তাকাম শেষ করে কলকি পরিষ্কার করল দবির। তামাক আর টিকা পোড়ার ছাই রান্ধনঘরে ঢুইকা চুলার মুখের দিকে ফালায় দিল। হুঁকার মাথায় কলকি বসাইয়া কাটা দাঁড় করাইয়া রাখলো রানঘরের বেড়ার লগে। দেখে রাবি বলল, হায় হায় আপনে এই হগল কাম করতাছেন ক্যা দাদা? আমারে দেন। আমি করতাছি।
নারে বইন, তুমি বহুত করছো। তোমারে আর কষ্ট দিতে চাই না। আমার লেইগা দেলরা বুজি তোমার লগে রাগ করল, হেতে আমি বহুত শরম পাইছি। আর শরম আমারে দিয়ো না।
আঁচলে মুখ মুছে হাসল রাবি। কী যে কন দাদা? এইডা কোনও রাগ অইলো নি? দেলরা বুজি আমারে আরও কত কিছু কয়? এই হগল আমার গায়ে লাগে না। তয় সেয় আমারে মহব্বতও করে। বেদম মহব্বত করে। আপনা বইনের লাহান মহব্বত করে। হাজেরবেলা রোজঐ বাদলারে পড়াইতে বহায়। বাদলার বাপরে কোনওদিন কিছু কয় না। যেয় এত মহব্বত করে সেয় কোনও কোনও সময় ইট্টু বকাবাজ্জি করলে কী অয়, কন?
এসময় আবার মতলার গলা ভাইসা আসলো। বাদলার মা, ও বাদলার মা। ইট্ট আহো। আমার বহুত জ্বর। জ্বরডা ইট্টু দেহো। মাথায় ইট্টু পানি দিয়া দেও।
এবার রাবি আর রাগ হইল না। মোলায়েম গলায় বলল, ইট্টু সবুর করো। আইতাছি।
রাবি বড়ঘরে ঢোকার পর নিমতলায় আসল দবির। তখনই কথাটা বললেন দেলোয়ারা। শুইনা থতমত খাইল দবির। যেন বুঝতে পারল না কথাটা। বলল, কী কইলেন বুজি?
দেলোয়ারা হাসলেন। না কইলাম, প্রস্তাব তো খারাপ দেয় নাই মাওলানা সাবে!
কন কী আপনে?
হ। এত টেকাপয়সার মালিক, জাগাজমিনের মালিক। তর মাইয়া এতডি রেডিমেড পোলাপান পাইবো, নাতি নাতকুড় পাইবো। টেকাপয়সা গয়নাগাটি কোনও কিছুর তো আকাল থাকবো না।
দেলোয়ারার ঠাট্টাটা বুঝল দরিব। বুঝে সেও হাসল। তয় কথা বলল না।
দেলোয়ারা বললেন, আগিলা দিনে তো এমুন অইতোই। সইত্তর বচ্ছইরা বেডা বিয়া করতে পোনরো-ষোল্লো বচ্ছরের মাইয়া। আমি একখান বই পড়ছিলাম, শরশ্চন্দ্রের দেবদাস। হেই বইতে পার্বতীর বিয়া অইছিল ওইরকম এক বুইড়ার লগে।
দবির বিনীত গলায় বলল, আইজকাইল তো আর হেইদিন নাই বুজি। আর মাওলানা সাবের উদ্দেশ্য তো আপনে মনেঅয় বুজছেন। হেয় তো আর বিয়ার লেইগা নূরজাহানরে বিয়া করতে চাইছে না। তার ঘটনা তো অন্য।
হ হেইডা আমি বুজছি। আমি তর লগে ইট্টু ফাইজলামি করলাম।
