নূরজাহানের হতভম্ব ভাব তখনও কাটে নাই। কোনওরকমে বলল, না ভাবিছাব। হাজামবাড়ি থিকা একথাল মুড়ি মিডাই খাইয়া আইছি। বিয়ানে বাইত্তে একবার খাইছি। এত খাইলে পেট ফাইট্টা মইরা যামু।
তয় দুইরা ভাত কইলাম খাইয়াই যাবি।
নাগো ভাবিছাব, দোফরে আমি আইজ ভাতই খামু না। রাইত্রের আগে আর কিছু খামু না। আপনেগো বাড়ি থিকা মিয়াবাড়ি যামু। বাবায় গেছে মেন্দাবাড়ি। শেষমেশ মেন্দাবাড়ি থিকা বাবারে লইয়া বাইত্তে যামু।
আমি কোনও কথা হুনুম না। তুই এতদিন বাদে আমগো বাইত্তে আইছস, দুইরা ভাত না খাইয়া তরে আমি যাইতে দিমু না। নাদের-হামেদ মাদরাসা থিকা পইড়া আইবো, তর গাওয়াল দাদায় আমার হরির ঘর থিকা বাইর অইবো, হেতক্ষণে (ততক্ষণে) আমার রান্দনবাড়ন নাওন ধোন বেবাক অইয়া যাইবো। তারবাদে জহুর নমজ পইড়া খাইতে বমু আমরা। তুই কইলাম যাবি না। পরির লগে গল্প কর।
বানেছা আর দাঁড়াল না, রানঘরে গিয়া ঢুকল। সেই ঘরের দিক থিকা এলাইচ শাক বাগাড় দেওয়ার ছিরছির একটা শব্দ আসল, তেল মশলার গন্ধ আসল।
নূরজাহান পরির দিকে তাকাল। এইসব নিয়া কথা তুলবো, পরি হাসল। তুমি অবাক অইতাছো না, নূরজাহান ফুবু? আমগো বাড়ির এই অবস্থা দেইক্কা অবাক অইতাছো না?
হ। আমার তো বেক কিছুই নতুন লাগতাছে। তরে মনে অইতাছে নতুন মানুষ, নাদের হামেদরে মনে অইছে, অহন মনে অইলো ভাবিছাবরে। তগো বাড়ির উঠানে খাড়াইয়া মনে অইতাছে এইডা তগো বাড়ি না, এইডা অন্য বাড়ি। আমি য্যান ভুল কইরা অন্য বাড়িতে আইয়া পড়ছি। আর তরা য্যান তরা না, তরা য্যান অন্য মানুষ।
হ আমরা অহন অন্য মানুষ। দাদি মইরা যাওনের পর, বাবায় দেশান্তরী অইয়া যাওনের পর, আবার ফিরত আহনের পর আমগো দীন দুনিয়া বাড়িঘর বেবাক বদলাইয়া গেছে। বাবায় বেবাক কিছু বদলাইয়া হালাইছে। মা’রে তুমি আগে দেখছো না? খাড়ে দজ্জাল আছিলো। হেই মা’য় অহন মাড়ির মানুষ। মুখে রাওশব্দ নাই। জোরে কথা কয় না। কেঐরে বকা দেয় না। বাবায় যুদি কয় অহন দিন, মা’য় কয় দিন। বাবায় যুদি কয় রাইত, মা’য় কয়, হ অহন রাইত। পাঁচওক্ত নমজ পড়ে। আমরা বেবাকতেই নমজ পড়ি। বাবার লগে পড়ে নাদের-হামেদ, মা’র লগে পড়ি আমি। জরি অহনও পড়তে পারে না। তাও আমগো লগে নমজে খাড়ায়।
একটু থামল পরি। তারপর বলল, নাদের-হামেদরে মাদরাসায় দিছে বাবায়। দুই ভাইরে কোরানে হাফেজ বানাইবো। হামেদ আগে গান গাইতো, অহন আর গানের নাম লয় না। তয় গলার আওজ সুন্দর দেইখা বাবায় অরে আয়জান (আজান) দেওন হিগাইছে। জহুর নমজের আগেঐ বাইত্তে আইবো অরা। আইয়াঐ অজু কইরা আয়জান দিব হামেদ। তারপর তিন বাপে-পুতে নমজ পড়বো দাদির ঘরে। আমি আর মা’য় পড়ম বড়ঘরে। নমজ শেষ কইরা বেবাকতে মিলা খাইতে বমু।
নূরজাহান আথকা বলল, তর বাপে অহন গাওয়াল করে না?
