তয় অহন যে নূরজাহানরে বিয়া করতে চাইতাছে এইডা কী? এইডা কি আমার মাইয়ার ক্ষতি না?
ক্ষতিনি খালি। বিরাট ক্ষতি। তয় তরিকাড়া হেয় ভাল ধরছে।
কেমুন?
এই হগল লইয়া কথা কইতে গেলেই কইবো, আমি তো খারাপ কিছু করতে চাইতাছি না। আমগো ধর্মে চাইরখান বিয়া তরি জায়েজ। আতাহারের মা’য় মইরা গেছে, অহন তো আরেকখান বিয়া আমি করতেই পারি। এইডা তো কোনও অন্যাই না। নূরজাহানরে আমার পছন্দ অইছে এর লেইগা প্রস্তাব পাঠাইছি। আইজকাইল বিয়ার লেইগা মাইয়ার বাড়ি থিকা পোলারে যৌতুক দেয়, আমি উলটা মাইয়ারে যৌতুক দিমু। তুই কইলি ন্যাংড়া বসির কইছে তর বাইত্তে বড় ঘর উড়াইয়া দিবো, এক-দুইকানি জমিন তর মাইয়ার নামে লেইক্কা দিব।
হ। ন্যাংড়া তো কইলো।
এই কথার পর তারে তো কেঐ কিছু কইতে পারবো না। কইলে কইবো, আমার প্রস্তাব আমি দিছি, দবির যদি না মানে তয় তো কোনও কথা নাই। জোর কইরা তো অর মাইয়ারে আমি আর বিয়া করতে যাইতাছি না।
হ এই হগল সে কইবো। তয় ভিতরে ভিতরে খেইপা থাকবো আমার উপরে, নূরজাহানের উপরে। নূরজাহানের অন্য জাগায় বিয়া অইতাছে এই খবর পাইলেঐ বিয়া ভাঙ্গানি দিবো। নানান পদের ভেজাল করবো। কুফরি কালাম দিয়া আমার মাইয়ার বিয়া আটকাইয়া রাখবো। নূরজাহানরে অন্য জাগায় আমি বিয়াই দিতে পারুম না। শেষ তরি এমুন একখান কারবার করবো, তার কাছেঐ নূরজাহানকে আমার বিয়া দেওন লাগবো। আর যুদি বিয়া হেয় একবার নূরজাহানরে করতে পারে তয় কী যে অইবো হেইডা আমি চিন্তাও করতে পারি না বুজি।
দেলোয়ারা চেয়ারে বসলেন, হেইডা আমি বুজি। উটতে বইতে অর জানডা হেয় খাইয়া হালাইবো।
তার অর্থ হইলো মাওলানা সাবে যতদিন বাঁইচ্চা থাকবে ততদিন ভইরা আমার মাইয়াডার উপরে সে শোদ লইবো।
আমারও হেইডাঐ মনেঅয়।
দেলোয়ারার পায়ের কাছে ফিরিতে বইসা পড়ল দবির। আপনে আমারে বুদ্দি দেন বুজি। আমি অহন কী করুম? কেমতে আমার নূরজাহানরে তার হাত থিকা বাঁচামু?
তার আগে আমারে আরেকখান কথা ক। মাওলানা সাবে যে নূরজাহানরে বিয়া করতে চায়, এই কথা আর কে কে জানে?
আপনেরে লইয়া তিনজন মাইনষে জানে। আমি, মরনিবুজি আর আপনে।
তর বউ জানে না?
