সেইভাবেই কাজটা সারল ফইজু। নাইয়া ধুইয়া, অজু কইরা ধোয়া লুঙ্গি পিরন পইরা, মাথায় টুপি দিয়া পশ্চিমের ভিটির ঘরের কোনায় দাঁড়াইয়া আজান দিল। বদুর ঘরে তখন ওঁয়া ওঁয়া করতাছে মাত্র দুনিয়াতে আসা পোলাটা।
তারপর নাতির মুখ দেখছে ফইজু। আনন্দে ডগেমগো হইয়া ওই অতটুকু নাতি কুলে কইরা উঠানে আনছে খাতুন। এই যে দেহো তোমার নাতি। নাতির মুখ দেখছো, কিছু দেও তারে।
ফইজু কী দিবো? কী আছে তার?
দুইটা টাকা ছিল জেবে। সেইটাই দিল। দেইখা এমন একখান মুখ খিচানি দিল খাতুন! এমুন ফউকরা (ফকির, গরিব অর্থে) দাদা আমি ইহজিন্দেগিতে দেহি নাই। নাতির মুখ দেইখা দেয় দুইটেকা। যাও, সরো তুমি আমার চোক্কের সামনে থিকা।
খুবই শরম পাইছিল ফইজু। আর দুই-একবার যে নাতির মুখোন দেখবো, সুযোগই পাইলো না। নাতির উপরে শকুনের পাখনার মতন পাখনা মেইলা রাখলো খাতুন। পোলার মা আসুরাও ভাল মতন দেখতে পারে না পোলার মুখ। খালি বুকের দুধ দেওনের সময় খাতুন একটু সইরা আসে।
বাড়িতে ফইজুর দশা খুবই কাহিল। খাতুন তারে মানুষই মনে করে না। তার উপরে হইছে নাতি। তিনপোলা বাড়িতে, মাইয়া মাইয়ার জামাইরা খবর পাইয়াঐ নিজেগো পোলাপান লইয়া এই বাড়িতে আইসা উঠবো, কবুতরখোলা থিকা আসবো আসুরার মা বাপ ভাইবইন। বিরাট আমদ আহ্লাদ শুরু হইবো বাড়িতে। খাতুনের নানান পদের অপমান। উঠতে বসতে সইতে হয় ফইজুর, খাওন দাওন চাইয়া পায় না। এই অবস্থায় বাড়িতে মেজবান আইলে খাতুন কী না কী করে তার লগে, কোন অপমান করে, এই ডরে দুপুরের ভাত না খাইয়াই ছোট পোলা কাসুরে ফইজু অনুনয়ের গলায় বলছিল, আমারে ইট্টু ঘটকার বাইত্তে নামাইয়া দিয়া আবি বাজান। আমি কয়দিন ওই বাইত্তে থাকুম নে।
বাপের মনটা বুঝলো কাসু। ক্যান ঘটকার বাড়িতে কাম লইছে সে, ক্যান ওই বাড়িতে গিয়া থাকতে চায় বুঝল। কয়েক পলক কী জানি ভাবল, তারবাদে বলল, লও।
তারপর থেকে আর বাড়িতে যায় নাই ফইজু। ঘটকের বাড়িতেই আছে। আছে পেটে ভাতে। তাও ঘটক সিকি আধলিটা দেয় বিড়ি খাওয়ার জন্য। আইজ দেয় নাই। ঘটকালির তালে আছে তো, ফইজুর কথা মনে নাই।
ফইজুর পরনে সেদিনকার সেই লুঙ্গি আর পিরন। মাঝখানে একটা দিন গেছে। আর একখান লুঙ্গি পিরন তার আছে, একজোড়া পরে আরেক জোড়া খোয়। নমজটাও নিয়মিত সেদিনকার পর থেকে পড়ছে। টুপি থাকে পিরনের জেবে। অনেকক্ষণ নাওয়ে বইসা মান্নান মাওলানার বাড়ির কামলা লোকটারে তামাক টানতে দেখল ফইজু তারপর আর সহ্য করতে
পাইরা বাড়িতে উঠল। রান্নঘরের ওই দিকে আইসা আস্তে কইরা একখান কাশ দিল। রানঘরে পারু রহিমা আছে, ছনছায় বইসা তামাক টানছে হাফিজদ্দি। তিনজন মানুষ একলগে ফইজুর দিকে তাকাল। হাফিজদ্দি তামাক টানা বন্ধ কইরা বলল, কী?