করে। তয় রোজ করে না। যেদিন ইচ্ছা অয় করে, যেদিন ইচ্ছা অয় না, করে না।
হারাদিন বাইত্তে বইয়া থাকে?
হ।
বাইত্তে বইয়া কী করে?
দাদির ঘরে বইয়া থাকে। ওই ঘরে দাদি যেহেনে হুইতো, যেহেনে হুইয়া মইরা গেছে ওহেনে একহান নতুন মোগলা (হোগলা) কিন্না আইন্না বিছাইয়া রাখছে। বাইত্তে থাকলে ওই গোগলায় বইয়া দোয়া দরুদ পড়ে, নমজের সময় অইলে নমজ পড়ে। কোনও কোনও রাইত্রে হারারাইত বইয়া থাকে ওই ঘরে। দোয়া দরুদ পড়ে আর কান্দে। মা’য়ও গিয়া বইয়া থাকে বাবার লগে। দাদি আর আমার ওই বইনডা মইরা গিয়া আমগো দুনিয়াদারি বদলাইয়া দিছে।
গাওয়াল দাদায় অহন কো? গাওয়ালে গেছে নি?
না, দাদির ঘরে।
দাদায় গাওয়াল না করলে তগো সংসার চলে কেমতে?
ক্যা? আমগো তো কোনও অভাব নাই। ধানের জমিন আছে না? ওই জমিনের ধান খাইয়াও তো ম্যালা ধান বেচন যায়। বহুত ইরি অয় আমগো খেতে। ধান বেচা বহুত টেকা থাকে ঘরে। চাউল আর টেকা থাকলে সংসার চলতে অসুবিধা কী? বাবায় তো কয়দিন ধইরা কইতাছে আর গাওয়াল করবো না। গাওয়াল অইলো মানুষ ঠকানের কারবার। মানুষ ঠকানের কারবার হেয় করবো না। আগে আমগো জমিনডি বরগা দেওয়া থাকতো। ইবার থিকা আর বরগা দিবো না। নিজেই কামলা লইয়া চুইবো (চষবে)। নিজেঐ গিরস্তি কইরা সংসার চালাইবো। আরেকখান নৌকা কিনবো। একখান নৌকায় আমগো অয় না। নাদের-হামেদ মাদরাসায় যায়। নৌকা লইয়া। বাবায় যুদি কোনওদিন বাজারে যায় তয় অসুবিদা অয়।
আজিজ গাওয়ালের সংসারের এই চেহারা দেখে আর পরির মুখে সব শুনে মনটা অন্যরকম হয়ে গেল নূরজাহানের। এই বাড়ির সেই মানুষটির কথা মনে পড়ল। ছনুবুড়ি। আহা কত কষ্ট পাইয়া মরছে। বেঁকা শরীর নিয়া দুইটা ভাতের আশায় এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুইরা বেড়াইছে। মিছাকথা কইছে, কূটনামি করছে, একমুঠ ভাতের লেইগা বউর বকাবাজি তো খাইছেই, মাইর তরি খাইছে। পেডের জ্বালায় টুকটাক চুরি করছে। আহা রে! আইজ আজিজ গাওয়াল যেমুন বদলাইছে, বানেছারে যেমুন বদলাইয়া ফালাইছে, এই বদলানটা যুদি তহন বদলাইতো তাইলে কি আর ছনুবুড়ির ওই দশা অইতো। চুন্নি বদলাম লইয়া কি মরণ লাগতো?
বহুদিন পর আজ ছনুবুড়ির কথা ভেবে বুকটা হু হু করে উঠল নূরজাহানের। এই যে এখন গাওয়াল দাদায় মা’র ঘরে বইয়া মা’র লেইগা দোয়া দরুদ পড়ে আর কান্দে, আহারে এই কান্দন যুদি আগে থিকা কানতো? আগে থিকা যুদি মা’র মুখের মিহি ইট্ট চাইতো? বানেছারে যুদি ইট্টু শাসন করতো! মা’য় থাকতে মা’র কথাটা ক্যান ভাবলো না সে! অহন হারা জীবন কাইন্দা কি আর মা’রে ফিরত পাইবো?