না। তারে কইলে তো কাইন্দা কাইট্টা বিনাস করবো।
হ। নূরজাহানরেও জানাইচ না।
না না। আপনেও কেঐরে কইয়েন না বুজি। ভিতরে ভিতরে চেষ্টা কইরা দেহেন কী করা যায়।
আমার তো একজনের লগে কথা কইতেই অইবো। এনামুলের লগে।
হ হেইডা তো কইবেন। অহন আপনে আর এনামুল সাবেই আমার ভরসা। আপনেরা দুইজনে চেষ্টা করলে মাওলানা সাবে ফিরবো।
তয় তুই একখান কাম কর দবির। গোপনে গোপনে পোলা দেকতে থাক। পছন্দ মতন পোলা পাইলে মাইয়া বিয়া দিয়া ফালা। বিয়া দিয়া ফালাইতে পারলে একবারে ঝামেলা শেষ।
হ এইডা আমিও চিন্তা করছি। তয় বুজি মাইয়ার বিয়ার লেইগা তো ঘটক ধরতে অয়। বইচ্ছারে তো ধরন যাইবো না।
আরে না না, ও তোর কাম করবো না। ও করবো মাওলানা সাবের কাম।
তয় ঘটক পামু কই? অন্য ঘটক ধরলে হেই খবরও মাওলানা সাবের কানে যাইবো। গোপনে ঘটকারে টেকা খাওয়াইয়া বিয়া ভাইঙ্গা দিবো, নাইলে উলটা তার লগে বিয়ার লেইগা বইচ্ছার লগে ওই ঘটকারেও লাগাইয়া দিবো।
হ এইডাও কথা। সব দিকেই বিপদ।
এই বিপদ থিকা আপনে আর এনামুল সাবে আমারে বাঁচাইতে পারেন। বুজি, বুজি গো, আমি আপনের পায় ধরি বুজি। আপনে আমার মাইয়াডারে বাঁচান।
দুই হাতে দেলোয়ারার পা ধরতে গেল দবির, চট কইরা পা সরাইয়া ফালাইলেন দেলোয়ারা। হায় হায় করচ কী দবির। পায় ধরন লাগবো না। আমি চেষ্টা করুম, আমি অবশ্যই চেষ্টা করুম। কয়দিনের মইদ্যেই এনামুল বাইত্তে আইবো। অরে আমি বুজাইয়া কমুনে। মাওলানা সাবরে ডাকমুনে বাইত্তে। তুই এত ঘাবড়াইচ না। দেহা যাউক কী অয়।
দেলোয়ারার পা ধরতে গিয়া চোখে পানি আইছে দবিরের। গাল বাইয়া নামনের আগেই সেই পানি সে এখন কান্দের গামছা দিয়া মুচতাছে। মতলার জ্বরজ্বারি দেইখা রাবি আসতেছিলো রান্নঘরের দিকে, দবিররে চোখ মুছতে দেইখা বড়ঘর আর রান্নঘরের মাঝখানে দাঁড়ায়া রইল। গছি কান্দে ক্যান, বোঝার চেষ্টা করল।
রাবিকে দেখে দেলোয়ারা বললেন, তর রান্দনবাড়ন হইছে রাবি?
রাবি বিনীত গলায় বলল, হ বুজি আইছে। বেবাক রেডি।
তয় দবিরের লেইগা ভাত বাড়।
আপনে খাইবেন না?
আমি পরে খামুনে। আগে দবির খাউক।
আইজ দিহি নাইলেন না? নাইয়া ধুইয়া খাইবেন?
আইজ আর নামু না। খালি হাত মুখ ধুমু, অজু করুম।
পানি আইন্না দিমু?
দবিরের ভাত দিয়া তারবাদে দে।
আইচ্ছা।
রাবি মাত্র রান্নঘরে ঢুকবো, হনহন করে হাঁইটা আসলে বাদলা। ভাত দেও মা। খিদা লাগছে।
ছেলের উপর চেইতা উঠতে গেল রাবি। দেলোয়ারার দিকে তাকায়া চেতল না। ঠান্ডা গলায় বলল, নাইয়া আয়। তরে আর গাছিদাদারে একলগে ভাত দিতাছি। যা বাজান। দেরি করি না।
.
দুপুরের পর একটুখানি রোদ উঠছে।
মিয়াবাড়ির উঠানে বেঁকা হইয়া পড়ছে সেই রোদ। উঠানের মাটি ভাল রকম শুকাইছে। বিলাইটা করছে কী, শুকনা মাটি পাইয়া বাচ্চাকাচ্চা লইয়া উঠানে আইসা নামছে। নিজে কাইত হইয়া শুইছে রোদে, বাচ্চাকাচ্চাগুলি তিড়িংতিড়িং কইরা লাফাইতাছে। একটা কাঠঠোকরা পাখি ঠক ঠুক করছে চালতাগাছে। এইটুকু ছাড়া আর কোথাও কোনও আওয়াজ নাই। ভাল কইরা কান পাতলে ঝিমমারা একখান আওয়াজ পাওয়া যায়। সেইটা পোকামাকড়ের ডাক, ঝিঁঝির ডাক। এই বাড়িতে যে তিনজন মানুষ আছে, বড়বুজান কুট্টি আর আলফু, বাড়িতে উঠার পরও নূরজাহানের তা মনে হল না। মনে হল এইটা একটা ছাড়াবাড়ি। এই বাড়িতে মানুষ থাকে না।
