আইচ্ছা দেও গিয়া।
বাংলাঘর থেকে বাইর হইয়া রানঘরে আসলো পারু। চা বানানোই আছে। খালি একটু গরম করতে হইবো। পারুরে দেইখা চায়ের কেটলি চুলায় দিল রহিমা। হাফিজদ্দি হাতের কামকাইজ সাইরা রান্নঘরে বইসাই নাস্তা করছিল। খাওয়া শেষ কইরা ঢক ঢক কইরা এক গেলাস পানি খাইল। তারপর তামাক সাজাইতে বসল। লুঙ্গি কাছা মারা, খালি গায়ের লোকটাকে মানুষ মনে হয় না। মনে হয় বাড়ির ভাঙনের দিকে গজায়া থাকা ঝোঁপজঙ্গল। কাছে থাকলেও চোখে পড়ে না। পারু যখন শ্বশুরের জন্য চা নিয়া বড়ঘরের দিকে মেলা দিছে, হাফিজদ্দি তামাক সাজাইয়া রানঘরের সামনে বইসা গুরুক গুরুক কইরা টান শুরু করছে। তার তামাকের গন্ধে লেবুপাতার গন্ধটা মাইর খাইয়া গেল।
বড়ঘরে ঢুইকাই থতমত খাইলো পারু। ল্যাংড়া বসির বইসা আছে মান্নান মাওলানার চকিতে। মান্নান মাওলানা বইসা আছেন চেয়ারে আর বসির চৌকির কোনায়। শ্বশুরের সামনে মাথায় ঘোমটা দিয়াই আসে পারু। তারপরও বেগানা পুরুষপোলা বসিররে দেইখা ঘোমটা আরও ঠিকঠাক করার চেষ্টা করল। কোনওরকমে চা দিল মান্নান মাওলানার হাতে। আব্বা, আপনের চা।
মান্নান মাওলানা চা নিয়া বললেন, বসিররে চা দেও এককাপ। তোমার আর আহনের কাম নাই। রহিরে দিয়া পাড়াও।
আইচ্ছা।
যতটা দ্রুত সম্ভব বাইর হইয়া গেল পারু। মনের মধ্যে ছোট্ট একখান খটকা ল্যাংড়া বসিররে দেইখাই লাগছে তার। ঘটকা আইছে ক্যান বাড়িতে? কার বিয়ার ঘটকালি করবো?
তারপর ঘটনাটা বুঝল সে। জাপানে থাকা দেওর, ছোট দেওর আজাহারের লেইগা। বিয়ার সমন্দ লইয়াঐ মনে হয় ঘটকায় এই বাইত্তে আইছে। এইটা ছাড়া তো তার আহনের কারণ নাই। আতাহারের বিয়া তো তার লগে ঠিকঐ হইয়া রইছে। তয় আর এই বাড়িতে বিয়ার উপযুক্ত পুরুষপোলা কেডা? এই বয়সে হৌরে তো আর বিয়া করবো না।
মান্নান মাওলানার বিয়ার কথা ভাইবা খিলখিল কইরা হাইসা উঠতে ইচ্ছা করল পারুর।
মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকায়া ল্যাংড়া বসির হাসিমুখে বলল, হুজুর এইডা আপনের বড়পোলার বউ?
জানালা দিয়া বাইরে তাকায়া ছিলেন মান্নান মাওলানা। বসিরের কথায় তার দিকে মুখ ফিরালেন। হ।
বিরাট সোন্দর মাইয়া।
সোন্দর মাইয়া না অইলে পোলারে বিয়া করাইতামনি বেড়া।
হ হেইডা ঠিকঐ। আপনের চোকে সোন্দর মাইয়া ছাড়া লাগে না।
আমার পোলাগো চোক্কেও লাগে না।
তয় আপনের বড়পোলার বউর যে এতদিন আগে বিয়া অইছে, একদোম বুজা যায় না। তিনহান পোলাপান আছে, একদোম বুজা যায় না।
কী বুজা যায়?
বুজা যায় অহনতরি বিয়া অয় নাই।
মান্নান মাওলানা চোখ পিতিপিতি (ছোট করে) কইরা বসিরের দিকে তাকালেন। পারুরে তুই আগে দেহচ নাই?
