আঁচলে চোখ পুছতে পুছতে কুট্টি বলল, তরে যে আমি কইলাম আমার মন মানে না।
মনরে বুজাও। দশটা দিন যে তুমি তারে ছাইড়া থাকতে পারতাছো না, যুদি কোনওদিন এমুন অয়, এক দুইমাস তারে ছাইড়া তোমার থাকন লাগবো তহন কী করবা?
হেইডা আমি জানি না বইন। আমার মনে অয় আমি তহন আর বাঁচুম না। আমি তহন মইরা যামু।
এবার হঠাৎ কইরা নূরজাহান তার বয়সের থিকা অনেক বেশি বড় হইয়া গেল। বয়স্ক মানুষের কায়দায় বলল, তোমারে দুই-চাইরহান অন্যপদের কথা জিগাই?
জিগা।
তুমি যে আলফুর লগে এই কারবারডা করলা, চিন্তা কইরা করছো?
কী চিন্তা করুম?
তার লগে তোমার বিয়া হইবো কি না? তার লগে তুমি সংসার করতে পারবা কি না?
না ভাবি নাই।
ক্যা?
এত কিছু ভাইবা ঘটনা ঘটে নাই। আথকা ঘইটা গেছে। ওই যে তার জ্বরের রাইতে তার কাছে গেলাম তারবাদে আস্তে আস্তে মায়া লাগলো। তারও মায়া লাগলো আমার লেইগা। আমি তার মনডা দেখলাম, সে দেখলো আমার মন। নিজের ভাত থিকা মাকুন্দা কাশেমরে চাউলতাতলায় বহাইয়া ভাত খাওয়াইলো সে, এইডা দেইক্কা আমি বুজছিলাম তার মনডা বহুত নুলাম। এমতে এমতে বেবাক কিছু অইয়া গেল।
বুজলাম। তয় শেষ তরি এই ঘটনা কই গিয়া শেষ অইবো হেইডা চিন্তা করো নাই?
কইরা কী করুম ক? আমি তো তার বউ পোলাপানের কথা জানি। জান্নাইত্তো গেছি তার কাছে।
সে তোমারে কিছু কয় নাই?
কী কইবো?
চরের বউ পোলাপান ছাইড়া সে তোমারে বিয়া করবো কি না? তোমারে লইয়া সংসার করবো কি না!
কইছে।
নূরজাহান অবাক। কইছে?
হ।
কী কইছে?
কইছে দুনিয়াদারির কেউ জানবো না, জানুম খালি হেয় আর আমি। আমরা গোপনে স্বামী ইসতিরির লাহান এই বাইত্তে জীবন কাড়ামু।
নূরজাহান থতমত খাইল। কেমতে?
অহন যেমতে কাড়াইতাছি।
এইডা তো কোনও না কোনওদিন মাইনষে জাইন্না হালাইবো।
জানলে জানবো।
তাইলে তো মাজারো বুজানে তোমগো দুইজনরেঐ বাইত থিকা খেদাইয়া দিবো।
তহন দুইজনে অন্য বাইত্তে গিয়া কাম লমু।
হেই বাইত্তে তো আর এই বাড়ির লাহান এক লগে তোমরা থাকতে পারবা না।
পারুম।
কেমতে?
দূরের গেরামে গিয়া কাম লইয়া পরিচয় দিমু আমরা স্বামী ইসতিরি।
এইডা যহন চরে আলফুর বউ পোলাপানে জানবো?
হেতোদিনে পোলাপান বড় অইয়া যাইবো আলফুর। বউ বুড়া অইয়া যাইবো। আলফু নিজেই তহন তাগো জানাইয়া দিবো যে আমারে বিয়া করছে। মলবি ডাইকা গোপনে আমরা বিয়া কইরা লমু।
তার আগে তো অন্য কারবারও ঘটতে পারে?
কী কারবার?
বড়বুজানের যা দশা, যহন তহন মইরা যাইবো হেয়। হেয় মইরা গেলে তোমারে আর আলফুরে এই বাইত্তে রাখবো মাজরো বুজানে? এইরকম জুয়ান মর্দ পুরুষপোলা আর মাইয়া ছেইলারে, যারা বউ জামাই না, তাগো কেঐ বাইত্তে রাখে?
