অনেকক্ষণ পর কথা বলল নূরজাহান। হেয় কী কইলো?
কইলো সাত-আষ্ট দিন, বড়জোর দশদিন, দশদিনের মইদ্যে আমি আমু। কেঐ আমারে বাইন্দাও রাকতে পারবো না।
তয় তুমি এত কান্দাকাটি আরম্ব করছো ক্যা? আইজ তো মাত্র পাঁচদিন। আর পাঁচদিন বাদে তো হেয় আইয়াঐ পড়বো।
হেইডা তো জানিঐ। তয় আমার যে মন মানে না বইন। আমি যে তারে ছাইড়া নাইতে খাইতে পারি না, ঘুমাইতে পারি না। আমার যে দিনরাইত বেককিছু আন্ধার লাগে। আমার যে খালি চাউলতাতলায় গিয়া বইয়া থাকতে ইচ্ছা করে। রাইত্রে যে দোতলা ঘরের মাঝখানকার দুয়ার খুইলা তার কাছে চইলা যাইতে ইচ্ছা করে।
বিলাইটা বাচ্চাকাচ্চা নিয়া কখন যে দোতালা ঘরে চইলা গেছে কুট্টি আর নূরজাহান কেউ সেইটা দেখে নাই। কাঠঠোকরা পাখিটা ঠোকা বন্ধ করছে, ছাড়াবাড়ির মতন ঝিমমারা শব্দটা দুইজন মানুষের কথাবার্তায় ভাইঙা খানখান হইয়া গেছে।
কুট্টির কথায় নূরজাহানের আর কিছু বুঝতে বাকি নাই। পুরা ঘটনা বোঝার ফাঁকে তার খালি মনে হয় মাত্র সাত-আষ্ট মাসে এতকিছু কেমন কইরা ঘটলো। কাইল আর আইজ মিলা চাইরখান বাড়িতে সে গেছে। হালদারবাড়ি হাজামবাড়ি গাওয়ালবাড়ি আর মিয়াবাড়ি। সব বাড়ির মানুষই তো কিছু না কিছু বদলাইছে। মজনু সিগ্রেট ধরছে, পুরাপুরি পুরুষপোলা অইয়া গেছে। হাজামবাড়ির তছি পাগলনি ধরছে নতুন পাগলামি, গাওয়াল বাড়ির বেবাকতে গেছে মুশলি অইয়া আর মিয়াবাড়ির কুট্টি-আলফুর জীবনে ঘটছে পেরেম। পিরিতির কায়কারবার। আল্লার দুনিয়াতে এত তাড়াতাড়ি এত ঘটনা ঘটে!
নূরজাহান হঠাৎ কইরা কথা বদলাইল। দোফরে নাও থোও নাই কুট্টিবুজি, ভাতপানি খাও নাই?
না কিছু করি নাই। রানছি বাড়ছি ঠিকঐ। বড়বুজানরে খাওয়াইয়া ঘুম পাডাইছি। করছি সবই। খালি নিজের কামডি করি নাই। তরে কইলাম না, আমার কিছু ভাল্লাগে না। নাইতে খাইতে ঘুমাইতে আমার খালি তার কথা মনে হয়। আমার খালি তার লেইগা কান্দন আহে।
হেয় তো এই বাইত্তে ম্যালাদিন ধইরা। তয় এতদিনে কিছু হয় নাই, আথকা তার লগে এমুন খাতির তোমার হইলো কেমতে?