না।
আইচ্ছা। এবার আমার বাইত্তে আইছস তাও পারুরে দেহচ নাই?
দেহি নাই। তয় জানি বেবাকঐ।
মান্নান মাওলানা গম্ভীর হলেন। কী জানচ?
বেদ্দপি না নিলে কইতে পারি।
থাউক কওনের কাম নাই। আসল কথা ক।
বসির ইচ্ছা কইরাই বলল, আসল কথা জানি কোনডা?
আরে বেড়া দউবরার কথা। অর মাইয়ার লেইগা যে বিয়ার পোরোসতাব নিয়া তার কাছে যাইতে কইলাম, গেছিলি তুই?
এই কথাডা আমি আপনেরে ইট্টু পরে কইতে চাই হুজুর।
ক্যা?
আগে অন্যকথা সারতে চাই।
কোন কথা?
আপনের মাজারো পোলার বিয়ার কথা।
আইচ্ছা ক।
তার আগে কইতে চাই আপনের জাপাইন্না পোলার বিয়ার কথা।
মান্নান মাওলানা বিরক্ত হলেন। তুই বড় প্যাচাইলা পদের মানুষ বইচ্ছা। একলগে কত প্যাচাইল যে পিরচ?
বসির হাসল। দরজার কপাটের লগে খাড়া করাইয়া রাখা তার ছাতিটা একবার দেখল, দূরে কদমগাছটার লগে নাও বাইন্দা বইসা রইছে ফইজু, এতদূর থেকেও ফইজুর নিরস মুখটা একবার দেখল বসির। তারপর বলল, ঘটকালির কাম করি হুজুর। প্যাচাইল পারনঐ আমার কাম। প্যাচাইল পাইরা পইরা ত্যাড়া জিনিসরে ভাবদি (সোজা) করি।
আমার লগে ভাবদির কাম নাই। আসল কথা ক।
তয় একখান একখান কইরা কই।
আইচ্ছা ক।
মাথায় ঘোমটা দেওয়া রহিমা বিলাইয়ের মতন নিঃশব্দে এককাপ চা নিয়া ঢুকল এই ঘরে। যেমন নিঃশব্দে ঢুকল, তেমন নিঃশব্দে চায়ের কাপ বসিরের হাতে দিয়া বাইর হইয়া গেল। মান্নান মাওলানা তার চা আগেই শেষ করছেন। কাপটা টেবিলের কোনায় রাখা। বেড়ার লগে লাগানো পুরানা টেবিলের ওইপাশে কয়েকখান ধর্মীয় বই, রেহালে রাখা কোরআন শরীফ। চায়ে চুমুক দিয়া টেবিলটার দিকে একবার তাকাল বসির। আগে কই আপনের জাপাইন্না পোলার বিয়ার কথা।
মান্নান মাওলানা নিরস মুখে বললেন, অর বিয়ার কথা কইয়া লাব নাই।
ক্যা? জাপানে বিয়া কইরা হালাইছেনি?
হেইডা কইতে পারি না। তয় আমারে সাফ জানাইয়া দিছে অহন বিয়াশাদি করবো না, দেশেও আইবো না।
তয় কারবার সাইড়া হালাইছে।
কোন কারবার?
জাপানে বিয়া কইরা হালাইছে।
কেমতে বুজলি?
এইডা বুজা যায়। বিক্রমপুরের ম্যালা পোলাপান আছে জাপানে। তাগো খবরাখবর আমি রাখি। জাপাইন্না পোলার বিয়ার ঘটকালিও তো করি। অহন জাপান দেশে বিরাট ধরপাকড় চলতাছে। যাগো কাগজপত্র নাই, তাগো ধইরা ধইরা পয়লা জেলে নেয়। তিন-চাইর মাস জেল খাড়াইয়া পেলেনে উড়াইয়া দেয়। এই ডরে বহুত পোলাপান পলাইয়া থাকে। যেই মালিকের কারখানায় কাম করে হেই মালিকের কারখানার ভিতরেঐ গোডাউনের মতন ঘরদুয়ারে থাকে। টাউনের দিকে থাকেঐ না, থাকে গেরামের দিকে। গেরামের দিকে পুলিশ যায় কম।