না রাখে না। তয় এই বাড়ি তো মাজরো বুজানে আর হালাইয়া দিবো না। কেঐরে না কেঐরে এই বাইত্তে রাখবোই। আলফু আর আমি তার হাত পাও ধইরা কমু আমগোই থাকতে দেন বাইত্তে। আমরা আপনের এতদিনের পুরানা মানুষ। আমরা তো কোনও দোষ করি নাই। আর নাইলে বুজানরে কমু, আলফুর লগে আমারে বিয়া দিয়া দেন। মোসলমান পুরুষপোলারা চাইরডা বিয়া করতে পারে, আলফু নাইলে দুইডা করলো। এক বউ চরে, এক বউ এই বাইত্তে।
নূরজাহান হাসল। তুমি যে কী কও না কও কুট্টিবুজি। কথার কোনও আগামাথা নাই। তুমি মনেঅয় একদোম পাগল অইয়া গেছ!
কুট্টি নাক টাইনা বলল, হ রে বইন আমি আসলেই পাগল অইয়া গেছি। আমার মাথা একদোম বিগড়াইয়া গেছে। তয় একখান কথা তরে আমি কই, এইডা অইলো আসল কথা, দুনিয়ার কেঐ কোনওভাবেঐ আলফুর কাছ থিকা আমারে সরাইয়া রাখতে পারবো না। তার লেইগা দুনিয়ার বেবাক মানুষের হাতে পায়ে ধরতে রাজি আছি আমি, যা করতে অয়। করতে রাজি আছি। তাও তারে ছাইড়া আমি থাকুম না। খালি মওত ছাড়া তার কাছ থিকা কেঐ আমারে ফিরাইতে পারবো না।
দোতলা ঘরের মাঝখানকার কামরা থেকে বড়বুজানের গলা ভাইসা আসলো। কুট্টি ও কুট্টি। কই গেলি রে?
কুট্টি গলা উঁচা কইরা বলল, আমি রান্নঘরে।
বিয়াল অইয়া গেছে অহন রানঘরে কী করছ?
ডাহা মিছাকথা বলল কুট্টি। রাইতের খাওনদাওন ঠিক করি।
আইচ্ছা কর বইন, কর।
কুট্টি তারপর নূরজাহানের দিকে তাকাল, উইঠা দাঁড়াইল। গলা নিচা কইরা বলল, ল, আমরুজতলার মিহি যাই। এহেনে বইয়া কথা কইলে বুড়ি হোনবো। এমুন বুড়ার বুড়া। অইছে তাও কান ভাল আছে বুড়ির। গাছের পাতা পড়লে হেই আজও পায়।
ওরা দুইজন আমরুজতলায় আসল। এখান থেকে বড় আমগাছটার ওদিকে নূরজাহানদের কোষানাওটা দেখা যায়। ওই যে দুপুরের পর একটুখানি রোদ উঠছিল, কোন ফাঁকে সেই রোদ ঢাইকা দিছে বুলবুলি পাখির গায়ের রঙের মতন মেঘ। চারদিকে এখন ছায়া ছায়া ভাব। আমরুজতলায় ছায়াখান য্যান একটুখানি বেশি। এই ছায়ায় দাঁড়াইয়া নূরজাহান বলল, অহন আসল কথাডা তোমারে জিগাই কুট্টিবুজি। এই যে এইভাবে মিলামিশা করতাছো তোমরা, তোমার পেডে যুদি পোলাপান আইয়া পড়ে তহন কী করবা?
কুট্টি কিছুই ভাবল না। সরল গলায় বলল, কী আবার করুম, পোলাপান অয়ামু। তার আগে আলফুর কাছে বিয়া বইয়া যামু।
যুদি তোমার চিন্তাভাবনার মতন বেক কিছু না অয়, যুদি ভেজাল ভেজাল লাইগ্যা যায় তয় তো কিলিংকার অইবো। দেশগেরামের মাইনষে কইবো কী তোমারে? মান ইজ্জত তো থাকবো না। মাওলানা সাবে বিচার সালিশ বহাইয়া বিরাট গন্ডগোল করবো।
