মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে একজন মানুষ এইভাবে বদলাইয়া যাইতে পারে এমন। কারবার জিন্দেগিতে দেখে নাই দবির। ভিতরে ভিতরে খুবই হাসি পাইতাছিল তার, আবার অন্যদিকে শরমও করতাছিল। ইসসিরে, আমার লেইগা দেলরা বুজির কাছে ছ্যাচাড়া খাইলো রাবি! এক ছ্যাচায় সিদা অইয়া গেছে। এইডা একদিক দিয়া ভালঐ অইছে। এরবাদে দেলরা বুজির কাছে আইলে রাবি আর তেড়িবেড়ি করতে পারবো না। দবিররে লইয়া, নূরজাহানরে লইয়া আবল তাবল প্যাচাইল পাড়তে পারবো না। মান্নান মাওলানার যত বড় ভক্তই হউক, দেলরা বুজি আর দবিরের সামনে তার পক্ষ লইয়া কথা কইতে পারবো না।
রাবির অবস্থা দেখে দেলোয়ারা তখন ঠোঁট টিপা হাসছেন। চেয়ার ছাইড়া উঠছেন। নিমতলায় পায়চারি করার ফাঁকে চোখ থেকে চশমা খুইলা শাড়ির আঁচলে স্বভাব মতন মুচছেন।
আকাশে মেঘের খেলাটা সকাল থেকে চলছে। মেঘের ফাঁকে অতিকষ্টে দুয়েকবার সূর্য উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে। সুবিধা তেমন করতে পারে নাই। একটুখানি রোদ উঠতে না উঠতেই মেঘ আইসা ঢাইকা দিছে। আবার বৃষ্টিও হইতাছে না। না মেঘবৃষ্টি না রোদ। গিরস্তবাড়ির তরিতরকারির আঁকার তলে খাড়া রোদের দিনেও বর্ষার পানির যে রং হয়, দিনের রংটা তেমন। শ্রাবণ মাসের গরমটাও তেমন নাই। ভাল রকম একটা আরামদায়ক ভাব আছে।
রান্নঘরের ওটায় বসে তামাক টানছে দবির, ঘরের ভিতর রান্দনবাড়নে ব্যস্ত রাবি। তারপরও অতি আন্তরিক ভঙ্গিতে দবিরের লগে কথা বলছিল সে। বলার ভাবটা এমন, যেন। জিন্দেগিতে কোনওদিন গাছির লগে খারাপ ব্যবহার সে করে নাই। মান্নান মাওলানার থিকা য্যান দবিরেরই সে বেশি ভক্ত। নূরজাহানের অন্যায় য্যান কোনও অন্যায়ই না।
বড় একটা খাদায় ভাত ঠিকনা দিয়া রাবি বলল, ও গাছিদাদা, এতদিন বাদে কী মনে কইরা এই বাইত্তে আইলেন? ওই যে হেইদিন, নূরজাহান যেদিন হুজুরের মুখে ছ্যাপ দিল, তারপর থিকা তো আপনেরে আর দেখলাম না। নূরজাহানরেও দেহি না। অরে বলে আপনে আর ভাবিছাবে বাইত থনে বাইর অইতে দেন না? হায় হায় এইডা একটা কথা অইলো। অতড়ু মাইয়া। না বুইজ্জা কাম একখান কইরা ফালাইছে, হুজুরে তো বুজছে, ও নাদান মাইয়া, হুজুরে অরে মাপ কইরা দিছে। হুজুরের পোলায়ও কিছু মনে করে নাই। তয় অরে আপনেরা বাইত্তে আটকাইয়া থুইছেন ক্যা? অহন আর ডর কী? অরে আর কে
কী কইবো?
রাবির এইসব কথায় এত হাসি পাইতাছিল দবিরের। হাসতে পারছিল না শরমে। নিমতলার ওদিক থেকে সব কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না দেলোয়ারা। তামাক টানতে টানতে দবির একবার দেলোয়ারার দিকে তাকাল। হুঁকা থেকে মুখ তুলে বলল, না আটকাইয়া থুই নাই তো! নূরজাহানরে তো আইজ আমার লগে লইয়াইছি।
এত অবাক যেন আজকের আগে জিন্দেগিতে হয় নাই রাবি এমন গলায় বলল, লগে লইয়াইছেন?
হ।
তয় কো নূরজাহান?
