয় আপনে যে বহুত ভাল ঘরের মাইয়া হেইডা আপনের চেহারা ছবি দেইক্কা যেমুন বুঝা যায়, আচার ব্যবহারেও বুঝা যায়। বহুতদিন বাদে দেশ গেরামে এইরকম একহান বউ দেখলাম। আল্লার কাছে দোয়া করি মা, আল্লায় য্যান আপনেরে ভাল রাখে। আল্লায় য্যান আপনের মনের বেবাক আশা পূরণ করে। স্বামী পোলাপান লইয়া আপনে য্যান সুখে থাকেন।
ফইজুর কথা শুনে পারুর খুব ইচ্ছা করল তার পায়ে হাত দিয়া কদমবুসি (সালাম) করতে। রহিমা সামনে আছে, ঘটকের গোমস্তারে কদমবুসি করছে মান্নান মাওলানার ছেলের বউ এটা সে কীভাবে নিবে কে জানে।
মনের ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারল না পারু।
.
বেদ্দপি না নিলে একখান কথা কইতাম হুজুর।
মান্নান মাওলানা চায়ে চুমুক দিলেন। জানালা দিয়া বাইরে তাকিয়ে বেলা কতখানি হল বুঝে আবার বসিরের দিকে তাকালেন। তর তো বেড়া কথাই শেষ অয় না!
বসির শব্দ করে চায়ে চুমুক দিল। কেমতে শেষ হইবো, কন? হে হে। তিনজন মাইনষের বিয়ার কথা এত তাড়াতাড়ি শেষ অয়? তয় হুজুর আপনের বাইত্তে দুইরা ভাত খাইয়া যাওনের ইচ্ছা আমার নাই। দুফইরা ভাত আমি বাইত্তে গিয়াঐ খামু। আমার গোমস্তা ফইজু তামুক তুমুক খাইছে। অহন খালি কথা শেষ কইরা বাইত্তে মেলা দিমু।
অইছে। ক কী কবি?
ওই যে আপনেরে কইছিলাম আপনের বড়পোলার বউ পারু আমার একদোম চোক্কে লাইগ্যা রইছে।
হ কইছচ। তয় তুই কি পারুর বিয়ার ঘটকালি করতে চাসনি?
হ।
মান্নান মাওলানা চায়ে চুমুক দিতে গিয়া থামলেন। কী? তিন পোলাপানের মা, দশ-বারো বচ্ছর অইলো বিয়া হইছে, আমার বাড়ির বউ, তারে তুই বিয়া দিতে চাস?
হ চাই হুজুর। হে হে। তয় অন্য কোনওখানে না। আপনের বাইত্তেঐ বিয়া দিতে চাই।
মান্নান মাওলানা চায়ে চুমুক দিলেন। তর কথা আমি বুজছি।
পানির লাহান সোজা কথা। বুজবেন না ক্যা? হে হে।
বসির চায়ে চুমুক দিল। এই বিয়াড়ায় আপনের সুবিদা অইলো তিনখান। এক, আহাতারের লেইগা অন্য জাগায় মাইয়া দেকতে হইবো না। আপনের পোলার সবাব চরিত্র লইয়া কথা কইতে হইবো না। আপনের এমুন পরির লাহান বউডারও বদলাম ঘুচবো।
