হ এইডা আমি চিন্তা করছি। তয় ওই হগল লইয়া কোনওই ডর নাই আমার। যহন উদিস পামু আমার পেট অইছে তার আগেঐ আলফুরে লইয়া খাইগো বাড়ির ইমাম হুজুরের কাছে গিয়া কমু আমগো বিয়া পড়াইয়া দেন। তহন তারে আর কমু না আমার পেট অইছে। তয় হুজুরে আমারে খারাপ মাইয়া মনে করতে পারে।
বড় আমগাছের উপর দিয়া আশমানের দিকে তাকাইল কুট্টি। আমার হতিনের ছোড় পোলাডার কথা আমার বহুত মনে অয় নূরজাহান। কালাকোলা ছোট্ট একহান পোলা। হারাদিন খালি গায়ে থাকতো। মাজায় কাইতানের লগে পিতলের এই এতডু একখান ঝুনঝুনি বান্ধা। বাড়ির এই মিহি ওই মিহি দৌড়াইতো আর মাজার ছোট্ট ঝুনঝুনি ঝুন ঝুন কইরা বাজতো। হেই আওজখান অহনও আমার কানে লাইগা রইছে। সমায় সমায় আওজখান আমি পাই। পোলাডা আমার বহুত বাধুক আছিলো। খুব আইতো আমার কাছে। আমার কুলে উটতো। হতিন মাগি একদিন মনে করলো পোলাডারে আমার বাধুক বানাইয়া অরে আমার আপনা পোলার লাহান বানানের মতলবে আছি আমি। আমার কুল থিকা পোলাডারে ছিনাইয়া লইয়া গেলো। আমার কাছে আর আইতেই দিতো না। মা’র কুল থিকা পোলাডা এমুন কইরা আমার মিহি চাইয়া থাকতো, নূরজাহান রে, বইন কী কমু তরে, পোলাড়ার লেইগা আমার কইলজাড়া পুইড়া যাইতো। আলফুর লগে সহবাসের সমায় আমার খালি মনে অয় আমার যুদি ওইরকম একখান পোলা অয় তয় ওর মাজায়ও কাইতানের লগে ছোট্ট একখান ঝুনঝুনি বাইন্দা দিমু আমি। আলফুর মতন দেখতে অইবো আমার পোলা। আলফু নানান কামে এই মিহি ওই মিহি থাকবো। পুরুষপোলারা তো হারাদিন আর বাইত্তে বইয়া থাকে না। আলফুও হারাদিন আমার চোক্কের সামনে থাকবো না, থাকবো পোলাড়া। সংসারের কাম কাইজের ফাঁকে, রান্দনবাড়ন নাওন ধোওন খাওন দাওনের ফাঁকে ফাঁকে আমি খালি আমার পোলার মুখহান দেহুম। ছোট্ট একহান আলফুরে দেহুম। রাইত্রে আমার পোলারে বুকে লইয়া ঘুমামু।
কুট্টির কথা শুনতে শুনতে আবার মজনুর কথা মনে হইল নূরজাহানের। কুট্টির যেমুন আলফুর লগে হইছে, মজনুর লগে যুদি অমুন হয় নূরজাহানের তয় কি সেও কুট্টির মতন এমুন পাগল হইবো। কুট্টি যা যা চায় সেও কি তা তা চাইবো?
কুট্টি খেয়াল করল না, শরীরের অনেক ভিতর থেকে পাগলকরা একখান শরম আইসা নূরজাহানের মুখ লাল কইরা দিল। দেলোয়ারাদের সীমানার মটকুরা গাছটার তলায় দাঁড়ায়া দবির ঠিক তখনই ডাক দিল নূরজাহানরে। নূরজাহান, ও নূরজাহান। তাড়াতাড়ি আয় মা। বিয়াল অইয়া গেছে। বাইত যাবি না!
কুট্টির দিকে তাকায়া ছটফট গলায় নূরজাহান বলল, উই যে বাবায় ডাক পাড়তাছে। আমি গেলাম।
দৌড়াইয়া বড় আমগাছটার তলায় গেল নূরজাহান। গাছের লগে প্যাঁচ দেওয়া শিকল খুইলা মেন্দাবাড়ির দিকে কোষানাও চালাইয়া দিল।
৩.৪ একটুখানি বৃষ্টি
সকালবেলা একটুখানি বৃষ্টি হইছে।
বৃষ্টির পর থেকে সারাবাড়িতে লেবুপাতার গন্ধ। রান্নঘরের পিছন দিকটায়, ভাঙনের দিকে একটা বাতাবি লেবুর ঝোঁপ। সেই ঝোঁপ থেকে আসছে গন্ধটা। বৃষ্টির পর আথকা
লেবুপাতার গন্ধ ছুটছে ক্যান কে জানে!