আমারে এই বাইত্তে নামায় দিয়া হাজামবাড়ি গেছে।
হাজাম বাইত্তে ভাত খাইবোনি?
আরে না।
তয়?
ভাত মনে অয় দোফরে ও আইজ খাইবোই না।
ক্যা?
এতদিন বাদে বাইত থনে বাইর অইছে। খুশিতে পেডভরা।
খুশিতে পেডভরা থাকলে তো কাম অয় না দাদা। পেডে যত খুশিই থাউক, ভাতটাও পেডে দিতে অয়। নাইলে খুশি আর খুশি থাকে না।
হ কথা ঠিক।
তয়?
দবির আবার দুই-তিন টান তামাক খাইলো। তয় হাজাম বাইত্তে ও বেশিক্ষণ থাকবো না। ওই বাইত থিকা যাইবো গাওয়াল বাইত্তে, তারবাদে যাইবো মিয়াবাড়ি।
এই বাইত্তে আইবো না?
আইবো।
কুনসুম?
হেইডা কইতে পারি না।
খাওনের ওক্ত অইয়া গেল। অরে ডাক দেন। আমগো বাইত্তে আহুক। এই বাইত্তে আইয়া ভাত খাউক। ভাত যা রানছি আপনে ছাড়া আরও তিনজনে খাইলেও টান পড়বো না। আর অরে ইট্টু দেহি। আহা রে, কতদিন ছেমড়িডারে দেহি না।
রাবির এইসব কথায় দবির একসময় টের পেল রাবির জন্য অদ্ভুত একটা মায়া লাগছে তার। স্বামী সন্তান নিয়া নিশ্চিন্ত একটা আশ্রয়ে আছে। কোথাকার কোন মাতবরের চর থেকে ভাতের আশায় আত্মীয়স্বজন মা বাপ ভাইবোন ছাইড়া এই বাড়িতে আইসা পইড়া আছে। স্বামীটা আকাইম্মা, রাবি নিজে কামকাইজ কইরা স্বামীসন্তানের পেট চালায়, নিজের পেট চালায়। যখন দেশগ্রামের কোনও গিরস্তবাড়িতে কাম পায় না তখন খাওন দেয় দেলরা বুজি। থাকার জায়গা তো দিছেই। এই কারণেই নিজের পছন্দ অপছন্দ বইলাও কিছু নাই রাবির। কারও উপর রাগ ক্ষোভ থাকলে সেটাও প্রকাশ করতে পারে না। নিজের মেজাজ মরজি মতন চলতে পারে না। এই ধরনের মানুষের জীবন মানেই দুই মুঠ ভাত। দুই মুঠ ভাতের আশায় সব করতে হয় তাদের। ইচ্ছা স্বাধীন বইলা কিছু নাই।
ভাতের ফ্যান গালা শেষ করে রাবি বলল, নূরজাহান অহন কোন বাইত্তে আছে দাদা?
হেইডা তো কইতে পারি না।
দেহেন না কোন বাইত্তে আছে?
ক্যা?
ডাক দেন অরে। আপনের লগে বইয়া ভাত খাউক।
তামাক শেষ করে দবির বলল, আরে না। অরে লইয়া তুমি এত চিন্তা কইরো না বইন। ও অর মতন খাইবো নে। না খাইলেও অসুবিদা নাই। আমার নিজেরও খিদা নাই। আমি আইছিলাম দেলরা বুজির লগে ইট্ট কথা কইতে। কথা কইয়া যাইতাম গা। বুজি কইলো বইতে। তারবাদে আমারে কিছু কইলো না, তোমারে আথকা কইলো, দবির এই বাইত্তে দুফইরা ভাত খাইয়া যাইবো। হুইন্না আমি ইট্টু শরম পাইছি।
ফ্যানের খাদা একপাশে রাইখা, ভাতের হাঁড়ি আবার চুলায় রাখল রাবি। চুলায় এখন আর আগুন নাই। আগুন নিভা গেছে। ভাতের হাঁড়ির সরা সরাইয়া হাতা দিয়া ভাত একটু ওলট পালট করল রাবি। সেই ফাঁকে পাইজাম চাউলের গরম ভাতের ভারী সুন্দর একখান গন্ধ ছুটল। এই গন্ধে দবিরের মনে হল, দুনিয়ার সব থিকা সুন্দর গন্ধ হইল, সুবাস হইল ভাতের। ভাতের থিকা সুন্দর সুবাস আর কোনও কিছুর নাই।
