মান্নান মাওলানা আমতা গলায় বললেন, আতাহারের খোঁজখবর লইলে তো বিপদ।
কীয়ের বিপদ?
দেশগেরামে তো আমগো শতরুর আকাল নাই। কে কোনহান দা (কোন দিক দিয়ে) কী কইয়া দিবো, ভাঙ্গানি দিয়া দিব।
হ এইডা একখান কথা।
এইডার কী করবি?
আপনে চাইলে এইডা আমি ম্যানিজ করতে পারুম।
কেমতে?
কেমতে করুম ওইডা আপনে আমার উপরে ছাইড়া দেন। আপনে এক কাম করেন হুজুর, আইজ আমারে একখান ডেট দেন। ওই ডেটে আপনেরা কয়জন যাইবেন মাইয়া দেখতে আমি হেই ব্যবস্তা করি। মাইয়া দেকতে তো আতাহারও যাইবো, আপনেরা দেকবেন মাইয়া, তারা দেখবো পোলা, এক দেহায় বেবাক কারবার ফিনিশ। তারবাদে আমি আমার কাম করুম। মাইয়া আপনেগো পছন্দ অইলে বিয়া আল্লার রহমতে অইয়া যাইবো।
আমরা মাইয়া পছন্দ করনের পরও তো কথা থাকে বেডা।
কী কথা?
তারা পোলা পছন্দ করে কিনা?
হে হে, কী যে কন হুজুর? আতাহারের লাহান পোলা কেঐ পছন্দ না কইরা পারে। চেহারা সুরত তো মাশাল্লা আপনের পোলার। খালি সবাব চরিত্র…। তয় সবাব চরিত্র তো বাইরে থিকা দেহা যায় না। আপনে ডেট দেন, ওয়াজদ্দি সাবের মাইয়ারে দেহেন, তারবাদে দেহেন কেমতে এই বিয়া আমি হওয়াই।
ল্যাংড়া বসির আথকা উঠে দাঁড়াল। অহন আরেক কাপ চা দিতে কন হুজুর। এই ফাঁকে আমি ইট্ট কাম সাইরা আহি। বাংলাঘরের ওই মিহি কাম সারনের জাগা আছে না?
আছে। যা।
ফিরত আইসা আপনের বিয়ার কথা কমুনে। এই ফাঁকে আপনে কবে মাইয়া দেকতে যাইবেন ভাইবা রাখেন।
মান্নান মাওলানা বুঝলেন বসির সিগ্রেটই খাইতে যাইবো। ভাব দেখাইলো এমন, যেন পেশাব করতে যাইতাছে। শালার পো শালায় বিরাট ট্যাটন।
ল্যাংড়া বসির তার ল্যাংড়া পা টাইন্না মাত্র উঠানে নামছে, মান্নান মাওলানা জানালা দিয়া রানঘরের দিকে তাকায়া চিৎকার কইরা বললেন, রহি, দুই কাপ চা দিছ।
.
তামাক বিড়ির ভাল রকমের একটা নেশা ফইজুর আছে।
তামাক না পেলে বিড়ি দিয়া কাজ চালায়। আজ বিড়িও নাই। দুইদিন আগে কাজির পাগলা বাজার থেকে এক প্যাকেট কুম্ভিপাতার বিড়ি কিনা দিছিল বসির। কোন ফাঁকে শেষ হয়ে গেছে উদিসই পায় নাই ফইজু। বাড়িতে থাকলে তামাকটা খাইতে পারে, নৌকায় পারে না। কোষা নৌকায় তামাকের ব্যবস্থা রাখা বিরাট মুশকিল। হুঁকা কলকি তামাকের ডিবা, টিকা আর নাইলে নাইরকলের ছোবা এইসব রাখতে অসুবিধা হয়। আগা নাইলে পাছার চারটের নীচে রাখে কোনও কোনও গিরস্তে। তয় টিকা রাখে না। টিকা ধরানো বিরাট হাঙ্গামার কাম। চিমটা লাগে, কুপি আঙ্গান লাগে। তার থেকে নাইরকলের ছোবায় সুবিধা। একখান ম্যাচবাত্তি হইলেই হয়। ডিবা থিকা তামাক বাইর কইরা কলকিতে ঠাইসা দিয়া, তার উপরে নাইরকলের ছোবা গুলটি পাকাইয়া (গোল করে) ম্যাচের কাঠি দিয়া আঙ্গাইয়া দিলেই হয়। তারপর ফুঁ দিয়া দিয়া আগুন কইরা তামাক টানতে শুরু করলে, তামাকের টানে টানে নাইরকল ছোবার আগুন তামাক পোড়াইতে থাকে। টানে টানে নেশা।
