তারপর থেকে নিজের সংসার রান্দনবাড়ন কেমনে কেমনে বন্ধ হইয়া গেল পারুর। নিজের অজান্তেই মান্নান মাওলানার সংসারে ঢুইকা গেল তার সংসার। দুইদিন পর। আতাহারের লগে বিয়া হইলে তো এইটাই হইবো। দুইদিন বাদে যেইটা হইবো সেইটা দুইদিন আগেই হইলো।
এইভাবেই চলছে সংসার। তয় একখান অন্য কারবারও এর লগে লগে হইছে। রাত্রে আতাহার আর পারুর মিলামিশাটা একটুখানি কমছে। এইটা অবশ্য পারুই করছে। এই বর্ষাকাল শেষ হইলে, শীতের দিনের মাঝামাঝি বিয়া হইবো আতাহারের লগে। তারপর তো রোজ রাত্রেই একলগে থাকবো। তখন তো আর কোনও অসুবিধা নাই। এইজন্য এখন একটু সবুর করা ভাল। তাও একদম যে মিলামিশা চলছে না তাও না। চলছে। তয় আগের মতন ঘনঘন না। একটু রইয়া সইয়া।
শাশুড়ি মারা যাওয়াতে বিয়াটা পারুর দেরি হইয়া গেল। তিনি বাঁইচা থাকলে এতদিনে বিয়া হইয়া যাইতো। কারণ এই ধরনের বিয়াতে তেমন ধুমধাম হয় না। মাইনষে হাসাহাসি করে। পারু আর আতাহারের ঘটনা দেশগ্রামের অনেকেই জানে। এইসব নিয়া কথাবার্তা আড়ালে আবডালে বলে, সামনাসামনি বলে না মান্নান মাওলানা আর আতাহারের ডরে। তারপরও ধুমধাম কইরা বিয়া হইলে হাসাহাসি মাইনষে করবো। বিয়া হইবো একেবারেই ঘরোয়া ভাবে। মান্নান মাওলানার নিজের বাড়ির মানুষজন, মাইয়া মাইয়ার জামাইরা আর নাতি নাতকুড়, ওইদিকে পারুর মা বাপ ভাই বইন, বইনজামাই আর পোলাপান। পুরানা আত্মীয়। তাও দুইদিককার। প্রথমে একটু দূরের আত্মীয় তারপর হইল বিবাহসূত্রের আত্মীয়। একদিন আগে পারুদের বাড়ির সবাই এই বাড়িতে আসবো, একদিন থাইকা মাইয়া বিয়া দিয়া চইলা যাইবো। শুরু হইবো পারুর নতুন জীবন। বেবাক ছেঁড়াভেড়া হইয়া গেল হরির মরণে।
তয় এইসব নিয়া দুঃখ নাই পারুর। ব্যবস্থা তো যা করার তিনি কইরা দিয়া গেছেন। তিনি বাইচা থাকলে এই বর্ষাকালেই বিয়া হইয়া যাইতো। কেরায়া নৌকা লইয়া বেসনাল। গ্রাম থেকে পারুর মা বাপ ভাইবইন, বইনজামাই আর পোলাপানরা আসতো বিয়ার দিন আর তার আগে পরের দুইদিন, তিনটা দিন কাটত বেদম আনন্দে। তারপর যে যার মতন ফিরা যাইত, বাড়িতে পুরানা অবস্থাই নতুন কইরা ফিরত আসত। আগে পারু আতাহার পলাইয়া পলাইয়া যা করত ওইটা তখন জায়েজ হইয়া যাইবো।
শীতের দিনের বিয়ায় অবশ্য মজা বেশি। মানুষের চলাফিরায় সুবিধা। কাপড়চোপড় পরায় সুবিধা। বর্ষাকালে বিষ্টি বাদলায় বিরাট অসুবিধা। তারপরও বিয়া তো আল্লাহপাকের হাতে। তিনি যখন আদেশ করবেন তখনই হইবো। হউক শীতের দিনে। কয়েকটা মাস দেরি করতে পারুর কোনও অসুবিধা নাই। আতাহার যখনই রাতেরবেলা তার কাছে যায়, এইসব নিয়া কথা বলে সে। এখন কোনও কোনওদিন দিনেরবেলাও বলে। আতাহার ক্যান য্যান এইসব নিয়া কথা বলতে চায় না।
পারু বললে সে খালি মিচকা (মুচকি) হাসি দেয়। দুয়েকদিন পারু তারে ধরছে। আমি ওই হগল কথা কইলেই তুমি এমুন মিচকা হাসি দেও ক্যা? ঘটনা কী?
