গাওয়াল বাড়ি থেকে বাইর হইয়া মিয়াবাড়ির পুবদিককার বড় আমগাছটার তলায় আসছে নূরজাহান। কোষানাওয়ের গুড়ার লগে চিকন একখান শিকল বান্দা আছে। এই শিকল দিয়া নৌকা বাইন্দা বাড়িতে উঠছে, উইঠা দেখে এই অবস্থা।
সে খুবই অবাক। এমুন নিটাল ক্যা বাড়ি? মানুষজন গেছে কই? বড়বুজানে নাইলে এই সমায় ঘুমায়, তার কোনও আওজ থাকে না। আর যে দুইজন মানুষ আছে? কুট্টি আর আলফু। কুট্টি এই সমায় রান্দনবাড়ন শেষ কইরা, নাইয়া ধুইয়া, খাইয়া দাইয়া দোতলা ঘরের বারিন্দায় বইসা মাথা উঁচড়ায় আর আলফু পশ্চিম ভিটির ঘরের ছেমায় বইসা বিড়ি টানে। তারা দুইজন গেল কই?
উঠানে একটু দাঁড়াইলো নূরজাহান। বিলাই আর বিলাইয়ের বাচ্চাগুলি দেখল। ইস কী সোন্দর হইছে এহেকখান বাচ্চা। কোনওটা ফকফকা সাদা, কোনওটা সাদা কালোয় মিশানো। কোনওটার রং শুকনা পাতার মতন। দেখলেই কুলে লইতে ইচ্ছা করে!
নূরজাহান সেইটা করে না। এতদিন পর এই বাড়িতে আসল, যার লগে দেখা করতে আসল, কুট্টি, কুট্টি গেল কই? আর আলফু!
নূরজাহান কি কুট্টিরে ডাক দিবো? কুট্টিবুজি, ও কুট্টিবুজি। কই গেলা?
নাকি আলফুরে ডাকবো। আলফুদাদা, ও আলফুদাদা। আরে কই গেলা গা তোমরা? কেঐরে দেহি বিচড়াইয়া পাই না।
কুট্টি কি ঘাটপারে গেছে থালবাসন ধুইতে? নাকি ঘরে হুইয়া ঘুমাইতাছে! আলফুও কি কোনও ঘরে হুইয়া রইছে?
বাড়ির প্রতিটা ঘরের দিকে তাকাল নূরজাহান। দোতলা ঘর ছাড়া প্রত্যেকটা ঘরের দুয়ারে বিরাট বিরাট তালা। রান্নঘরের দুয়ার খোলা। খোলা দুয়ার দিয়া ভিতরে উঁকি দিল নূরজাহান। না, এই ঘরে কুট্টি নাই। আলফুর তো রানঘরে থাকনের কথা না। সে থাকে। দোতলাঘরের বারান্দায়। কুট্টি থাকে বড়বুজানের পালঙ্কের পাশের মেঝেতে। এই ঘরের দুয়ার আবজানো। উঠান থেকে যে চার-পাঁচ ধাপের সিঁড়ি আছে দোতলা ঘরে উঠার, সেই সিঁড়ি ভাইঙ্গা উঠল নূরজাহান, আস্তে কইরা ঠেলা দিল দুয়ারে। দুয়ার খুইলা গেল।
না বারান্দায় কেউ নাই। আলফুর বিছনা বালিশ পশ্চিম দিককার বেড়ার কাছে গুছাইয়া রাখা। বারান্দার পর ভিতর দিককার দুয়ারটা খোলা। পা টিপা টিপা সেই দুয়ারের কাছে আইসা ভিতরে উঁকি দিল নূরজাহান। ভাবছিল পাটাতনের উপরে দেখবে পাটি বিছাইয়া কাইত হইয়া ঘুমাইতাছে কুট্টি। না, কুট্টি ঘরে নাই। পালঙ্কে শ্রাবণ মাসের এই গরমেও মোটা কাঁথায় পুরা শরীর ঢাইকা ঘুমাইতাছে বড়বুজানে। খালি তার পাকাবেলের মতন মাথাটা দেখা যায়। দুয়ারের দিকে পিঠ দিয়া শুইয়া আছে। মুখ দেখা যায় না।
নূরজাহান ভাল একটা চিন্তায় পড়ল। ঘটনা কী? কুট্টি আর আলফু গেল কই? নাও লইয়া দুইজনেই কোনও মিহি গেছেনি? ছাড়া বাইত্তে কোনও কামে যায় নাই তো? হেইডা গেলে তো আলফু যাইবো। কুট্টি যাইবো ক্যা?