ল্যাংড়া বসির গিয়া মান্নান মাওলানার ঘরে ঢোকার পর থেকেই তামাক বিড়ির নেশাটা বেদম পাইছে ফইজুর। ব্যবস্থা নাই দেইখা মুখ কালা কইরা কোষানাওয়ের পাছার চারটে বইসা রইছে। এখান থেকে বাড়ির রান্নঘরটা দেখা যায়। একজন বউ মতন মানুষ। জলচৌকিতে বইসা রান্দনবাড়ন দেখাই দিতাছে আর একজন ঝি মতন মানুষ রান্দনবাড়ন শুরু করছে। চুলায় আগুন জ্বলছে, চুলার পারে বইসা অল্প একটু মশলা বাটল ঝি-টা, পিঁয়াজ তরতারি কুটল। এখনও মাছ কুটতে বসে নাই। মাছের একটা ঘোপা এই এতদূর থেকেও দেখছে ফইজু। তয় সব কিছু ছাপায়া তার চোখে পড়ল লুঙ্গি কাছা মারা কামলা মতন একজন মানুষ খালি গায়ে রান্নঘরের ছেমায় বইসা তামাক টানতাছে। এই দেইখা নেশাটা ফইজুর মাথা চাড়া দিয়া উঠল। পেটের খিদাটা আইজ আর নাই ফইজুর। নেশার খিদাটা আছে। বিয়ানবেলা আইজ বসিরের বাড়ি থেকে ভরপেট খুদের বউয়া খাইয়া বাইর হইছে। পেট একদম ভরা। দুপুরের আগে আর খিদা লাগবো না। তয় তামাক বিড়ি কোনও না কোনওটা খাইতেই হইবো।
কী করে ফইজু?
নিজের বাড়িতে গত তিনদিন ধইরা যায় না ফইজু। বড়পোলা বদুর ঘরে পোলা হইছে। গাদিঘাটের ভোজকোমড়ের মতন একখান পেট লইয়া পোলার বউ আসুরা বিরাট একখান আজাবের মধ্যে ছিল। তিনদিন আগে দুপুরবেলা পোলা হইছে আসুরার। বিয়ান রাইত থেকে বেদনা উঠছিল। এইটা দেইখা সেদিন আর কেরায়া নাও লইয়া বাইর অয় নাই। বাড়িতেই ছিল। সীতারামপুরের কারিগর পাড়ার ধরণী বেগমরে গিয়া নিয়া আসছে। তয় পোলা হওনের কষ্ট খুব বেশি পায় নাই আসুরা। বিয়ানরাত থেকে দুপুরতরি বেদনা, তারপর খালাস। বাড়িতে বিরাট আনন্দ। মাজারো পোলা কুতুব মাওয়ার বাজারে গেছিল মাছের কারবারে, লগে আছিল ছোডপোলা কাসু। বদুরও পোলা হইলো দুইভাইও বাড়িতে আইসা হাজির। বিরাট আমদ আহ্লাদ শুরু হইয়া গেল বাড়িতে। খাতুন বিরাট খুশি। রানঘরের সামনে বইসা তামাক টানছিল ফইজু। তারে একখান ঠেলা দিয়া বলল, তুমি দাদা হইয়া গেছ। নানা হইছিলা বহুত আগে, আইজ হইলা দাদা। যাও তাড়াতাড়ি আয়জান। (আজান) দেও। বাইত্তে পোলা অইলে আয়জান দিতে হয়। মাইয়া অইলে দিতে অয় না। আল্লার নিয়ম।
আজান দিতে জানে ফইজু। রোজার দিনে রোজাটা সে করে। তারাবিও পড়ে। কোনও ওক্তের (ওয়াক্তের) নামাজই বাদ দেয় না। তয় এইমাত্র তামাক টানছিল, শরীরডা পাকসাফ নাই, পেশাব কইরা পানি নিছে কিনা মনে নাই। পায়খানা সারছে, হাত সাবান দিয়া ধুইছে। কিনা মনে নাই। এই অবস্থায় আজান দেওয়া যাইবো না। আগে নাইয়া ধুইয়া, অজু সাইরা তারপর আজান।