কথার তালে নাকমুখ দিয়া বেদম ধুমা বাইর হইলো।
ফইজু বলল, ইট্টু তামুক খাইতে চাই।
ও।
জলচৌকিতে বসা পারু তাকাল ফইজুর দিকে। বহেন। হাফিজদ্দি, তারে একখান ফিরি দেও আর তামুক সাজাইয়া দেও।
পারুর কথায় হাফিজদ্দি ব্যস্ত হল। দিতাছি।
হাফিজদ্দি হুঁকা রাইখা রান্ধনঘর থেকে একখান ফিরি নিয়া ফইজুরে দিল। বহেন, বহেন। তারপর তামাক সাজাতে ব্যস্ত হল।
পারু বলল, আপনে ঘটকের লগে আইছেন, তামুক খাইতে ইচ্ছা করছে, এই মিহি আহেন নাই ক্যা? নাওয়ে বইয়া রইছেন ক্যা?
ফইজুর বড় ভাল লাগল পারুকে। বিনয়ের গলায় বলল, না, আপনেরা কেঐ কিছু মনে করেন কিনা।
কী মনে করুম?
না আমরা মা কামলা মানুষ! আপনেগো এত বড় বাড়ি! মাওলানা সাবে রাগী মানুষ!
না আপনেরা বাইরে থিকা যেমুন হোনেন হেয় তেমুন না।
তার মাজারো পোলা হুনছি বিরাট রাগী। এর লেইগা ডর করছে বাইত্তে উটতে।
আরে না। এইসব কিছু না। দেশগেরামের মাইনষে কত রকমের কথা কয়। আপনে বহেন। আরাম কইরা বহেন।
পারু রহিমার দিকে তাকাল। চা তিনকাপ বানা রহি। তারেও এককাপ দে। লগে মুড়ি দে।
শুইনা ফইজু একেবারে কাঁচুমাচু হইয়া গেল। না না এতকিছুর কাম নাই। খালি ইট্টু তামুক অইলেই অইবো।
পারু হাসিমুখে বলল, আগে চা মুড়ি খান তারবাদে তামুক খাইয়েন। হাফিজদ্দি, তামুক পরে সাজাও।
কলকি পরিষ্কার কইরা তামাক ভইরা চুলা থেকে আগুন তুইলা মাত্র কলকিতে দিবে হাফিজদ্দি, পারুর কথায় থামল। চুলার একপাশের বেড়ার লগে হুঁকা দাঁড় করাইয়া রাখল।
পারু বলল, তুমি আথালে যাও। ওই মিহি থাকো গিয়া।
আইচ্ছা।
হাফিজদ্দি পা চালায়া গোয়ালঘরের দিকে চলে গেল। তার লগে লগে বড়ঘরে গেল রহিমা। রিকাবিতে মুড়ি আর ছোট একমুচি খাজুড়া মিঠাই আইনা ফইজুর হাতে দিল। পারু বলল, খান। মুড়ি মিঠাই খাইয়া চা খান তারবাদে তামুক খাইয়েন।
ফইজুর এত ভাল লাগল পারুর ব্যাবহার। এই বাড়ির খবরাখবর তেমন সে জানে না। মুড়ি মিঠাই খাইতে খাইতে বলল, একখান কথা জিগাই মা?
পারু বলল, জিগান।
আপনে যে এই বাড়ির বউ হেইডা আমি বুজছি। মাওলানা সাবের কোন পোলার বউ?
কথাটার জবাব দিল রহিমা। ঘোপার ভিতর হাত ঢুকাইয়া একটা কইরা কইমাছ বাইর করছে সে, ছাই দিয়া ধইরা সেই মাছ কুটবো, বঁটিতে মাত্র আইস্টা (আঁশ) ছাড়াইতে শুরু করছে, ফইজুর কথা শুইনা বলল, আছিল বাড়ির বড়বউ। অহন অইবো মাজারো বউ।
বুজছি বুজছি। হুজুরের বড়পোলায় মইরা গেছে এর লেইগা অহন মাজারো পোলার লগে বিয়া হইবো।