মিয়াবাড়ির ডিঙ্গি নৌকাটা থাকে দক্ষিণ দিককার পুকুরঘাটে। দোতলা ঘর থেকে বাইর হইয়া ঘাটপারে আসল নূরজাহান। আরে, নাও তো দেহি ঘাটে বান্দা। খালি বান্দা না, শিকলের একমাথা পাছার দিককার গুড়ার লগে প্যাঁচ দেওয়া, অন্যমাথা ঘাটপারের হিজল গাছের লগে প্যাঁচ দিয়া তালা মারা।
তয়?
ভালরকম একটা চিন্তায় পড়ল নূরজাহান। এইরকম কারবার এই বাড়িতে কোনওদিন দেখে নাই সে। সাত-আষ্টমাসে মিয়াবাড়ি এমুন অইয়া গেল কেমতে? কুট্টি কো? আলফু কো? বড়বুজানে একলা ঘুমাইয়া রইছে দোতালা ঘরে। দিন দোফরে চোর ডাকাইত আইয়া যুদি নাও ভইরা বেবাক কিছু লইয়া যায়, কেউ উদিসও পাইবো না!
বাঁশঝাড়ের ওদিক দিয়া পশ্চিম ভিটির ঘরের ছাইছে কী মনে কইরা আসল নূরজাহান। চালতাগাছটা দিনরাইত আন্ধার কইরা রাখে জায়গাটা। সেখানে আইসা থতমত খাইলো সে। চালতাতলায় নাড়া বিছানো আছে অনেকখানি জায়গায়। য্যান যখন তখন ইচ্ছা করলে এখানে আইসা বসতে পারে কেউ, ইচ্ছা করলে শুইয়াও থাকতে পারে। সেই নাড়ার বিছানায় হাত-পা ছড়াইয়া অসহায় ভঙ্গিতে বইসা আছে কুট্টি। বইসা কানতাছে। চোখের পানিতে গাল গলা ভিজা আছে। তয় কান্দনের কোনও আওয়াজ নাই। দেইখা বুকটা এমুন মোচড় দিয়া উঠল নূরজাহানের। হায় হায় এহেনে বইয়া এমতে কানতাছে ক্যা কুট্টিবুজি? কী অইছে? একজন মানুষ আইসা যে একটুখানি দূরে দাঁড়াইছে, উদিসও পাইতাছে না।
কয়েক পলক কুট্টিরে দেখল নূরজাহান। আস্তে করে একখান কাশ (কাশি) দিল। লগে লগে চমকাইয়া উঠল কুট্টি। গালে গলায় যে চোখের পানি, খেয়াল করল না, মানুষটার দিকে তাকাল। সেই ফাঁকে উইঠা দাঁড়াইল। আঁচলে চোখ পুছতে পুছতে (মুছতে মুছতে) বলল, কী রে নূরজাহান, তুই আইলি কই থিকা?
নূরজাহানকে দেখে যতখানি অবাক হওয়ার কথা কুট্টির তার ধারকাছ দিয়াও গেল না। সে। যেন নূরজাহান প্রায়ই আসে এই বাড়িতে, আগে যেমন আসত। তারে দেইখা অবাক হওয়ার কী আছে! নূরজাহান যে সাত-আষ্ট মাস ধইরা আসে না, সেই কথা কুট্টির মনে নাই। আর এইরকম বাইষ্যাকালে একলা একলা কই থিকা কেমুন কইরা আসল সে এই কথাও তার মনে হয় না। নিজের কান্দন আর যেই দুঃখে সে কানতাছিল তাই নিয়া থাকল।
নূরজাহান বলল, আইলাম গাওয়াল বাইত থিকা।
ওই বাইত্তে আইছস কুনসুম?
কান্না শেষের নাক টানাটা টানল কুট্টি।
নূরজাহান বলল, ওই বাড়ির আগে আছিলাম হাজামবাড়ি। বিয়ানে বাবার লগে বাইর অইছি। বাবায় গেছে মেন্দাবাড়ি। এই বাড়ি থিকা আমিও মেন্দাবাড়ি যামু। তারবাদে বাবার লগে বাইত্তে যামু।
