নূরজাহানরে দেখলাম। হোয়নের লগে লগে ঘুমাইয়া গেছে!
ঘুমাইবো না! যেই দৌড়াদৌড়ি করে হারাদিন! মাইয়াডা যত ডাঙ্গর অইতাছে হেত বেবাইন্না (বেয়াড়া) অইতাছে। এই মাইয়ার কপালে দুক্কু আছে।
দবির একটু রাগল। রোজ রোজ এক প্যাচাইল পাইড়ো না তো! দুক্কু কপালে থাকলে কেঐ খনডাইতে পারবো না।
চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকাল হামিদা। মাইয়া লইয়া কোনও কথা কইলে এমুন ছ্যাত কইরা ওডো ক্যা?
উড়ুম না? একটা মাত্র মাইয়া আমার!
এক মাইয়া যার বারো ভেজাল তার। ডাকের (প্রচলিত) কথা।
থোও তোমার ডাকের কথা। ভেজাল অইলে অইবো। আমার মাইয়া আমি বুজুম।
তারপর কেউ কোনও কথা বলে না। হামিদা কাঁথা সেলাই করে, তালি দেয় আর দবির তামাক টানতে টানতে উদাস হয়ে তাকায় বাইরের দিকে।
দুয়ার বরাবর, বাড়ির পুবদিকে, রান্নাচালা আর ছাপড়া ঘরটার পিছনে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের মাথায় কখন উঠেছে কুমড়ার ফালির মতন চাঁদ। আসি আসি করা শীতের কুয়াশা শেষ বিকাল থেকেই নাড়ার ধুমার মতো জমেছিল চারদিকে। সন্ধ্যার অন্ধকারে অনেকক্ষণ দেখা যায় নাই সেই কুয়াশা। এখন চাঁদের মৃদু আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। শিউলি ফুলের পাপড়ির মতো কোমল জ্যোৎস্না আর মাকড়শার জালের মতো মোলায়েম কুয়াশার মিশেলে তৈরি হয়েছে অপার্থিব এক আলো। এই আলো ছুঁয়ে বইছে উত্তরের হাওয়া। গভীর দুঃখ বেদনায় দীর্ণ হওয়া মায়ের নিঃশব্দ কান্নার মতো প্রকৃতির গাল চুঁইয়ে পড়ছে শিশির।
হাওয়া মৃদু হলেও বাঁশের পাতা এবং ডগায় শন শন শব্দ হচ্ছিল। সেই শব্দ কেন যে শুনতে পায় না দবির! তামাক টানতে টানতে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ করেই তার মনে হল এই সুন্দর নিঝুম প্রকৃতিকে বিরক্ত করতাছে তার হুঁকার শব্দ। প্রকৃতির মাধুর্য নষ্ট করে দিচ্ছে। ভেঙে খান খান করতাছে মূল্যবান নৈশব্দ। লগে লগে হুঁকা থেকে মুখ সরাল দবির। এক হাতে হুঁকা ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল বাঁশঝাড়ের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনের ভিতরটা কেমন যেন হয়ে গেল তার, কানের ভিতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। বাঁশঝাড়ের মাথা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া উত্তরের হাওয়ায় দবির গাছি শুনতে পেল। ঝোড়া খাজুরগাছের মাথা বরাবর তার পেতে আসা হাঁড়িতে টুপ টুপ করে ঝরছে প্রকৃতির অন্তর থেকে টেনে তোলা রস।
এই রস কি খাজুরের নাকি প্রকৃতির বুক নিংড়ানো অলৌকিক কোনও তৃষ্ণার! এই রস কি খাজুরের নাকি দূর নক্ষত্রলোক থেকে পৃথিবীর মতো বিশাল, উন্মুখ একখানা হাঁড়িতে এসে পড়ছে সৃষ্টিকর্তার মহান করুণাধারা! সেই ধারায় চিরকালের তরে তৃষ্ণা মিটছে এই পৃথিবীর তৃষ্ণার্ত, অভাজন মানুষের।
দবির গাছি কোন রস পতনের শব্দ পায়!
