পরি বলল, বাবায় আরেকখান নাও কিনতে যাইবো দিগলির আডে। কাইল দিগলির আড, কাইলঐ যাইবো।
নূরজাহান বলল, গাওয়াল না করলে আরেকখান নাও দিয়া কী করবো?
খাইগোবাড়ি যাইবো।
ক্যা?
খাইগোবাড়ির মজজিদের হুজুরের কাছে যাইবো মোশলা (মাশায়েল, ধর্মের কথা) হুনতে। খাইগগাবাড়ির হুজুররে বাবায় খুব ভক্তি করে।
এসময় ছুনুবুড়ির ঘর থেকে বাইর হইয়া আসলো আজিজ গাওয়াল। তারে দেইখা। আরেকখান ধাক্কা খাইলো নূরজাহান। গাওয়াল দাদারে তো চিননই যায় না। গুড়মুড়া তরি লাম্বা পাঞ্জাবি ফিনছে, পাঞ্জাবির পায়ের কাছে অল্প একটু দেখা যায় সাদা লুঙ্গি। মাথায় সাদা গোল টুপি। গলা ছাড়ায় নামছে চাপদাড়ি। হাতে তসবি। ডানহাতে তসবি গুনছে আর বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছে। দেখে কেমন যে লাগল নূরজাহানের। মনে হল ছনুফুবুর ঘর থিকা য্যান মানুষ না একজন ফেরেশতা বাইর হইছে। কিছু না ভাইবা নূরজাহান আগাইয়া গিয়া আজিজ গাওয়ালের পায়ে হাত দিল। খুবই ভক্তিভরে কদমবুসি করল।
তসবিসহ হাতটা নূরজাহানের মাথায় রাখল আজিজ। গভীর মায়াবী গলায় বলল, আল্লায় তোমারে বাঁচাইয়া রাখুক বইন, আল্লায় তোমারে বাঁচাইয়া রাখুক। বহুতদিন বাদে তোমারে দেখলাম। ভাল আছো বইন?
আছি দাদা।
গাছিমামায় ভাল আছে? মামানি আম্মায়?
আছে দাদা, বেবাকতেই ভাল আছে।
নূরজাহান কীভাবে এতদিন পর বাড়ি থেকে বাইর হইল, কীভাবে কার লগে এই বাড়িতে আইলো, বেবাক কথা তার কাছ থেকে শুনল আজিজ। বানেছার মতনই বলল, দোফর অইয়া গেছে, ভাত না খাইয়া কইলাম আমগো বাইত থিকা যাইয়ো না বইন।
আইচ্ছা দাদা।
আবার নূরজাহানের মাথায় হাত রাখল আজিজ। তোমারে একখান কথা কই বইন?
কন দাদা, কন।
মা-বাপের লগে কোনওদিন খারাপ ব্যভার কইরো না। তুমি তো এক মা’র এক মাইয়া, এক বাপের এক মাইয়া। অহন মা-বাপ আছে অহন বুজবা না, তারা যহন না থাকবো তহন বুজবা মা-বাপ কী ধন। তহন কাইন্দাও কুল পাইবা না। আমার মা’য় বাঁইচ্চা থাকতে আমি বুজি নাই। মা’য় মইরা যাওনের পর অহন বুজি। বুইজ্জা দিনরাইত মা’র লেইগা কান্দি। কাইন্দা কী লাব কও? মা’রে তো আর ফিরত পামু না। আমার মা’য় তো আর কোনওদিন ফিরত আইবো না। এর লেইগাই কথাডা তোমারে কইলাম। মা-বাপের মনে কোনওদিন দুঃকু দিয়ো না, তারা ব্যাজার অয় এমুন কাম কইরো না। করলে আমার লাহান জীবনভর কানবা, তয় কাইন্দা কোনও লাব অইবো না।
নূরজাহান মাথা নিচা করে আজিজের কথা শুনছিল।