আতাহার তারপরও হাসে। আমার শরম করে। এইডা শরমের হাসি।
কীয়ের শরম?
বড়ভাইর বউর লগে বিয়া হইতাছে।
ইস ঢং। বড়ভাইর বউর লগে পিরিত করনের সমায় শরম করে নাই, বড়ভাইর বউর পেডে তিনহান পোলাপান পয়দা করতে শরম করে নাই, অহন বিয়ার কথা হুইন্না তার শরম করে। দিমু খেচা পেডের মইদ্যে।
আইজ সকালে বাংলাঘরে আতাহারের জন্য নাস্তা নিয়া যাইতে যাইতে এই কথাগুলি। মনে হইল পারুর। বেলা অনেকখানি হইছে। বাড়ির বেবাকতেরই খাওয়া হইছে। খালি আতাহারের হয় নাই। কারণ সে ঘুম থেকে উঠছে কিছুক্ষণ আগে। উইঠা বেবাক কাম কাইজ সাইরা আবার বাংলাঘরে ঢুকছে। টেকনের আগে রানঘরের দিকে তাকায়া বলছে, রহি, নাশতা দে।
আসলে তো রহিমারে বলল না, বলল পারুরে। একজনের উছিলায় আরেকজনরে বলা।
ট্রে-তে বেবাক কিছু সাজাইয়া নিয়া আসছে পারু। আতাহার হাতলআলা চেয়ারে বইসা আছে। সামনে টেবিল। ট্রে-টা টেবিলে নামাইয়া রাখলো পারু। ঠাট্টার গলায় বলল, নেন, বান্দি আপনের নাস্তা পানি লইয়া হাজির। নিজের হাত দিয়া খাইতে পারবেন, নাকি খাওয়াইয়া দেওন লাগবো?
আতাহার তার সেই মিচকা হাসিটা হাসল। খাওয়াইয়া দিতে চাইলে দিতে পারো। দিবা? হাঁ করুম?
আতাহারের পিঠে একটা ধাক্কা দিল পারু। ইস। আহ্লাদ!
কীয়ের আহ্লাদ? বউরা জামাইরে খাওয়াইয়া দেয় না?
দেয়।
তয়?
অহনতরি তো বউ অই নাই।
সরা পড়াইন্না (ধর্মমতে পড়ানো বিবাহ) বউ অও নাই। আর সবই অইছো।
একটা রুটি ছিড়া লগে কিছুটা লাবড়া নিয়া মুখে দিল আতাহার। পারু দাঁড়ায়া রইল পাশে। আতাহারের খাওয়া দেখতে লাগল।
আজকের নাস্তা আটার রুটি আর বর্ষাকালের নানানপদের তরকারি লাবড়া। লাবড়া জিনিসটা খুবই ভাল রান্ধে পারু। খাইতে খুবই স্বাদের হয়। চায়ের বড় কাপে ঘন দুধের চা আছে। সেই চা পিরিচ দিয়া ঢাইকা রাখছে পারু। ঠান্ডা হইলে আবার গরম করন লাগবো। অনেক সময় চায়ে রুটি ভিজাইয়াও খায় আতাহার।
তয় বেশিক্ষণ আজ আতাহারের পাশে থাকতে পারল না পারু। শ্বশুর চা খান নাস্তা পানি খাওয়ার অনেকক্ষণ পর। তার নাস্তা খাওয়া হয়ে গেছে অনেক আগে। এখন চা খাইবেন। ছটফটা গলায় সে বলল, তুমি নাস্তা করো। আমি যাই।
ক্যা?
আব্বার চা দেওন লাগবে।
