ও। তয় ল, উড়ান মিহি ল।
লও।
কুট্টির লগে উঠানে আসল নূরজাহান।
কুট্টি বলল, ভাত খাইছস?
হ।
কই খাইলি?
গাওয়াল বাইত্তে। কুট্টিবুজি, গাওয়াল বাইত্তে গিয়া তো আমি অটাস (অবাক) অইয়া গেছি।
ক্যা, বেবাক মানুষ বদলাইয়া গেছে দেইক্কা?
হ।
হাজামবাড়ি গিয়া অটাস অচ নাই?
হ তছি পাগলনির কথা হুইন্না, তছির মা’রে তছির শিথানে বইয়া থাকতে দেইক্কা আইছি।
আর এই বাইত্তে আইয়া আমারে দেইক্কা আইলি?
হ তুমি চাউলতাতলায় বইয়া কানতাছিলা ক্যা? কী অইছে তোমার?
কুট্টি কথা বলল না, নিয়াস ছাড়ল।
নূরজাহান বলল, তোমার মনের কষ্ট আমি জানি কুট্টিবুজি। মা-বাপে তোমারে বাইত্তে যাইতে দেয় না। বইনগো লগে দেহা করতে পারো না। একখান বিয়া অইছিল হেই বিয়া টিকে নাই…।
রান্নঘরে ঢুইকা দুইখান ফিরি নিয়া আসল কুট্টি। একটা নূরজাহানরে দিয়া আরেকটায় নিজে বসল। বয়।
নূরজাহান বসল। বইসা কুট্টির মুখের দিকে তাকায়া অবাক হল। মুখোন আগের মতন নাই কুট্টির। শরীরও আগের মতন নাই। মুখোন একটু গোলগাল হইছে, ভরা ভরা হইছে। একটু য্যান ফলসাও হইছে। আগের মতন কাহিল শরীর নাই। বেশ ভরভরাট, সুন্দর শরীর হইছে। অনেকক্ষণ ধইরা কানছে দেইখা চোখ দুইখান ভিজা ভিজা আর লাল। তারপরও কুট্টিরে খুব সুন্দর লাগতাছে। মনের মতন বিয়াশাদি হইলে যুবতী মাইয়ারা আথকা শরীর চেহারায় যেমন সুন্দর হইয়া যায়, কুট্টির চেহারা শরীর সেইরকম! এইরকম বদলান কবে বদলাইল কুট্টি? কেমনে বদলাইল? শরীর চেহারায় এত সুখী ভাব যে মাইয়ার সে আবার পুরা বাড়ি খালি ফালাইয়া চাউলতাতলায় বইসা এমুন কইরা কান্দে ক্যা? ঘটনা কী?
কুট্টি বলল, তরে বহুতদিন বাদে দেখলাম। তর খবর আমি বেবাকঐ জানি। গাছিমামায় মামি তরে বাইত থিকা বাইর অইতে দেয় না। মাওলানা সাব আর আতাহারের ডরে তুইও বাইত থিকা বাইর অচ না। আমার বহুতদিন ইচ্ছা করছে তগো বাইত্তে যাই, তরে ইট্টু দেইক্কাহি। যাইতে পারি নাই।
নূরজাহান বলল, কেমতে যাইবা? এই বাড়ি হালাইয়া তুমি কোনওহানে যাইতে পারোনি?
হ হেইডা ঠিক। তারপরও ইচ্ছা করলে যাইতে পারতাম।
কেমতে?
তারে বাইত্তে রাইখা।
তারেডা কেডা?
তুই বোজচ নাই?
না।
আলফু। আলফুরে রাইখা। তারে রাইখা যাইতে পারতাম। কইয়া যাইতাম হেয় য্যান বড়বুজানের মিহি খ্যাল রাখে। বড়বুজানে যুদি আমারে ডাক পাড়ে তয় য্যান কয় আমি এইমিহি ওইমিহি কোনও বাইত্তে গেছি।
তয় যাও নাই ক্যা?
লাল, ফুলা ফুলা চোখ তুইলা নূরজাহানের দিকে তাকাল কুট্টি। আমার ইচ্ছা করতাছে বেবাক কথা তরে কই।
কী কথা?
যেই কথা অহনতরি কেঐরে কই নাই। কোনওদিন কেঐরে কইতেও পারুম না।
নূরজাহান চিন্তিত চোখে কুট্টির চোখের দিকে তাকাল। তোমার কী অইছে কুট্টিবুজি?
হেইডাঐত্তো তরে কইতে চাই।
তয় কও।
কইতে শরম করে, আবার শরম করেও না। তর কাছে আমার আবার শরম কী? তয় একখান চিন্তা আছে।
কী চিন্তা?