জহুরের ওক্তের আগে আগেই মাদরাসার পড়া শেষ করে ফিরা আসলো নাদের-হামেদ। নৌকা ঘাটে বাইন্দা দৌড়াইয়া বাড়িতে উঠল। কায়দা সিপারা রেহাল ঘরে রাইখা ঘাটপারে গিয়া অজু করল দুই ভাইয়ে তারপর বড়ঘরের পশ্চিম কোনায় দাঁড়ায়া দুই কানের দিকে দুই হাত তুলে মধুর স্বরে আজান দিতে লাগল হামেদ। আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর…
আজিজ গাওয়ালের বাড়ির উঠানে দাঁড়ানো নূরজাহানের মনে হল সে যেন অন্য এক দুনিয়াতে আইসা পড়ছে। এই দুনিয়া য্যান মেদিনমণ্ডল গ্রাম না, এই দুনিয়া য্যান অচেনা অজানা পাকপবিত্র এক দুনিয়া। এই দুনিয়ায় য্যান একজনও খারাপ মানুষ নাই। এই দুনিয়ার সব মানুষই য্যান ফেরেশতার মতন। এই দুনিয়ায় য্যান লোভ লালসা হিংসা ক্রোধ কিছু নাই। এই দুনিয়া য্যান মান্নান মাওলানা নামের কেউ নাই। এই দুনিয়ায় য্যান আছে। শুধু মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের মতন সত্যিকার ধর্মপ্রাণ মানুষ, পরহেজগার মানুষ। এই দুনিয়া য্যান বেহেশতের একটা অংশ।
.
নিমতলার ওদিকটায় পায়চারি করতে করতে দেলোয়ারা হাসিমুখে বললেন, দবির, আমি চিন্তা কইরা দেখলাম, মাওলানা সাবে প্রস্তাবটা খারাপ দেয় নাই।
রান্নঘরের ওটায় বসে অনেকক্ষণ ধরে তামাক খাচ্ছিল দবির। দেলোয়ারার ঠান্ডাগলার কঠিন ধমক খাইয়া রাবি হঠাৎ কইরাই একদম বদলাইয়া গেল। তারপর থেকে ভাবটা এইরকম যেন দবির এই বাড়ির বিরাট আত্মীয়। অনেকদিন বাদে বেড়াইতে আসছে। বিরাট খাইখাতির তারে করন দরকার। সেই এই বাড়ির বান্দি আর দবির হইল বাড়ির মালিকের মেজবান। মেজবানরে যত রকম খাতিনদারি করন দরকার সবই তার করন দরকার। সেই মোতাবেক তারপর থেকে চলতে শুরু করল রাবি। রান্দনবাড়ন আগের মতনই চলছিল। এই ফাঁকে দবিরের জন্য এত সুন্দর কইরা তামাক সাজাইলো, আপনা স্বামী যে মতলা, মতলার জন্য জিন্দেগিতে এত যত্ন কইরা তামাক সাজায় নাই। কলকিতে তামাক ঠাইসা দিয়া, চিমটা দিয়া টিকা ধইরা একদম টকটকা লাল কইরা পোড়াইলে চুলার। আগুনে। কলকির ঠাসা তামাকে টিকা বসাইয়া হুঁকার মাথায় কলকিখান এত যত্ন কইরা লাগাইলো, লাগাইয়া দবিরের কাছে আইনা বিগলিত গলায় বলল, নেন গাছিদাদা, তামুক খান। অনেকহানি তামুক দিছি। ম্যালা সমায় ধইরা খাইতে পারবেন। ভাত সালুন রান্দনও অইয়া আইছে। তামুক খাইয়া নাইয়া আহেন। বাদলার বাপের বোয়া গামছা আছে। হেইডা দিমুনে। গামছা ফিন্দা লইয়েন। তারবাদে ভাত খান। ভাত খাওনের পর চা খাইতে চাইলে আবার চা বানাইয়া দিমুনে। সালুন কইলাম ভালই আছে আইজ। বাদলা যে শিংমাছ ধরছে। হেই শিংমাছ তো আছেঐ, এলাইচ শাকের লগে গজারটাকি রানছি, আমার রান কইলাম মন্দ না। খাইয়া আরাম পাইবেন।