নূরজাহানের চোখের দিকে তাকাল কুট্টি। ধীরে ধীরে বেশ গুছাইয়া গাছাইয়া পুরা ঘটনা বলল। সেই যে জ্বরের রাইতে আলফুর কাছে সে গেল, তারপর দিনে দিনে কী থেকে কী। হয়ে গেল, শরীর মন সব দিয়া দিল আলফুরে, কিচ্ছু বাদ দিল না। সব বলল। ওই যে এক দুপুরে নাইয়া ধুইয়া আসনের পরও তারে পাথালি কুলে কইরা চাউলতাতলার নাড়ার বিছানায় নিয়া গেছিল আলফু, সেইসবও বলল। শুনতে শুনতে নূরজাহান নিজের শরীরে কীরকম একখান কাটা দেওয়া ভাব টের পাইল। মনটা কেমন যেন হয়ে গেল তার। একজন মানুষের কথা মনে পড়ল। সেই মানুষটার নাম মজনু। মজনুর কথা ভাবতে ভাবতে আনমনা হইয়া গেল সে।
ব্যাপারটা খেয়াল করল না কুট্টি। সে আছে তার নিজেরে নিয়া। বলল, আমার বিয়া হইছিলো। স্বামী সহবাস আমি করছি। তয় হেইডারে আমার কোনও ঘটনা মনে অয় নাই। স্বামী আমার লগে সহবাস করতে আইলে আমি রাগ অইতাম, বিরক্ত অইতাম। ভাল্লাগতো না আমার। আর স্বামীও বুড়া বেডা, আগের বউ আছে, পোলাপান আছে, হেয় বেশি আইতোও না আমার কাছে। আর তহন এইসব আমি তেমুন বুঝিও না। আমার তহন অন্য কোনও খিদা নাই। আমার তহন খালি পেডের খিদা। তিনওক্ত খাওন পাইলে আর কিছু লাগে না আমার। আলফুর লগে থাকনের পর আমি বুজলাম জিনিসটা কী? শইলের আনন্দ কী, মনের আনন্দ কী? দুইজন মানুষ দুইজন মানুষের লেইগা শরীল মন দুইদিক দিয়া পাগল না অইলে সহবাস সহবাস না। আমি সবকিছু মিলা তার লেইগা পাগল অইয়া গেছি। সে পাগল অইয়া গেছে আমার লেইগা। এর লেইগাঐ চরের বাড়িঘরে আর যায় নাই, বউ পোলাপানের কাছে যায় নাই। টেকাপয়সা পাডাইয়া নিজের দায়িত্ব পালন করছে। সে আছিলো আমারে লইয়া। নূরজাহানরে, আমার জীবনডা এমুন অইলো ক্যা রে বইন। পয়লা জীবনে পেডের কষ্ট, খিদার কষ্ট। বাপের বাইওে, জামাই বাইত্তে দুই বাইত্তেঐ ভাতের কষ্ট করছি। আল্লায় আমারে হেই জীবন থিকা মিয়াবাড়ির ঝিয়ের জীবন দিল, পেডের। খিদা আমার মিটলো। তারবাদে আবার কোন চক্করে হালাইলো আমারে। মনের মইদ্যে একজন মানুষের লেইগা আরেকপদের খিদা বানাইয়া দিল। শইলের মইদ্যে আরেকপদের খিদা বানাইয়া দিলো। হেই খিদার কষ্টে দিনরাইত চোক্কের পানিতে ভাসি আমি। আমার জীবনডা এমুন অইলো ক্যা?
কুট্টি আবার কাঁদতে লাগল।
নূরজাহান কী বলবে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। কেমন কইরা সান্ত্বনা দিব কুট্টিরে, কেমন কইরা বুঝ দিব, বুঝতে পারে না। কুট্টির মুখে সব শুইনা সে গেছে হতবাক হইয়া। এইটা কেমুন কারবার হইছে। আলফু বিয়াতো বেডা, বউ পোলাপান আছে। কুট্টিরও একবার বিয়া হইছিল…
তারপরও কুট্টিরে সান্ত্বনা দিতে চাইল নূরজাহান। তোমার কথাবার্তা আমি বেবাকই বুজছি কুট্টিবুজি। আমিও তো ডাঙ্গর অইছি। এই হগল বুজি। তয় তুমি অস্থির অইছো বেশি। দশদিনের কথা কইয়া হেয় গেছে। আইজ পাঁচদিন আর পাঁচদিন বাদে সে আইয়া পড়বো। এই কয়ডা দিন তুমি সইজ্য করতে পারছে না। মাইয়াছেইলারা এত অস্থির অইলে কাম অয়? তুমি ইট্টু ধৈর্য ধরতে পারতাছো না। পাঁচটা দিন চোক্ষের পলকে কাইট্টা যাইবো।