তুই যুদি কেঐরে কইয়া দেচ। আর কথাডা যুদি কোনওদিন এই বাড়ির মাইনষের কানে যায়! বড়বুজানের কানে গেলে তেমুন ডর নাই। তারে আমি বুজাইতে পারুম। মাজারো বুজানের কানে গেলে আর উপায় নাই। আমারে হেয় বাইত থিকা বাইর কইরা দিবো। আর এই বাইত থিকা বাইর কইরা দিলে আমার কোনওহানে যাওনের জাগা থাকবো না।
কুট্টির চোখের দিকে অপলক চোখে তাকায়া নূরজাহান বলল, কইতে চাইলে আমারে তুমি কইতে পারো কুট্টিবুজি। মইরা গেলেও আমার পেড থিকা হেই কথা বাইর অইব না। কেঐরে কোনওদিন কমু না আমি।
সত্য?
সত্য।
আমি তরে বিশ্বাস করলাম বইন। আর আমার বুকহান ফাইট্টা যাইতাছে। তার কথা কেঐরে না কওন তরি বুক পাতলা অইবো না আমার। বুকের ভারে বুক ফাইট্টা মইরা যামু আমি।
নূরজাহান এদিক ওদিক তাকাল। বড়বুজানে ঘুমাইতাছে হেইডা আমি জানি। আলফু দাদায় কো? তুমি যে আমার লগে কথা কইবা হেই কথা যুদি আলফুদাদায় আথকা আইয়া হুইন্না হালায়?
না হুনবো না। হেয় নাই।
কই গেছে? নাও দিহি বাড়ির ঘাডে বান্ধা দেকলাম। বাড়ির ঘাডে নাও রাইখা হেয় গেছে কই?
একপলক নূরজাহানের চোখের দিকে তাকাল কুট্টি, চোখ দুইখান ছলছল কইরা উঠল তার। বলল, তারে লইয়াইতো আমার বেবাক কথা। তার লেইগাইতে কান্দি আমি।
কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। ক্যা, কী অইছে তার? তার লেইগা তুমি কান্দো ক্যা?
তুই বোজছ নাই?
এইবার ঘটনা বুইঝা গেল নূরজাহান। মাথা নাড়াইয়া বলল, মনে অয় ইডু ইট্টু বুজতাছি। তাও আমারে তুমি বেককথা বুঝাইয়া কও। আমি কোনওদিন কেরে কিছু কমু না। আগে কও আলফুদাদায় কো? বাইত্তে নাই, না কোনওহানে গেছে?
হ গেছে? চরে গেছে। মাতবরের চরে। তাগো বাইত্তে। বউ পোলাপানের কাছে। বহুতদিন আগে যাইতে চাইছে। আমার লেইগা যায় নাই। আমি তারে যাইতে কোনওদিন না করি নাই। তার যাওনের কথা হুনলেই আমার মন খারাপ অইতো, আমি ইট্ট কানতাম। হেইডা দেইক্কা হেয় যাওন বন্দ কইরা দিতো। বাইত্তে টেকাপয়সা পাডাইতো অন্য চউরাগো লগে। ইবার আর হেয় না যাইয়া পারে নাই। তার বউয়ে খবর দিছে, এতদিন অইয়া গেছে। হেয় যায় না, হেয় যুদি ইবার না যায় তয় তার বউঐ পোলাপান লইয়া এই বাইত্তে আইয়া উটবো। এইডা হুইন্না হেয় আমি দুইজনেঐ ডরাইয়া গেছি। তার বউ যুদি পোলাপান। লইয়া এই বাইত্তে একবার আইতে পারে তয় বেক ঘটনা হেই মাগি বুইজ্জা যাইবো। বিরাট কিলিংকার (কেলেঙ্কারি) অইয়া যাইবো। মাজরো বুজানের কানে যাইবো বেক কথা। আমারে আর তারে দুইজনরেঐ বাইত থনে খেদাইয়া দিবো। আলফুর তো কোনও অসুবিদা নাই। হেয় বউ পোলাপান লইয়া চরে যাইবো গা আর নাইলে আমগো দেশের কোনও গেরামে মতলা রাবিরা যেইভাবে আছে ওইভাবে থাকবো। তয় আমার উপায় অইবো কী? আমি যামু কই? আমার তো কোনও যাওনের জাগা নাই। আর এর থিকাও বড়কথা অইলো তারে ছাইড়া আমি থাকুম কেমতে? আইজ পাঁচদিন হেয় বাইত্তে নাই, তাতেঐত্তো আমি এই বাইত্তে টিকতে পারতাছি না। আমার খাইতে ভাল্লাগে না, নাইতে ভাল্লাগে না। রাইত্রে চোক্কের পাতা এক করতে পারি না। ঘুম আহেঐ না। এর থিকা বড় বিচ্ছেদ অইয়া গেলে আমি বাঁচুম কেমতে! এই হগল ভাইবা আমি তারে কইলাম, তুমি যাও। তয় সাত-আষ্ট দিনের বেশি দেরি কইরো না। তয় কইলাম এই বাইত্তে আমি আর টিকতে পারুম না। আমি কইলাম কানতে কানতে মইরা যামু।