অনেকক্ষণ নিঝুম হয়ে আছে দবির, তার হুঁকার শব্দ পাওয়া যায় না দেখে কাঁথা সিলাতে সিলাতে স্বামীর দিকে তাকাল হামিদা। তাকিয়ে অবাক হল। একহাতে হুঁকা ধরে এমন করে বাইরের দিকে তাকিয়ে কী দেখছে দবির!
হামিদা বলল, ও নূরজাহানের বাপ কী দেহো বাইরে?
থতমত খেয়ে হামিদার দিকে মুখ ফিরাল দবির। ফ্যাল ফ্যাল করে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথা বলল না।
হামিদার ভুরু কুঁচকে গেল। কী অইছে?
এবার যেন কথা কানে গেল দবিরের। বলল, কী কও?
তুমি হোনো নাই কী কইছি?
না।
ক্যা?
কইতে পারি না!
কইতে পারবা না ক্যা? কী অইছে তোমার? এত কাছে বইয়াও আমার কথা হোনতাছো না! কী দেখতাছিলা বাইরে?
কিছু না।
তয়?
ঝোড়া খাজুরের রস ঝরছে হাঁড়িতে, তার টুপ টুপ শব্দ, সেই শব্দের সূত্র ধরে দূর কোনও অচিনলোকের ইঙ্গিত, এসব হামিদাকে খুলে বলল দবির। শুনে দিশাহারা হয়ে গেল হামিদা। কাঁথা সেলাই শেষ না করেই উঠল। দাঁতে সুতা কেটে কাঁথা থেকে সরিয়ে আনল সুই। কথায় বেশ একটা ঝাড়া দিয়ে সেই কথা যত্নে মেলে দিল ঘুমন্ত নূরজাহানের গায়ে। দবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি দুয়ার দেও। রাইত অইছে। হুইয়া পড়ো।
দরজার একপাশে হুঁকা রেখে দরজা বন্ধ করল দবির, হোগলায় এসে বসল।
চকি থেকে নামিয়ে দবিরের বালিশ হোগলায় রেখেছে হামিদা। একখান কাঁথাও রেখেছে। রাতে একটু একটু শীত পড়ছে দুইদিন ধরে। কাঁথা না হলে চলে না।
কিন্তু দবির এমন চুপচাপ হয়ে আছে কেন? কথা বলছে না, শুয়ে পড়ছে না! কেমন বিহ্বল হয়ে বসে আছে! ব্যাপার কী?
হামিদার কী রকম ভয় ভয় করতে লাগল। হারিকেন নিভিয়ে নূরজাহানের পাশে শুয়ে পড়ল সে। শুয়েই বলল, নূরজাহানের বাপ হুইছো?
অন্ধকার মেঝে থেকে দবির বলল, না।
ক্যা?
ঘুম আহে না। খালি খাজুরগাছের কথা মনে অয়, রসের কথা মনে অয়। কানে হোনতাছি খালি রস পড়নের আওজ। টুপ টুপ, টুপ টুপ।
শীতের দিন আইলে এমুন অয় তোমার। এইডা কইলাম ভাল না। খাজুরগাছ, রস এই হগল কইলাম জোয়াইরা বোয়ালের লাহান। রাইত দুইফরে লোভ দেহাইয়া ডাইক্কা বিলে লইয়া যায় মাইনষেরে। পাইনতে ডুবাইয়া মারে। হেই মাছের ডাক মনের ভিতরে থিকা হোনে যেই মাইনষে হেয় কইলাম রাইত দোফরে ঘর থিকা বাইর অইয়া দেহে বিয়ান অইয়া গেছে। আসলে মাইট্টা জোচনায় রাইত দোফররে বিয়ান মনে অয়। তোমার নমুনা কইলাম অমুন দেকতাছি। রসের আশায় রাইত দুইফরে কইলাম ঘর থিকা বাইর অইয়া যাইয়ো না! ফয়জরের আয়জান অইবো, আমারে ডাক দিবা তারবাদে ঘর থিকা বাইর অইবা। মিয়ার ছাড়া কইলাম ভাল না। গলায় টিবিদা (টিপ দিয়ে) মাইরা খাজুর গাছের আগায় উডাইয়া রাখবো। সাবদান।