তারপরই গম্ভীর হয়ে গেলেন দেলোয়ারা। পায়চারি করতে করতেই চশমা খুললেন চোখ থেকে। কাঁচ মুছতে মুছতে বললেন, মাওলানা সাবে মানুষ সুবিদার হেইডা আমি জানি। খারাপ মানুষ। তয় এত খারাপ হেইডা বুজি নাই। নূরজাহান কামডা খারাপ করছিল। আরেক হিসাবে খারাপও করে নাই। পরে তো আমরা বেবাক কথাই হুনছি, বেবাক ঘটনাই বুজছি। হেয় ইচ্ছা কইরা মাকুন্দারে গোরুচোর সাজাইয়া পিডাইলো, জেলে দিলো। মাকুন্দার অন্যায়, ছনুবুড়ির জানাজায় আইছিলো। অনেকেই ঘটনা বুজছে, বুইজাও কথা কয় না, মাওলানা আর আতাহারের ডরে। নূরজাহান সইজ্য করতে না পাইরা ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছিল। মান্নান মাওলানা অইলো ঠান্ডা মাথার শয়তান। ওই ঘটনা লইয়া গেরামের মাইনষে তারে বুজাইতে যাইবো, নূরজাহানরে মাপ কইরা দিতে কইবো এইডা হেয় আগেঐ বুজছিল। এর লেইগা কেঐ কিছু কওনের আগেঐ হেয় কইছে, নাদান মাইয়া, না বুইজ্জা কামডা করছে, আমি অরে মাপ কইরা দিলাম।
তয় মাপ তো হেয় করে নাই।
অহন তো হেইডাঐ দেকতাছি। বিয়া কইরা নূরজাহানের উপরে শোদ লইবো।
বিয়া না দিলে নানান ভাবে আমার জানডা খাইবো।
হ।
এর লেইগাঐ উপায় না দেইক্কা আমি আপনের কাছে আইছি বুজি।
হ হেইডা তো তুই কইলিঐ।
চশমা চোখে পরলেন দেলোয়ারা। মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দবির বলল, ওই ঘটনার পর নূরজাহানের ব্যাপারে আপনে কি মাওলানা সাবরে কোনওদিন কিছু কইছিলেন বুজি?
কইছিলাম।
কবে?
ঘটনার কয়দিন পরঐ।
কী কইলেন?
না আমগো বাইত্তে তো অহন হেয় ঘনঘন আহে। এনামুল মজজিদ বানাইবো…
হেইডা তো আমরা জানি।
একদিন আইছে। আমি খালি কথাডা উডাইছি, কয় কী, ওই কথাডা আর কইয়ো না বইন। নাদান মাইয়া, অহনও পোলাপান, না বুইজ্জা আকাম একখান করছে, আমি আল্লার খাশবান্দা, দিছি মাপ কইরা।
আর কিছু কইলো না?
না। ওই লাইনে আমারে আর যাইতে দিল না। মজজিদের কথা তুইল্লা কথা ঘুরাইয়া দিল।
আমরা মনে করছি আপনে আর এনামুল তারে বুজাইয়া শুনাইয়া মানাইছেন, য্যান আমার মাইয়ার কোনও ক্ষতি না করে।
হেইডা কইলাম একখান কথা কইয়া আমি তারে বুজাইছিলাম। এনামুলও একদিন আমার সামনেই কইছে।
দবির গভীর আগ্রহ নিয়া বলল, কী কইছিলেন বুজি? কইছিলাম, মাওলানা সাব ঘটনাডা আপনে মনে রাইখেন না, অর কোনও ক্ষতি কইরেন না।
হুইনা হেয় কী কইলো?
কইলো, আরে না রে বইন, তুমি পাগল অইছোনি? যারে মাপ কইরা দিছি তার অন্যাইয়ের কথা মনে রাখুম ক্যা?
আর এনামুল সাবে কী কইছিল?
এই কথাই কইছিল। আমিই এনামুলরে কইছিলাম, মাইয়াডারে লইয়া দবির আর দবিরের বউ বিরাট পেরেশানির মইদ্যে আছে। তুমি বাজান মাওলানা সাবরে ইট্টু বুজাও। এনামুলও কথা উড়ানের আগেঐ মাওলানা সাবে আমারে যেমনে থামাইয়া দিছিলো, এনামুলরেও থামাইয়া দিলো। আরে না না, ওই হগল আর কওন লাগবো না। ওই কথা আমি মনে রাখি নাই, ওই ছেমড়ির কোনও ক্ষতি আমি করুম না।