এই গন্ধে মনের ভিতর আনন্দটা অনেকখানি বাইড়া গেছে পারুর। ট্রে-তে কইরা আতাহারের জন্য নাস্তা নিয়া যাবে বাংলাঘরে। শাশুড়ি মারা যাওয়ার কিছুদিন পর থেকে নিজ থেকেই সংসারটা নিজের হাতে নিয়া নিছে পারু। সে এই বাড়ির বড়বউ ছিল। এখন মাজারো বউও হবে। শাশুড়ি বেবাক কিছু ঠিক কইরা দিয়া গেছেন। তিনি বাঁইচা থাকতে আলাদা সংসার আছিল পারুর। মোতাহার বাইচা থাকা অবস্থায় সংসার ভাগ কইরা দিছিলেন শ্বশুরে। সে মারা যাওয়ার পরও ওই অবস্থাই ছিল। শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর কিছুদিন সেই অবস্থা চলছে, তারপর একদিন নিজ থেকেই পুরা সংসার নিজের হাতে নিয়া নিল পারু। কারণ সংসারটা এলোমেলো হইয়া গেছিল। রহিমা এই বাড়ির পুরানা ঝি। সংসার ভালই সামলায়। তাও শাশুড়ি বাঁইচা থাকতে তিনি দেখাইয়া দিতেন সব। কোনদিন কী রান্না হইবো বইলা দিতেন। আতাহার কী তরকারি পছন্দ করে, মান্নান মাওলানা কোন মাছ পছন্দ করেন এইসব বইলা দিতেন। তার কথা মতন রান্দনবাড়ন করতো রহিমা। তিনি মারা যাওয়ার পর বেবাক কিছু উলটাপালটা হইয়া গেছে। রহিমা বুঝতে পারে না। কোনদিন কী নাস্তা হইবো বাড়িতে, দুপুরে মাছ তরকারি কী হইবো, রাত্রে কী হইবো? রোজই এইসব নিয়া আতাহারের রাগারাগি, মান্নান মাওলানার রাগারাগি। একদিন দুপুরে খাইতে বইসা তরকারি পছন্দ হয় নাই দেইখা ভাতের থাল ফিক্কা (ছুঁড়ে) ফালাই দিছে আতাহার। আরেক দিন রাত্রে পারলে রহিমারে থাবড় মারেন মান্নান মাওলানা। তরকারিতে নুনকাটা হইছে।
এই অবস্থা দেইখা পারু নিজ থেকে বিয়ানবেলা একদিন রান্নঘরে আইসা ঢুকছে। রহিমারে লইয়া পরোটা বানাইছে, সুজির হালুয়া বানাইছে সেন্টুর দোকানের খাঁটি ঘি দিয়া। লগে ঘন দুধের চা। খাইয়া আতাহার বেদম খুশি, মান্নান মাওলানা বেদম খুশি। পারুর পোলাপান তিনটাও খুশি। বিয়ানবেলা ভাল নাস্তা খাওয়ার পর আনন্দে মন ভইরা গেল। বাড়ির লোকজনের। মান্নান মাওলানা বাজারে গিয়া বড় একখান শোলমাছ কিনা আনলেন। সেই মাছ ছোট ছোট টুকরা কইরা, বেশি বেশি তেল মশলা আর পিয়াজ দিয়া ভুনা করছে। লগে ঘন মুশরি ডাইল, উস্তাভাজি, লেবু ঝোঁপ থেকে একখান লেবু ছিড়া আইনা, পিরিচে কইরা একটুকরা লেবু, দুই-তিনখান কাঁচা মরিচ আর ছোট গোল পিঁয়াজ চোকলা ছাড়াইয়া এত সুন্দর কইরা আতাহার আর মান্নান মাওলানার সামনে দিছে পারু, একদিকে সুন্দর। কইরা সাজাইয়া দেওয়ার খাবার অন্যদিকে এত ভাল রান্ধন, দুপুরেও বেবাকতে খুশি।
